দেশের যে কোনো ব্যক্তির বসবাসের জন্য একটা ঘর পাওয়া মৌলিক অধিকার যা সাংবিধান দ্বারা বিধিবদ্ধ। এই অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিগত দিনে সরকারগুলোকে তেমন কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করতে দেয়া যায়নি। নিম্ন এবং মধ্যআয়ের মানুষদের মধ্যে বণ্টনের জন্য ২০০০ সালে রাজউক ঢাকার উত্তরায় ২২,০০০ ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করে যার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয় ২০১০ সালে। এই প্রকল্পের কাজ অনেক দূর এগিয়েছে বলে সাংবাদ মাধ্যম জানাচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো ফ্ল্যাট বরাদ্দপ্রাপ্তদের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি।
ঢাকায় নিজস্ব জমি বা ফ্ল্যাট আছে এমন কারো এখানে বরাদ্দ পাওয়ার কথা না থাকলেও এখানে অনেকেই একাধিক স্থাবর সম্পত্তির মালিক হওয়া সত্বেও বরাদ্দ পেয়েছেন; নিম্ন এবং মধ্যআয়ের লোকদের বাইরেও বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। উত্তরা এপার্টমেন্ট প্রকল্পই একমাত্র গৃহায়ন প্রকল্প যা নিম্ন এবং মধ্যআয়ের মানুষদের জন্য সরকার গ্রহণ করেছে। ২ কোটি মানুষের ঢাকা শহরে ২২,০০০ ফ্ল্যাট প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল।
২০১৪ সালে গ্রামীণ কমিউনিটি আবাসনের একটি প্রকল্প নিয়ে গণমাধ্যমে আলোচনা হয়। সে প্রকল্প এখন কোথায়, কোন অবস্থায় আছে তার হদিস সংবাদ মাধ্যমে নেই। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত যতগুলো আবাসন প্রকল্প সরকার বাস্তবায়ন করেছে তার প্রায় সবই বরাদ্দ করা হয়েছে এমপি, মন্ত্রী, আমলা, সেনাবাহিনী, সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতা ইত্যাদিদের মধ্যে বণ্টন করা হয়েছে। দরিদ্র এবং গৃহহীন মানুষ সরকারের কাছ থেকে গৃহায়ন বাবদ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ত্রাণ হিসেবে কয়েকটি টিন ছাড়া আর কিছুই পায়নি।
বেসরকারী খাতে গৃহায়ন সমস্যা সমাধানের চেষ্টা হয়েছে যথেষ্ট। স্বাধীনতার পরাপর ইস্টার্ন হাউজিং এই প্রচেষ্টা শুরু করে যার ধারাবাহিকতায় এখন কয়েকশ ডেভেলপার এই সেবা প্রদানে কাজ করে যাচ্ছে। বেসরকারী খাতে যত প্রকল্প আছে তার প্রায় সবই ঢাকা শহরে; কিছু আছে চট্টগ্রামে। অন্যান্য শহরে সবে শুরু হয়েছে। এই ডেভেলপারগণ জমি এবং ফ্ল্যাট বিক্রয় করে থাকে। এদের বেশিরভাগ কিস্তিতে বিক্রয় করে। এরা ডাউনপেমেন্ট গ্রহণ করার পর টিনের চশমা দিয়ে চেহারা বদলে ফেলে। ক্রেতাদের ভোগান্তি শুরু হয়। কিস্তির টাকা শোধ হওয়ার পরেও জমি বা ফ্ল্যাট হস্তান্তর না হওয়া এদেশে স্বাভাবিক। তবে নিশ্চয়ই এ কথা সকলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। অতি নগণ্য সংখ্যক হলেও ভালো ডেভেলপার আছেন যারা প্রচলিত নিয়মের ব্যতিক্রম।
