বক্সিং রিং এর ভেতরে-বাইরে তিনি কতটা শিল্পিত মানুষ ছিলেন সেটা মানুষ স্মরণে না রাখলেও তার আপত্তি ছিল না। কিন্তু, ৭৪ বছর বয়সে চলে যাওয়া মোহাম্মদ আলী এমন একজন মানুষ যিনি বিশ্বে গত অর্ধ শতাব্দীর বেশি সময় ধরে প্রভাব বিস্তার করে চলেছিলেন। মৃত্যুর পরও যুগের পর যুগ স্মরণীয় হয়ে থাকবেন মোহাম্মদ আলী।
তাকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল তিনি কীভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকতে চান? উত্তরে বিশ্বের সেরাদের সেরা ক্রীড়াবিদ বলেছিলেন: এমন একজন মানুষ হিসেবে যে কখনো তার নিজের মানুষদের বিক্রি করে দেয়নি। কিন্তু, এটা খুব বেশি চাওয়া হয়ে গেলো শুধু একজন ভালো বক্সার হিসেবে। এমনকি আমি যে কতটা সুন্দর ছিলাম সেটা উল্লেখ না করলেও আমি কিছু মনে করব না।
তবে মৃত্যুর পর মহান এ মানুষটি সম্পর্কে মানুষের আলোচনায় বারবারই আসছে বক্সিং রিংয়ে তার তার শিল্পিত মুষ্টিযুদ্ধের সৌন্দর্যে কথা আর রিং এর বাইরে মানুষ হিসেবে তার মনুষ্যত্বের সৌন্দর্যের অনন্য দিকটির কথা।
‘আলীর মৃত্যু নেই। মার্টিন লুথার কিং এর মতো তার আদর্শ এবং চেতনাও চিরদিন বেঁচে থাকবে,’ এভাবেই মোহাম্মদ আলীর কথা বলেছেন ‘রাম্বল ইন দ্যা জাঙ্গল’সহ তার অনেক লড়াইয়ের আয়োজক ডন কিং।
‘রাম্বল ইন দ্যা জাঙ্গল’-এ আলীর প্রতিদ্বন্দ্বী এবং ব্যক্তি জীবনে আলীর বন্ধু জর্জ ফোরম্যান বলেছেন: আমি জীবনে যত মানুষের সংস্পর্শে এসেছি আলী তার মধ্যে মহানতমদের একজন। কোন সন্দেহ নেই যে সবচেয়ে ভাল মানুষদের একজন ছিলেন আলী।
‘কখনোই আর আরেকজন মোহাম্মদ আলী আসবেন না। সারাবিশ্বে কালো মানুষদের তাকে দরকার ছিল। তিনি ছিলেন আমাদের কণ্ঠস্বর। আজ আমি যেখানে দাঁড়িয়ে সেখানে আসার জন্য তিনি আমার কণ্ঠস্বর ছিলেন,’ শ্রদ্ধাবনত চিত্তে আলীর প্রতি সম্মান জানিয়ে তার সব অর্জনে আলীকে কৃতিত্ব দিয়েছেন পাঁচ বিভাগেই বিশ্বসেরা বক্সার ফ্লয়েড মেওয়েদার।
শুধু কালো মানুষ নয়, সারাবিশ্বেই অবহেলিত মানুষের কণ্ঠস্বর ছিলেন মোহাম্মদ আলী যার ডাকনামই হয়ে গিয়েছিল ‘দ্যা গ্রেটেস্ট’।
বক্সিং রিংয়ে বিশ্ব তার আগমনী জেনেছে ১৯৬০ রোম ওলিম্পিকে যেখানে তিনি লাইট-হেভিওয়েটে স্বর্ণপদক জয় করেন। তবে, পেশাদার বক্সিংয়ে তার উত্থান ১৯৬৪ সালে। ওই বছর তিনি সনি লিস্টনকে হারিয়ে প্রথম বিশ্বসেরার খেতাব জয় করেন। তিনিই প্রথম যিনি টানা তিনবার হেভিওয়েট শিরোপা ধরে রাখেন।
১৯৮১ সালে বক্সিং রিং থেকে অবসরের আগে ৬১টি লড়াইয়ের ৫৬টিতেই জিতেছিলেন মোহাম্মদ আলী যা তাকে সারাজীবনের জন্য জীবন্ত কিংবদন্তীর মর্যায়দার আসনে আসীন করে। বিশ্বখ্যাত ‘স্পোর্টস ইলাসট্রেটেড’ এর ভাসায় তিনি ‘স্পোর্টসম্যান অব দ্যা সেঞ্চরি’ আর বিবিসি তাকে দেয় ‘স্পোর্টস পার্সোনালিটি অব দ্যা সেঞ্চুরি’র সম্মান।
এরকম সম্মানজনক উপাধিতে ভূষিত হওয়ার পেছনে যাদুকরি লড়াই দিয়ে বক্সিংকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যেমন ভূমিকা রেখেছে তেমনি ভূমিকা রেখেছে মানুষ হিসেবে মানুষের অধিকারের লড়াইয়ে তার মশাল হয়ে উঠার নেপথ্যে ত্যাগের মহিমা। খেলা, সম্প্রদায় এবং জাতীয়তা ছাপিয়ে তিনি ক্রমশ হয়ে উঠেছিলেন মানুষের অধিকারের সংগ্রামে এক আলোকবর্তিকা।
লিস্টনের সঙ্গে প্রথম লড়াইয়ের আগে থেকেই ধর্মীয় আন্দোলন ‘নেশন অফ ইসলাম’-এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন মোহাম্মদ আলী। এ সংগঠনটির ঘোষিত লক্ষ্য ছিল: আমেরিকান মুসলিমদের আধ্যাত্মিক, মানসিক, সামজিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন।
মার্টিন লুথার কিং এর সকলকে এক করে অধিকার আদায়ের আন্দোলনের বিপরীতে কালো মানুষদের আলাদা আন্দোলনের পক্ষে ছিল এই ‘নেশন অফ ইসলাম’। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রে তখন সংগঠনটিকে সন্দেহের চোখে দেখা হতো। শেষ পর্যন্ত আলী অবশ্য ইসলাম ধর্মই গ্রহণ করেন। দাস নাম ‘ক্যাসিয়াস মার্সেলাস ক্লে’ বদলে মোহাম্মদ আলী নাম গ্রহণ করেন তিনি। প্রচলিত আছে যে আলী প্রশ্ন করেছিলেন: কেন যীশু খ্রিস্টকে একজন সাদা মানুষের অবয়ব দেয়া হয়েছে?
