অমর একুশেতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাত পেরিয়ে সকাল হয়ে দুপুর পর্যন্ত যারা ধারাভাষ্য দেন তারা কারা? তাদের মধ্যে বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, টেলিভিশনের সংবাদ পাঠক এবং আবৃত্তিকাররা থাকলেও বড় অংশই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তাদের একজন অধ্যাপক মেসবাহ কামাল।
১৯৯৩ সাল থেকে তিনি শহীদ বেদির অনুষ্ঠানের ধারাবিবরণী দিচ্ছেন। তবে এর মধ্যে চড়াই-উৎরাই পেরোতে হয়েছে। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় আসার পর তাকে ধারাভাষ্যদল থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল। পরে আবার সম্পৃক্ত করা হয় তাকে। এবারও অমর একুশেতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে ধারাবিবরণী দিয়েছেন তিনি।
কীভাবে তারা এতো সুন্দরভাবে উপস্থাপনা করে যান? কি করে টানা এতোগুলো সংগঠনের বলে যান? এরকম অনেক প্রশ্ন আছে সাধারণ মানুষের। এসব বিষয় সম্পর্কে জানতে অধ্যাপক মেসবাহ কামালের মুখোমুখি হয়েছিল চ্যানেল আই অনলাইন।

চ্যানেল আই অনলাইন: একুশে ফেব্রুয়ারিতে লাখো মানুষের মিছিলে শহীদ বেদিতে পুস্পার্ঘ্য অর্পণের অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন আপনি। বহু বছর ধরে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত আছেন। যথারীতি এবারও করেছেন। কেমোন লাগে?
অধ্যাপক মেসবাহ কামাল: এটি একধরনের অংশগ্রহণও। বিশ্ববিদ্যালয় যে জাতীয় দায়িত্বটা পালন করে তার অংশীদার হওয়া। একুশের ভাষা শহীদদের স্মরণ করা। এই যে একটি বিশেষ ক্ষণ সেটার অংশীদার হওয়া। এটি খুব বড় ব্যাপার। আমরা যারা কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ মঞ্চে থাকি, এই কাজটি আসলে আমরা অংশগ্রহণমূলক হিসেবে মনে করি। ভাষা শহীদদের স্মরণ করার সাথে আমরা যুক্ত হচ্ছি। যখন শিক্ষক হইনি, তার আগেওতো আমরা ছাত্র হিসেবে অংশগ্রহণ করেছি। কাজেই এটি আসলে একুশের ইতিহাস। এটি জাতি সত্তার বোধটা সংহত হওয়ার ইতিহাস। আর আমরা ছোট বেলা থেকে দেখছি, শহিদ মিনার ভাঙা এবং গড়ার খেলা চলছে। ভাঙতো মৌলবাদীরা। আর যারা ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদের পক্ষে ছিলো তারা শহীদ মিনার গড়তো। এই ভাঙা-গড়া দেখার মধ্য দিয়ে আমরা বড় হয়েছি। এই আত্মপরিচয় দানা বাঁধার যে অনুসন্ধান তা গড়ে উঠতে দেখেছি এভাবেই। এই ভাঙা-গড়া দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কিছুটা কমেছে। কিন্তু একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি। তবে সময়ের পরিক্রমায় এখানে অংশগ্রহণ আরও নিশ্চয়ই বেড়েছে। অনুভূতি বলতে, এক ধরনের ইতিহাসের সাক্ষী হওয়া আর কি!
চ্যানেল আই অনলাইন: এই অনুষ্ঠানের জন্য উপস্থাপক কারা ঠিক করেন?
অধ্যাপক মেসবাহ কামাল: এটা তো বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ঠিক করেন। মাননীয় ভাইস চ্যান্সেলরের নেতৃত্বে একটি কমিটি তৈরি হয়। তারা ঠিক করেন উপস্থাপনায় কারা দায়িত্ব পালন করবেন। এর নেতৃত্বে থাকেন পদাধিকার বলে অমর একুশে হলের প্রভোস্ট।
চ্যানেল আই অনলাইন: মূলতঃ কাদেরকে উপস্থাপক হিসেবে ঠিক করা হয়ে থাকে?