সাধারণভাবে, ডেভেলপাররা মাছের তেলে মাছ ভাজা নীতিতে চলেন। এরা ক্রেতার কাছ থেকে অগ্রীম গ্রহণ করে জমির মালিককের দাম শোধ করেন, দালান গড়ে তোলেন তারপর সেই দালানের ফ্ল্যাট ক্রেতার কাছে হস্তান্তর করেন। এ কাজে তাদের মূলধন মূলত সন্ত্রাস এবং বিপণন খরচ। একটি অফিস স্থাপন এবং জমি বা ফ্ল্যাট বিপণনের জন্য তাদের কিছু টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। জমির মালিকের কাছ থেকে দখল নেয়া এবং বিক্ষুব্ধ ক্রেতাদের সামলানো পোষ্য সন্ত্রাসীদের কাজ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নির্মাণ আইন না মেনে দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে বিল্ডিং প্ল্যান অনুমোদন করানো হয়। খুন-খারাবী এই ব্যবসায়ের সহজাত ঝুঁকি। সাধারণ মানুষ ডেভেলপারদের ভূমিদস্যু হিসেবে বিবেচনা করে।
ঢাকা শহরে ডেভেলপারদের ব্যবসায়ে মন্দা যাচ্ছে বলে পত্রিকায় লেখা হচ্ছে ২০১১ সাল থেকে। ২০১৬-১৭ সালের বাজেট প্রতিক্রিয়ায় ডেভেলপারদের সংগঠন, রিহ্যাব জানায় ২০১৩ সালের রাজনৈতিক সহিংসতার পর থেকে এ পর্যন্ত তাদের ৮০% ফ্ল্যাট অবিক্রীত রয়েছে। অবিক্রীত থাকার কারণ হিসেবে বিদেশে নোংরাটাকা (কালোটাকা) পাচারকে প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরেছে ব্যবসায়ীদের এই সংগঠন। তাদের ভাষ্যমতে, এই টাকা বিদেশে পাচাররোধ করা গেলে এর বড় অংশ আবাসন খাতে বিনিয়োগ হতে পারতো।
বেসরকারী আবাসন খাতের সঙ্কট কাটিয়ে ওঠার জন্য রিহ্যাব প্রাক-বাজেট বৈঠকে ১৩টি প্রস্তাব এফবিসিসিআই এর মাধ্যমে সরকারকে দিয়েছিল যার কোনোটি বাজেটে গ্রহণ করা হয়নি বলে তারা সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন। রিহ্যাবের ১৩ দফা প্রস্তাবের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে: ক) ঢাকার বাইরে ১০ বছরের জন্য কর অবকাশ খ) আবাসন প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্য ব্যাংক সুদের হার এক অংকে নামিয়ে আনা গ) রেজিস্ট্রেশন কর কমিয়ে দেয়া ঘ) জমি বা ফ্ল্যাট বিক্রির সময়ে উৎসে ভ্যাট এবং আয়কর কর্তনের বিধান রহিত করা ঙ) নিম্ন এবং মধ্যে আয়ের লোকদের জন্য ২০,০০০ কোটি টাকার আবাসন তহবিল সৃষ্টি করা চ) জমি এবং ফ্ল্যাটে বিনিয়োগকৃত টাকার উৎস সম্পর্কে দুর্নীতি দমন কমিশনের তথ্যাদি জানতে না চাওয়া।
বাজেট প্রতিক্রিয়ায় এবং বিভিন্ন পাবলিক অনুষ্ঠানে রিহ্যাব নিজেদের যেভাবে উপস্থাপন করে তাতে মনে হয় এই ব্যবসা পুরোপুরি কালোটাকার উপর নির্ভরশীল। অর্থমন্ত্রণালয়ের ২০১১ সালের গবেষণা পত্র, ‘Underground Economy of Bangladesh: An Econometric Analysis,’ অনুযায়ী ২০০৯ সালে দেশের অর্থনীতিতে ৬২.৭৫% কালোটাকা ছিল যার পরিমাণ ৫ লক্ষ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল অংকের বেআইনি টাকার উপর ভরসা করে রিহ্যাব বিভিন্ন রকমের রাষ্ট্রীয় নীতিগত প্রণোদনা চেয়ে আসছে বেশ কয়েক বছর ধরে। সরকার বেআইনি টাকা ব্যবহারের উপর যথেষ্ট নীতিগত প্রণোদনা দিচ্ছে না বলে খেপে আছে রিহ্যাব নেতারা।
সরকার এক্ষেত্রে একটি সুবিধা এখনো দিয়ে যাচ্ছে: প্রচলিত কর আইন অনুযায়ী, অপ্রদর্শিত আয় যদি যথাযথ কর এবং ১০% জরিমানা প্রদান করে স্থাবর সম্পদে বিনিয়োগ করা হয় তবে কর কর্তৃপক্ষ অর্থের উৎস সম্পর্কে জানতে চাইবে না। তবে, সরকারের অন্যান্য কর্তৃপক্ষ অপ্রদর্শিত আয়ের উৎস সম্পর্কে জানতে চাইতে পারে। এখানেই রিহ্যাবের প্রধান আপত্তি। তারা চায় স্থাবর সম্পত্তিতে বিনিয়োগকৃত অর্থের উৎস সম্পর্কে কেউ কোনো প্রশ্ন করতে পারবে না। অন্য কথায়, রিহ্যাব দুর্নীতি বা বেআইনি পন্থায় অর্জিত অর্থ আইনের সহায়তায় সাদা করতে চায়, অন্যায়কে প্রশ্রয় দিতে চায়।
