কুষ্টিয়ার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষ আন্দোলন গড়ে তুলেছেন, তারা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাস্তবায়ন চান। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কুষ্টিয়ার শিলাইদহে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন। ১৯৭২ সালে কলকাতায় এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন সেকথা। আটত্রিশ বছর পর বঙ্গবন্ধুর সে স্বপ্ন বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
২০১৫ সালে এসে তা বাস্তবায়ন হলো ঠিকই, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর উচ্চারিত বক্তব্য ও তার দেখা স্বপ্নের সঙ্গে কিছুটা অমিল থেকে গেল। পশ্চিবঙ্গের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে রবীন্দ্রস্মৃতি বিজড়িত আরেক ক্ষেত্র সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে।
গত ৮ মে রবীন্দ্রনাথের জয়ন্তীতে শাহজাদপুরে আয়োজিত জাতীয় অনুষ্ঠানে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করে এসেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম। ইতোমধ্যে দেশের ৩৫তম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ‘রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়’ সংক্রান্ত খসড়া আইন মন্ত্রিভায় অনুমোদন লাভ করেছে। সম্পন্ন হয়ে গেছে অন্যান্য দাপ্তরিক প্রক্রিয়াও। ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষ থেকেই শুরু হয়ে যাবে বিশ্বদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রম। বিশ্বাস করা উচিৎ যে, উচ্চ শিক্ষানিকেতন হিসেবে এ বিশ্ববিদ্যালয়টি অবশ্যই ফুটিয়ে তুলবে তার স্বাতন্ত্র।
কিন্তু কুষ্টিয়ার কি হবে? রবীন্দ্রনাথের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশের সঙ্গে যে কুষ্টিয়ার সংশ্রব, সেখানকার মানুষের চার দশকের লালিত স্বপ্ন এভাবে জলাঞ্জলি যাবে? এই আক্ষেপেরও সান্তনা আছে সরকারের কাছে, তা হলো কুষ্টিয়াতেও রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ক্যাম্পাস হবে। শাহজাদপুরে বিশ্ববিদ্যালয়টির মাথা থাকবে, সেখান থেকে কুষ্টিয়া ক্যাম্পাসের সঙ্গে থাকবে বাস যোগাযোগ। ছাত্র, শিক্ষক গবেষকরা ছুটে বেড়াবেন। হতেই পারে।
পূর্ণাঙ্গ নকশার চেহারাটি দেখা না গেলে অবশ্য কল্পনাও করে ওঠা যাচ্ছে না ঠিকমতো। কিন্তু এতে কুষ্টিয়ার মানুষ তুষ্ট হতে পারেননি। তারা ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু তাদেরকে শান্ত করেছেন নগদ একটি প্রতিশ্রুতি দিয়ে। কুষ্টিয়াতেও রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় হবে। তবে তা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়। অবশ্য তিনি বলেছেন, সেখানে সরকারেরও কিছু অংশীদারিত্ব থাকবে।
তাহলে দাঁড়াচ্ছে কি? কুষ্টিয়াতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, শাহজাদপুরের রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ক্যাম্পাস হবে আর হবে একটি প্রাইভেট রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়। দু’দিন পর নওগাঁর পতিসর বলবে আমরা কী দোষ করেছি? খুলনার দক্ষিণডিহি বলবে, রবি ঠাকুরের শ্বশুরালয়ের দিকে কোনো সরকারেরই দৃষ্টি নেই। সরকার সেখানে গিয়েও হয়তো অাশ্বাস দিয়ে আসবে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের। ওঁৎ পেতে থাকা কাড়ি কাড়ি টাকার মালিকরা শিক্ষা বাণিজ্যে টাকা ঢালবে ওই জায়গাগুলোতে।
সরকারও এক পা এগিয়ে এসে বলবে, আসুন আমরা পিপিপি (পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ) করি। আর এভাবেই বিস্তৃতি পেয়ে যাবে ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়া লাগামহীন শিক্ষা বাণিজ্যের উপদ্রুত এলাকা। সরকার ও তার সুগভীর চিন্তার নীতি নির্ধারকদের মাথায় বিষয়টি সহজেই ধরা দেবে বলে বিশ্বাস করি।