অধ্যাপক মেসবাহ কামাল: এখানে আসলে আমাদের দেশে যে রাজনৈতিক পরিবেশ, তার একটি চিত্র থাকে। যেমন আমি নিজে রাজনৈতিক কারণে অনেকদিন পর্যন্ত উপস্থাপনায় যুক্ত থাকতে পারিনি। আমি শিক্ষক হয়েছি ১৯৮৪ সালের জানুয়ারি মাসে। তখনতো এরশাদের বিরুদ্ধে জনপ্রতিরোধের সময়। সেসময় আমরা যারা ছাত্রজীবনে সক্রিয় ছিলাম, এরশাদ বিরোধী আন্দোলনেও সক্রিয় ছিলাম। তখন বিশ্ববিদ্যালয় যারা পরিচালনা করতেন তারা আমাদের জায়গা দিতেন না। তখনকার সরকারের কাছে যারা গ্রহণযোগ্য তাদের ডাকা হতো। তারপর এরশাদ উৎখাত হলেন। তখন ডাক পেতে শুরু করি। কিন্তু সেখানেও আমরা পেছনের দিকে থাকতাম। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের কথা মনে আছে। সে সময়কালে নরেন বিশ্বাস স্যারসহ আমরা উপস্থাপনা করেছি। তিনি আমাদের প্রবাদ পুরুষ। তার সাথে আমার উপস্থাপনায় যুক্ত হতে পেরেছিলাম। কিন্তু ২০০১ সালে যখন বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় এলো তখন আমার নাম বাদ পড়ে গেল। সেসময় সরকার বদলের প্রক্রিয়ায় আমাদের দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন শুরু হলে আমি তার প্রতিবাদ করি। তারপর দেখলাম শহীদ বেদির উপস্থাপকের তালিকা থেকে আমি বাদ পড়ে গেলাম। আপাতত দৃষ্টিতে এটিা কিন্তু খুব বড় কিছু নয়। কিন্তু এটি আবেগের জায়গা। একবার সম্ভবত ডাক পেয়েছিলাম।
কিন্তু সেখানেও আমার কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে। উপস্থাপনায় কী বলতে হবে তা তারা ঠিক করে দিচ্ছে। বলতে হবে, কারা ফুল দিচ্ছে সেই সংগঠন বা সেই ব্যক্তির নাম। ধরনের ধারাবিবরণী দেয়া যাবে না। ধারাবিবরণী মানে হলো ইতিহাসের কথা বলা যাবে না। একুশের ফুল দেওয়া শুধু ফুল দেয়া না। একুশ পালনের একটি তাৎপর্য আছে। এর সাথে আমাদের রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার যে সংগ্রাম এবং সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের বিপরীতে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম জড়িয়ে আছে। এমন পরিস্থিতিতে আমাদেরকে বলা হলো যে ধারাবিবরণী দেওয়া যাবে না। এটা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই আমি প্রতিবাদ করলাম। বলা যবে না কেন? বলা যাবে না এটা কোথায় আছে? এরপর দেখলাম পরের বছর আমি বাদ পড়ে গেলাম!
এরকম বহু অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আমাদের যেতে হয়েছে। এখন ধরুন, বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের ওপর নির্ভর করে। আমরা যেন অবশ্যই উপস্থিত থাকি সেটা নিশ্চিত হওয়ার জন্য বারবার তাগাদা দেন। আমরাও প্রাণের তাগিদ থেকে আসি। কারণ এই লক্ষ মানুষের অংশগ্রহণে এই যে, একটা দিবস উদযাপন, যার তাৎপর্য এখন আন্তর্জাতিক হয়ে গেছে। সেটায় অংশগ্রহণ করতে পারাতো বড় ব্যাপার।
চ্যানেল আই অনলাইন: পুরো অনুষ্ঠানটি প্রাঞ্চল করে রাখার দায়িত্ব থাকে উপস্থাপকদের। সাধারণত অনেক দক্ষতা এখানে প্রয়োজন। উপস্থাপক নির্বাচনে কোন কোন নিয়ম অনুসরণ করা হয়ে থাকে?