তবে আলী যে শুধু বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধেই লড়াই করেছেন এমন নয়। যেকোন অত্যাচারের বিরুদ্ধেই মহান এ মানুষটি উচ্চকিত হয়েছেন। ১৯৬৭ সালে তিনি যুক্তেরাষ্ট্রের ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। এ কারণে শুধু মার্কিন সরকার নয়, তার অনেক বন্ধু-সহকর্মীরও বিরাগভাজন হন তিনি। কিন্তু আলী তার অবস্থানে অবিচল থাকেন। বাধ্যতামূলকভাবে মার্কিন সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে ভিয়েতনামে যুদ্ধে যেতে অস্বীকার করায় তার বিশ্বসেরার খেতাব এবং বক্সিং লড়াইয়ের অনুমতি কেড়ে নেয়া হয়। এ কারণে পরের তিন বছর তিনি আর রিংয়ে নামতে পারেননি। সেসময় কারাগারেও থাকতে হয় তাকে।
১৯৭১ সালে তার উপর আরোপিত শাস্তি তুলে নেয়া হলে আলী আবার বক্সিংয়ে ফিরে আসেন এবং সর্বকালের সেরা তিন লড়াইয়ে অংশ নিয়ে আবারো বিশ্ব মুষ্টিযুদ্ধে নিজের জায়গায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন মোহাম্মদ আলী।
১৯৮০ সালে ল্যারি হোমস এবং ১৯৮১ সালে ট্রেভর বারবিকের কাছে হারের মধ্য দিয়ে তার বক্সিং ক্যারিয়ারের অবসান হয়। অনেকে মনে করেন আরো অনেক আগেই তার অবসর নেয়া উচিত ছিল। কিন্তু শেষের এ দুই পরাজয় মোহাম্মদ আলীর ক্যারিয়ারকে এতোটুকু ম্লান করেনি। দিনশেষে তার অর্জনে আছে ৬১ লড়াইয়ে মাত্র ৫ পরাজয় আর ৫৬ জয়। এই ৫৬ জয়ের ৩৭টিই তিনি জিতেছেন প্রতিদ্বন্দ্বীকে নকআউট করে।
অবসরের পর দ্রুতই আলীর স্বাস্থ্যের অবনতি নিয়ে গুজব ছড়িয়ে পড়ে। পরে দেখা যায় তার কথা কিছুটা জড়িয়ে যাচ্ছে, মাঝেমধ্যেই ঝিমুনি এবং অবসাদে আক্রান্ত হচ্ছেন তিনি। তবে মানুষের মধ্যে তিনি ঠিকই উপস্থিত হতে থাকেন। যেখানেই যেতেন সংবর্ধনা পেতেন বিপুল।
শেষ পর্যন্ত অবশ্য তার শরীরে পারকিনসন্স রোগের অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়। এই রোগের কারণেই শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা জটিল আকার ধারণে করলে আলীকে বৃহস্পতিবার অ্যারিজোনার একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয় যেখানে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। কেন্টাকিতে নিজের শহরে চিননিদ্রায় শায়িত হবেন তিনি।
আলী চলে গেলেও মানুষের চোখে সবসময়ই যেমন ভাসবে বক্সিং রিংয়ে তার প্রজাপতির মতো উড়ে উড়ে মৌমাছির মতো প্রতিপক্ষকে হুল ফুটিয়ে ঘায়েল করার চিত্র তেমনি ভাসবে ১৯৯৬ আটলান্টা ওলিম্পিকে মশাল কিংবা ২০১২ লন্ডন ওলিম্পিকে পতাকা বহনের চিত্র যে মশাল এবং পতাকার চেতনা তিনি শুধু ধারণই করেননি, ছড়িয়ে দিয়ে গেছেন সারাবিশ্বে।