আমি বলতে চাই, কুষ্টিয়াতে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়ন না হয়ে ভালোই হয়েছে। শুধু রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ই কুষ্টিয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। কুষ্টিয়াতে যে বিশাল মূল্যবান সাধনবৃক্ষ রয়েছে তার মূল্যায়নের জন্যই একটি বিদ্যায়তনের প্রয়োজন পড়ে। ফকির লালন সাঁইয়ের চিন্তা ও সৃষ্টি পৃথিবীর সব যুগেই শিক্ষার এক বড় খোরাক। সাধক সাংবাদিক কাঙাল হরিনাথ মজুমদারও বাঙালির বিকশিত চিন্তা ও চেতনার পেছনে এক বিশাল শক্তি। যে শক্তির সঙ্গে আছে তথ্য ও তত্ত্ব। আজকের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও কাঙাল হরিনাথ ও তার কাজ এক নীতিনিষ্ঠ শিক্ষকের ভূমিকা পালন করতে পারে, কিন্তু গভীর গবেষণা হয়েছে সামান্যই।
মীর মশাররফ হোসেন, কবি আজিজুর রহমান, আকবর হোসেন, দাদ আলী, জলধর সেন, ড. কাজী মোতাহার হোসেনসহ অসংখ্য গুণীজন কুষ্টিয়াকে বহুকাল আগেই পরিণত করে গেছেন ‘স্বশিক্ষণের পাঠশালা’য়। যেখানে তৃণমূলের একজন সাধারণ কৃষক, রিক্সাচালক বা স্টেশনের চায়ের দোকানে ঘুরঘুর করা একজন ভিখেরির বিবেচনাশক্তিও আজকের অনেক বুদ্ধজীবী ও রাজনীতিবিদকে হার মানাবে।
এই কুষ্টিয়ার সঙ্গে জীবনের গভীর সম্পর্ক ছিল বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তম কুমারের। কুষ্টিয়াতেই জন্ম বাংলা চলচ্চিত্রের জীবন্ত কিংবদন্তি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের। এমন বহু নাম রয়েছে যারা জীবন ও শিক্ষার বৈচিত্রময় ধাপে নিজেদেরকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। দেশের অন্যতম প্রধান সঙ্গীতশিল্পী আব্দুল জব্বার ও ফরিদা পারভীন কুষ্টিয়ার সন্তান। যারা বাংলার গর্ব হয়ে পৃথিবী কাঁপাচ্ছেন।
এমনকি দেশের শিক্ষা ও গবেষণায় কুষ্টিয়ার বিখ্যাত দুই সন্তান ড. প্রফেসর আনোয়ারুল করীম ও ড. প্রফেসর আবুল আহসান চৌধুরীর সমকক্ষ হয়ে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই আজতক। দেশের স্থানীয় সরকার কাঠামো ও তৃণমূলের জীবন ব্যবস্থার উন্নয়নের রূপকার প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী ছিলেন কুষ্টিয়ার সন্তান। সৃজনশীলতা ও কর্মের সুবিশাল ও অতুলনীয় ঐতিহ্যের পরও কুষ্টিয়ায় কেনো এতদিনেও দেশের প্রধান ও বৃহৎ সাংস্কৃতিক বিশ্বদ্যালয় গড়ে তোলার চিন্তা কোনো সরকার ও নীতিনির্ধারকের মাথায় এলো না, সেই প্রশ্ন জাগে।
কুষ্টিয়ায় আছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। উচ্চ বিদ্যানিকেতন হিসেবে খাটো করে না দেখার সুযোগ নেই। ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়ার সীমান্তে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি বহু মানুষের জ্ঞানতৃষ্ণা পুরণ করছে। কিন্তু বাংলার ভাবদর্শন আর অগণিত জ্ঞানতাপসের চিন্তার প্রাণকেন্দ্র যে কুষ্টিয়া বহুযুগ আগেই সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে, সেই কুষ্টিয়ার সাস্কৃতিক ঐতিহ্যের বিবেচনাটি ওই বিদ্যায়তনে একেবারেই গৌণ।
সে কারণেই কুষ্টিয়ায় হতে হবে বাংলার একমাত্র ‘সাংস্কৃতিক বিশ্ববিদ্যালয়’। পৃথিবীর সকল সংস্কৃতির তুলনামুলক চর্চা থেকে শুরু করে হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির বহুমুখি দিক নিয়ে গবেষণা হবে যেখানে। রাজনীতি চর্চার জন্য থাকবে বিশেষ বিষয় ও অনুষদ। প্রচলিত রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সঙ্গে যেখানে যুক্ত হতে থাকবে মানবতা, অাধ্যাত্মবাদ ও তত্বসাধনা। যেখান থেকে নতুনভাবে জেগে উঠবে আদি বাঙালি সংস্কৃতি।
এযাবৎকাল মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে যতরকমভাবে বিকৃত করা হয়েছে তারও সময়োপযোগী গবেষণা সম্ভব হবে মুক্তিযুদ্ধের সুতিকাগারে স্বপ্নের “সাংস্কৃতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে”।
আদিত্য শাহীন, বার্তা সম্পাদক, চ্যানেল আই
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)