অধ্যাপক মেসবাহ কামাল: প্রথমেই বলেছি, সাধারণত রাজনৈতিক বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পায়। এরপর সাধারণতঃ টক শোর কারণে কিছু শিক্ষক যারা এক ধরনের পরিচিত পেয়েছে, অথবা যারা সংস্কৃতিমনা, অথবা যাদের পারফরম্যান্স বা দক্ষতা ভালো তাদের নেওয়া হচ্ছে। আমি মনে করি এটি একটি দক্ষতার ব্যাপার। কখনো কখনো আমরা দেখি, যে দল ক্ষমতায় থাকে সেই দলের সাথে সংম্পৃক্ত লোকগুলো থেকে সিলেকশন করা হয়। আবার কখনো কখনো দেখেছি বিশ্ববিদ্যালয়ে যে তিনটি ধারার দল– নীল দল (আওয়ামী লীগ), সাদা দল (বিএনপি), গোলাপী দল (বামপন্থী) এরকম তিন দল থেকেই উপস্থাপক রাখা হয়। উপস্থাপনার ক্ষেত্রে আরও মজার বিষয় যে, যখন রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী আসেন তখন তাদের পক্ষে যারা শিক্ষক তাদের ঘোষণার দায়িত্ব দেওয়া হয়। যখন বিরোধীদল আসে তখন বিরোধী দলের রাজনৈতিক মতাদর্শের যে শিক্ষক তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সাধারণ সময় দায়িত্ব পড়ে সবার ওপর। তবে এই নিয়মটা গত দুই তিন বছর থেকে কিছুটা প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের চেষ্টা হয়েছে। এখন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এলে উপস্থাপনা করেন একুশে হলের প্রভোস্ট।
তবে দুয়েক বছর থেকে দেখে আসছি যখন বিরোধী দল সহিংসতায় যুক্ত হলো তখন তাদের পক্ষের শিক্ষকদের দেওয়া হচ্ছে না। তাদের প্রতিনিধিদের আর ডাকা হচ্ছে না বা ডাকা হলেও তারা আর আসছেন না। তখন দায়িত্বটা অন্য কাউকে নিতে হয়। যেমন এই বছর যখন খালেদা জিয়া এলেন আমাকে দায়িত্বটা নিতে হয়। কিন্তু আমি তো বিএনপির লোক নই। কখনো ছিলামও না। শুধু তাই নয়, এবার যখন আওয়ামী লীগ এলো সকাল বেলা তখনও আমাকে সামলাতে হয়েছে। আমাদের কখনো কখনো অনেকরকম সমস্যায় সম্মুখীন হতে হয়।
চ্যানেল আই অনলাইন: শহীদ বেদির অনুষ্ঠান উপস্থাপনা চলে দীর্ঘক্ষণ। এই দীর্ঘক্ষণ উপস্থাপনা এক বা দুই জনের পক্ষে কঠিন। সাধারণত কতজন উপস্থাপক থাকেন?
অধ্যাপক মেসবাহ কামাল: এটার কোন নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই। কখনো কখনো কম থাকেন, কখনো বেশি থাকেন। সাধারণতঃ কোন প্রহরে কে থাকবেন তা ঠিক করে দেওয়া হয়। রাত ১১টা থেকে রাত ২টা, রাত ২টা থেকে সকাল ৭টা, সকাল ৭টা থেকে বেলা ১১টা, আর ১১টা থেকে ৩টা- এরকম চারটি পর্বে বিভক্ত করা হয়। কারো কারো নাম সবগুলো পর্বে্ই থাকে। যেমন আমি দেখলাম যে, আমার নাম সবগুলো পর্বে থাকে। এবার অনেকের মধ্যে ছিলেন অধ্যাপক শফিউল আলম ভুঁইয়া, বাংলা বিভাগের রফিক উল্লাহ খান, রূপা চক্রবর্তী। অনেক তরুণও আছেন। তরুণদের সুযোগ দিতে হবে যাতে করে তারা ভবিষ্যতের জন্য তৈরি হতে পারে। এই অনুষ্ঠান শুরুর আগে দারুণ একটি পরিবেশ তৈরি হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক নেতৃবৃন্দ আসেন। ওইসময় পারস্পরিক সম্মেলনের একটি চমৎকার পরিবেশ তৈরি হয়। এখানে যারা আমাদের পছন্দ করেন তারা যেমন থাকেন, আমাদের অপছন্দ করেন এমন ব্যক্তিরাও থাকেন। আমি দেখলাম, অনেকে আমাদেরকে পছন্দ করেন না। কিন্তু আমাদের উপস্থাপনা পছন্দ করছেন। আমার মনে হয় এর একটি কারণ আছে। তা হলো আমি যা বলি আমি মনে করি তার আদর্শিক ভিত্তি আছে।
চ্যানেল আই অনলাইন: সমস্যা বলতে কোন ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়?
