সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাইবার হ্যাকের কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৮০০ কোটি টাকা লোপাট হয়ে যাওয়ার প্রথম ইঙ্গিত মিলেছিলো প্রিন্টার অকার্যকর থাকার ঘটনা থেকে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অবশ্য দাবি করেছেন, প্রথমে তারা এটিকে সাধারণ সমস্যা মনে করেছিলেন। অনেক সময় নিয়ে কিছুটা ঠিকঠাক করার পর যখন প্রিন্ট নিতে পারেন তখনই তারা টাকা বেহাত হওয়ার বিষয়টি বুঝতে পারেন।
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, হ্যাকাররা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে অন্ততঃ এক বিলিয়ন ইউএস ডলার হাতিয়ে নিতে চেয়েছিলো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের যুগ্ম পরিচালক জুবায়ের বিন হুদা অভিযোগে যে কথা জানিয়েছেন সেটা এরকম: ৫ ফেব্রুয়ারি, শুক্রবার সকাল। সাধারণতঃ সারারাত জুড়ে সুইফট ফিনান্সিয়াল ট্রান্সফারের কাগজগুলো প্রিন্ট হয়ে যায়। কিন্তু সেদিন ট্রে টা ছিলো পুরোপুরি শূন্য। তিনি আবার চেষ্টা করেন কিন্তু সুইফট সিস্টেম থেকে মেসেজগুলো সেদিন কোনোভাবেই প্রিন্ট করতে পারেননি।
সেটাকে ‘সাধারণ’ একটি সমস্যা হিসেবেই মনে করেছিলেন হুদা। সেদিন সকাল সোয়া এগারোটা নাগাদ অফিস থেকে বের হওয়ার আগে প্রিন্টারের সমস্যা সমাধানের কথা সহকর্মীদের বলে যান তিনি।
৬ ফেব্রুয়ারি শনিবার, হুদা দেখেন সুইফট সিস্টেমের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত সফটওয়্যারটি কাজ করছে না। সেটা রিস্টার্ট করতেই ভেসে উঠে, একটি ফাইল হারিয়ে গেছে বা পরিবর্তিত হয়েছে।
দুপুর ১২টা ৩০ নাগাদ আবার হুদা এবং তার টিম নতুন করে সুইফট টার্মিনাল চালু করতে সক্ষম হন। কিন্তু তখনও সেটাতে অটোমেটিক প্রিন্ট হচ্ছিলো না। ম্যানুয়ালি প্রিন্ট করতে হয়েছে। এরপরই তারা অবাক হয়ে লক্ষ করেন কিছু রিসিপ্ট। ফেডারেল রিজার্ভ থেকে নিশ্চিত হওয়ার জন্য ফেরত এসেছে ৪৬টি পেমেন্ট অর্ডার।
হুদা জানান, আমাদের দিক থেকে আমরা আমাদের সিস্টেমে ওই সব পেমেন্ট অর্ডারের ব্যাপারে কোনো ডেবিট কনফার্মেশন পাইনি।
“মনে হচ্ছিলো সমস্যাটা এতো বড় যে কম্পিউটারও সেটা বুঝতে পারছে না। এরপরই বাংলাদেশ ব্যাংক সুইফটে যোগাযোগ করে এই অর্থ স্থানান্তরের ব্যাপারে ব্যাখ্যা জানার জন্য। পরবর্তী কোনো নোটিশ না দেওয়া পর্যন্ত নিউ ইয়র্কে ফেডারেল রিজার্ভ থেকেও আর কোনো টাকা স্থানান্তর না করার কথা জানানো হয়।”
শনিবার ও রবিবার চেষ্টা করেও নিউ ইয়র্কের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কারণ সাপ্তাহিক ছুটির সময় ছিলো সেটি।
৮ ফেব্রুয়ারি সোমবার সুইফট সিস্টেমে যোগাযোগ আবার শুরু হয়। তারপর ব্যাংক কর্মকর্তারা দেখেন সেখানে চারটি আনঅথরাইজ সুইফট মেসেজ পাঠানো হয়েছে যাতে ১০১ মিলিয়ন ডলার ফিলিপিন্স এবং শ্রীলঙ্কায় পাঠানোর কথা বলা হয়েছে।
এরপরই সাথে সাথে সুইফট সিস্টেমের মধ্যে দিয়ে ফেডারেল রিজার্ভকে রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং কর্প, ব্যাংক অব নিউ ইয়র্ক মেলন, সিটিগ্রুপ ইনক, ওয়েলস ফার্গো অ্যান্ড কোং এবং প্যানি এশিয়ান ব্যাংকিং কর্প ইন শ্রীলঙ্কায় টাকা স্থানান্তর না করার জন্য ইমেইল ও ফ্যাক্সে মেসেজ দেওয়া হয়।
হুদা তার অভিযোগে আরো বলেন, রিজাল ব্যাংকে চারটি মেসেজের মধ্যে দিয়ে ৮১ মিলিয়ন ডলার স্থানান্তর করা হয়। প্যান এশিয়া ব্যাংকিংয়ে ২০ মিলিয়ন পাঠানো হয় একবারে। বাকি ৮৫০ মিলিয়ন ডলার স্থানান্তর প্রক্রিয়া স্থগিত করা হয়।
প্যান এশিয়া ব্যাংকিংয়ে ২০ মিলিয়ন ট্রান্সফারের কথা থাকলেও অর্থের পরিমাণ এবং বেনিফিশিয়ারির নাম দেখে সন্দেহ হয় সেই ব্যাংকের কর্মকর্তাদের। তদন্তের স্বার্থে সেই বেনিফিশিয়ারি সম্পর্কে আর বিস্তারিত তথ্য প্রদান করতে চাননি ব্যাংকের মার্কেটিংয়ের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার নালাকা উইজায়াওয়ারদানা।