২০১১ পূর্ববর্তী সময়ে স্থাবর সম্পত্তিতে বিনিয়োগের জন্য বেশ কিছু রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা ছিল যার অন্যতম হচ্ছে: সম্পত্তির ক্ষেত্রে এসব সুবিধা দেয়ার ফলে ডেভেলপারদের বাজার রমরমা হয়ে উঠেছিল। জামায়াত-বিএনপি জোট সরকার এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় অর্জিত দুর্নীতির টাকা এই খাতে ব্যাপকভাবে বিনিয়োগ হয়েছিল। ফলে হু হু করে জমি এবং ফ্ল্যাটের দাম বেড়েছে। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে ফ্ল্যাটের দাম প্রতি বর্গফুট ২,০০০ টাকা থেকে বেড়ে এ সময়ে ১০/১২ হাজার টাকায় উঠে যায়। স্থাবর সম্পত্তির দাম নিম্ন মধ্যবিত্ত দূরে থাক মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যায়। সে সময়ের মধ্যবিত্ত পরিবারের গড় আয় যে পর্যায়ে ছিল তাতে এক জীবনের সঞ্চয় দিয়ে ঢাকা বা চট্টগ্রাম শহরে বাড়ি দূরে থাক ফ্ল্যাট কেনাও সম্ভব ছিল না। এ পরিস্থিতি আবাসন বেলুনের সৃষ্টি করে যা চুপসে গিয়ে ইউরোপ, আমেরিকার মতো অর্থনৈতিক ধ্বস সৃষ্টি করতে পারত। যথা সময়ে বিভিন্ন কর এবং মুদ্রানীতি ব্যবহার করে সরকার সে পরিস্থিতি সামাল দেয়; তথাকথিত প্রণোদনা আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে যায়।
আবাসন ব্যবসার রমরমা অবস্থা কেটে গেলেও রিহ্যাব সদস্যরা মাত্রাতিরিক্ত লাভের আশায় ফ্ল্যাটের বা জমির দাম এখন পর্যন্ত কমায়নি। তুলনামূলক ছোট ব্যবসায়ীরা সঙ্কুচিত বাজারে টিকে থাকার জন্য দাম কমিয়ে বিনিয়োগকৃত অর্থ তুলে নিয়ে এসেছে। এতে তাদের লোকসান হয়নি, লাভ কম হয়েছে। বড় ব্যবসায়ীরা সে পথে যায়নি, তারা সরকারের উপর চাপ প্রয়োগ করে আইন বদলে বেশি ব্যবসা করার স্বপ্নে বিভোর হয়ে আছে। রিহ্যাব যে সকল আইনি অবকাঠামো দাবী করছে তা মেনে নিলে দুর্নীতি এবং বেআইনি কর্মকাণ্ড উৎসাহিত হবে, ২০,০০০ কোটি টাকার তহবিল ভূমিদস্যুরা লুটেপুটে খাবে; আবার নতুন করে আবাসন বেলুনের সৃষ্টি হবে; অর্থনীতি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে। নোংরাটাকা মূলধারা অর্থনীতিতে গ্রহণ করা অনৈতিক এবং অর্থনীতি বিকাশের অন্তরায়। দুর্নীতি, দুস্কর্মকে প্রশ্রয় দিয়ে কোনো সমাজ কোনো কালে উন্নতি করতে পারেনি বরং অধঃপাতেই নিপতিত হয়েছে।
জাতীয় গৃহায়ন নীতি ২০০৮ সাল থেকে খসড়া অবস্থায় পড়ে আছে। আবাসন অধিকার নিশ্চিত করার জন্য দরকার একটা পূর্ণাঙ্গ আবাসন নীতি যার বাস্তবায়ন শুধু বড় বড় শহরেই নয়, গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত নিম্ন এবং মধ্য আয়ের মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক সুরক্ষা এবং সম্পর্ক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে; প্রগতিশীল একটি সমাজ গঠন করবে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