অধ্যাপক মেসবাহ কামাল: এই যে এতো মানুষ আসছে তাদের নিয়ন্ত্রণ করার যোগ্যতাটা অনেক বড় ব্যাপার। নানা পেশা-নানা শ্রেণির মানুষ আসেন। শিশুরা আসে। তারা সবাই যেন ফুল দিয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন তা নিশ্চিত করতে হয়। এর জন্য অবশ্যই আমাদের আইন শৃঙ্খলা বাহিনী, আমাদের ক্যাডেটরা সবা্ই আছেন। কিন্তু তারপরও নিয়ন্ত্রণের মূল জায়গায় থাকতে হয় উপস্থাকদের। কাজেই এখানে যারা দায়িত্বে থাকেন তাদের কিন্তু সেই সক্ষমতা থাকতে হয়। আপনি এক লক্ষ মানুষকে এত সুদীর্ঘ সময় সামলাচ্ছেন। তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ছাত্রজীবনে দেখেছি, ছবি টাঙানো নিয়ে মারামারি হতো। বঙ্গবন্ধুর ছবি বা জিয়া বা এরশাদের ছবি নাকি এরশাদের ছবি, কার ছবি সবচেয়ে উপরে টাঙানো হবে তা নিয়ে মারারি চলতো। সেখানে লাঠালাঠি, গোলাগুলি পর্যন্ত হয়েছে। শহীদ মিনারের কাছাকাছি অনেক জায়গায় বোমাবাজি পর্যন্ত হয়েছে। তাছাড়া আমাদের আরও অনেক কিছু সামাল দিতে হয়। যেমন ধরুন, আজকে একটি ছাত্র সংগঠন শহীদ মিনার ছেড়ে যেতে দেরি করছিল। এদিকে পেছনে মানুষের চাপ। সেটা তো আজিমপুর পর্যন্ত চলে গেছে। এই যে সুদীর্ঘ লাইন সেখানে হুড়োহুড়ি চলছে। তার মধ্যে একজন মহিলা এসে খুবই আপত্তি করছেন। হেনস্থার শিকার হয়েছেন তিনি! সেখানে শিশুও আছে। এরকম অবস্থায় দ্রুত পরিস্থিতি কিভাবে সামাল দেওয়া যায় তা দেখতে হয়েছে। আমাদের একটি পর্যায়ে পুলিশের প্রধানকে ডেকে আনতে হয়েছে। এটিতো অনেক বড় ব্যাপার। এ ধরনের অনেক পরিস্থিতি আমাদের মোকাবিলা করতে হয়। একটি দুর্ঘটনা ঘটতে কতক্ষণ সময় লাগে! আর এমন একটি অনুষ্ঠান, যেখানে আমার সন্তানরা অংশীদার। আমাদের শিশু, নারীরা আসেন। তাদের দেখার দায়িত্বে নিতে হয়। বাংলা একাডেমিতে একসময় কিভাবে নারীরা হেনস্থার শিকার হয়েছিল তা দেখেছি। সে জায়গায় শহীদ মিনারে যেন তা না ঘটে তা দেখতে হয়। দায়িত্বটা অনেক বড়।
এর বাইরে আবার নানা রকমের প্যাঁচাল থাকে। ধরুন, আপনি নাম ঘোষণা করছেন। অনেক নাম। কারটি আগে, কারটি পরে এ নিয়ে মাঝে মধ্যে ঝামেলা হয়ে যায়। ধরুন আমাদের মন্ত্রী আছেন ৪৫জন। এত সংখ্যক নাম ধারাবাহিকভাবে ঘোষণা করা অনেক কঠিন। এর মধ্যে কারো নাম সিরিয়ালের বাইরে যাচ্ছে কিনা, ঠিকভাবে নাম উচ্চারণ হচ্ছে কিনা সবই খেয়াল রাখতে হয়। সামান্য এদিক-ওদিক হলেই অনেকে আপত্তি করেন। লোক পাঠন। অনেকে তার নাম কেন আগে ঘোষণা করা হলো না তা জানতে চেয়ে লোক পাঠান! সরকারি দল, বিরোধী দলের নেতাদের নাম ধারাবাহিকভাবে ঘোষণা করা লাগে! কত সংগঠন, কত নেতা, উপনেতা, পাতি নেতা, ছাদি নেতা আছে! সবার নাম ঘোষণা করতে হয়।
চ্যানেল আই অনলাইন: অনেকের নাম ও সংগঠনের নাম ঘোষণা করতে দেখা যায়। এতো মানুষের নাম কিভাবে মনে রাখা সম্ভব হয় কিংবা এখানে কি কোন বিকল্প ব্যবস্থা থাকে কিনা?
অধ্যাপক মেসবাহ কামাল: কিছু নাম, যেগুলো রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের সেগুলো তালিকা সংগ্রহে থাকে। কিন্তু সবসময় সেই তালিকা পাওয়া যায় না। আর সাধারণভাবে বিভিন্ন সংগঠন আসে, তাদের মধ্য থেকে তারা তাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে একটি চিরকূট পাঠিয়ে দেন। এতে একটা মুশকিল হচ্ছে, একটি সংগঠন ধরুন পলাশী বা নীলক্ষেত। তখনই ঘোষণা করার জন্য বলা হচ্ছে। তখন তো সামনে দেখছি না। এটি অনেক ঝামেলা তৈরি করে। এই যে রাজনৈতিক দল বা নেতাদের নাম জনে জনে ঘোষণা করা, এটি আমাকে খুব পীড়া দেয়! আমার মনে হয় আমরা পলিটিক্যাল মাসেলের পুজারি হয়ে পড়ছি। আর আমাদের দেশে খুব আত্মপ্রচারের আকাঙ্খা! শহীদ মিনারে আমার নাম ঘোষিত হলো কি হলো না তাতে কি আসে যায়! আপনি এসেছেন শ্রদ্ধা জানাতে। নাম শুনতে চান কেন! আত্মপ্রচারের লিপ্সা খুব বিরক্তিকর!
চ্যানেল আই অনলাইন: প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি এলে শহীদ মিনার নিয়ে সবাই কথা বলা শুরু করেন। কিন্তু শহীদ মিনারের স্মৃতি এবং একুশের সেই ঐতিহাসিক সাক্ষ্য আগামীর জন্য সংরক্ষিত করে রাখার কোন পদক্ষেপ দেখা যায় না। অমর একুশের স্মৃতি সংরক্ষণে কি কোন পদক্ষেপ নেওয়া যায় না?
অধ্যাপক মেসবাহ কামাল: ভাষা আন্দোলনের জাদুঘর হতে পারে। আমাদের যে ঐতিহাসিক আমতলা, সেটা কি অবস্থায় আছে? সেটাকে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। একটি ঐতহাসিক স্থান। যে ঐতিহাসিক স্থান থেকে সারা বিশ্বে সাড়া পড়েছে তা সংরক্ষণের করা খুবই প্রয়োজন। এ বিষয়ে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।
চ্যানেল আই অনলাইন: শহীদ মিনারে আসছে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি। কিন্তু সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিয়ে আপনি কি বলবেন?
অধ্যাপক মেসবাহ কামাল: এটি ঠিক। অনেক বছর ধরে বিষয়টি দেখছি। শহীদ মিনারে খেটে খাওয়া মানুষের অংশগ্রহণ হচ্ছে না। একুশে ফেব্রুয়ারি বহু সংগঠন পুস্পার্ঘ্য অর্পণ করছে। কিন্তু কোন কৃষক সংগঠন দেখিনি। অথচ ভাষা আন্দোলনে কৃষক এবং কৃষকের সন্তানদের অবদান অনেক। সরকারি দল, ডানপন্থী, বামপন্থী কত দল দেখি। তাদের মধ্যে কারো কোন কৃষক সংগঠনের পক্ষ থেকে ফুল দিতে দেখলাম না! তাছাড়া এখানে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের আসার পথ বন্ধ হয়ে গেছে। কোন গার্মেন্টস সংগঠনকে দেখিনি। ঢাকা শহরে ৪০ লক্ষ গার্মেন্টস শ্রমিক আছেন। তাদের শহীদ মিনারে নিয়ে আসা যেতো। এই দিনটাতে এসব প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমাবেত করা যেতো। শ্রমজীবী মানুষকে এখানে টেনে আনার কোন পদক্ষেপ নেই। আসলে শ্রেণি বিভক্ত সমাজে আমাদের সাধারণ মানুষের গড়ে তোলা সংগ্রামগুলো এখন উচ্চবিত্তের দখলদারিত্বে পরিণত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ যেমন একটি শ্রেণির করায়ত্বে চলে গেছে, ভাষা আন্দোলনও তাই হয়েছে। কঠিন কথা, কিন্তু সত্য কথা।
চ্যানেল আই অনলাইন: এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার কোন উপায় কি নেই?
অধ্যাপক মেসবাহ কামাল: উপায় হচ্ছে সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনকে এগিয়ে আসতে হবে। রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকে সক্রিয় হতে হবে। রাজনৈতিক বেলাল্লাপনাকে সামাল দিতে হবে। এদেশে মাঝি মাল্লা, নির্মাণ শ্রমিক, রিক্সাওয়ালা, ভ্যান চালক কম নেই। আমি তো কোন রিক্সাওয়ালা সংগঠনকে দেখিনি শহীদ মিনারে আজ। মানুষ কিন্তু অত্যন্ত পরিশ্রম করে সৎভাবে জীবন পার করতে চায়। তাদের মাঝে একুশে নিয়ে কোন তাড়না দেখলাম না! তাদের সচেতন করা দরকার! যারা সৎভাবে বাঁচতে চান, চুরি করেন না, ডাকাতি করেন না, শহীদ মিনারে সেই মানুষগুলোর অংশগ্রহণ দেখতে চাই।

চ্যানেল আই অনলাইন: একুশে ফেব্রুয়ারি মূলতঃ আন্তর্জাতিক দিবস। এই দিনটি কতোটা আন্তর্জাতিকায়ন হচ্ছে বলে মনে করেন?
অধ্যাপক মেসবাহ কামাল: এটি ইউনেস্কো ঘোষিত দিবস। এ ব্যাপারে ইউনেস্কো একটি দায়িত্ব পালন করে। ইউনেস্কোর ডিরেক্টর জেনারেল এই দিবস নিয়ে বাণী দেন। আমি এবছরও দেখেছি তিনি বাণী দিয়েছেন। সারাদেশে এ বাণীটি প্রচারিত হয়। ইউনেস্কো বিভিন্ন দেশে দিবসটি যেন পালিত হয় সেটার জেন্য প্রচারণা চালায়। আমি কয়েকদিন আগে থাইল্যান্ডে ইউনস্কোর একটি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছিলাম। সেখানে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন নিয়ে কথা হয়। থাইল্যান্ডের মতো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপনের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে আমি মনে করি, আমাদের দূতাবাসগুলোর আরও অনেক সক্রিয় হওয়া উচিত। আর আমাদের ভাষা আন্দোলন নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় বিশেষ করে ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ, স্প্যানিশ, চাইনিজ, জাপানিজসহ প্রধান ভাষায় ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ লেখাগুলো অনূদিত হওয়া উচিত। অনেক প্রকাশনা হওয়া উচিত এবং এগুলো সারা বিশ্বে প্রচার করা উচিত। আমি দেখেছি পৃথিবীর বড় দেশের দূতাবাসগুলো তাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য, সংস্কৃতি প্রচার করে। আমাদের দেশের দূতাবাাস কতোটা প্রচার করে তা আমি জানি না। এক্ষেত্রে আমদের পররাষ্ট্র এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে পারে।







