কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সদ্যপ্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা, স্থপতি ও বরেণ্য আবৃত্তিশিল্পী কাজী আরিফকে ফুলের শ্রদ্ধা জানিয়েছেন সর্বস্তরের মানুষ। আজ মঙ্গলবার সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের ব্যানারে এ নাগরিক শ্রদ্ধানুষ্ঠানের প্রথমেই মুক্তিযোদ্ধা কাজী আরিফকে ম্যাজিস্ট্রেট রবীন্দ্র চাকমার নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল গার্ড অব অনার দেয়।
এরপর কাজী আরিফের মরদেহে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগ, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, কথা আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্র, বাংলাদেশ গণসঙ্গীত সমন্বয় পরিষদ, ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠী, কণ্ঠশীলন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ, ইঞ্জিনিয়ার ইনস্টিটিউশন, প্রাচ্যনাট, বুয়েট এলামনাই, হরবোলা, স্রোত আবৃত্তি সংসদ, পদাতিক নাট্য সংসদসহ আরও কয়েকটি সংগঠন।
শ্রদ্ধা জানান সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা। এদের মধ্যে নাসির উদ্দিন ইউসুফ, রামেন্দু মজুমদার, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুস, সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ, আবৃত্তিশিল্পী শিমুল মোস্তফা, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী, ভাস্বর বন্দোপাধ্যায়, অভিনেতা এস এম মহসিন, অভিনেত্রী রোকেয়া প্রাচী, অগ্রজ আবৃত্তি সংগঠনের কাজী মদিনাসহ তার বন্ধু, সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ীরা।

সংস্কৃতিবষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ‘আবৃত্তিচর্চাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কাজী আরিফ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে আবৃত্তিচর্চাকে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তার অবদান অপরিসীম।’
তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘কাজী আরিফ এবং আমি একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (বুয়েট) ছাত্র ছিলাম। নিপাট ভদ্র এক ছাত্র ছিল আরিফ। তবে তার রাজনৈতিক দর্শন খুবই পরিষ্কার। প্রগতিশীল ধারার রাজনীতির মানুষ ছিলেন কাজী আরিফ। তার আবৃত্তি আমাকে সবসময় টানত। ’
নাসির উদ্দিন ইউসুফ বলেন, ‘কাজী আরিফ আমাদের একজন গর্বের মানুষ। আমার কাছে আরও আদরের হয়ে উঠলো যখন সে কবিতা পাঠ শুরু করল। আবৃত্তির মাধ্যমে আরিফ মুক্তিযুদ্ধে চেতনাকে ছড়িয়ে দিতে কাজ করেছে অবিরাম।’
রামেন্দু মজুমদার, ‘চাকরির মায়া যার মধ্যে ছিল না সে হচ্ছে কাজী আরিফ। কবিতা তাকে সব সময় তাড়িয়ে ফিরেছে। ষাটের উপরে বয়স হওয়া সত্তেও সে তরুণদের মত করে দৌঁড়েছে কবিতার সংগঠনের কাজে। একজন মুক্তিযোদ্ধা ও আবৃত্তিকর্মী কর্মী হিসেবে তার অবদান অনস্বীকার্য।
শিমুল মোস্তফা বলেন, ‘তিনি আমার জন্য অভিভাবক ছিলেন। আমাদের আবৃত্তিচর্চায় ভ্যানগার্ডের মতো ভূমিকা রেখেছেন। ক্লিনিক্যালি ডেড হয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ আগেও তার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে আমার। আমাকে খুব স্নেহ করতেন তিনি।’
কাজী আরিফের মেয়ে অনুসূয়া বলেন, ‘বাবা কবিতা খুব ভালোবাসতেন। তাই সারাদিন কবিতা পাঠ আর সংগঠনের পেছনে সময় দিয়েছেন। তিনি আমাদের বলে গেছেন কবিতাকে ভালোবাসতে। আমরা জানতাম না বাবা এত মানুষের কাছে প্রিয়। কবিতা মানুষকে মহান করে, বাবার কারণে জানতে পেরেছি। সবাই বাবার জন্য দোয়া করবেন।’

মুক্তিযোদ্ধা, আবৃত্তিশিল্পী ও স্থপতি কাজী আরিফকে আগামীকাল বুধবার দুপুরে উত্তরায় চার নম্বর সেক্টরে মায়ের কবরে সমাহিত করা হবে। তার মেয়ে অনুসূয়ার স্বামী জাভেদ বিন তাহির জানান, কাজী আরিফের আরেক মেয়ে নম্রতা কানাডায় আছেন। তিনি আজ রাতে ঢাকায় এসে পৌঁছার সম্ভাবনা আছে। তার জন্য ধানমন্ডিতে অনুসূয়ার বাসায় কাজী আরিফের মরদেহ লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়িতে রাখা হবে। এর আগে আজ মঙ্গলবার বাদ আসর ধানমন্ডি ৭ নম্বর সড়কের মসজিদে কাজী আরিফের তৃতীয় জানাজা হবে।
কাজী আরিফের মরদেহ আজ সকালে ঢাকা এসে পৌঁছে। হয়রত শাহজালাল (র.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কাজী আরিফের মরদেহ গ্রহণ করেন তার দীর্ঘদিনের বন্ধু শমরিতা হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এ বি এম হারুণসহ আরও কয়েকজন। ছিলেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের নেতারা।
গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ৫৫ মিনিটে মাউন্ট সেইন্ট লুকস হাসপাতালে কাজী আরিফকে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। গত মঙ্গলবার এই হাসপাতালে দ্বিতীয় বারের মতো তার হৃদপিন্ডে অস্ত্রোপচার করা হয়। কাজী আরিফের হার্টের বাল্ব অকেজো হওয়ায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গত মঙ্গলবার বাল্ব পুনঃস্থাপন এবং ধমনীতে বাইপাস অস্ত্রোপচার করা হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান কাজী আরিফ।

কাজী আরিফের জন্ম ১৯৫২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর, রাজবাড়ী সদরের কাজীকান্দা গ্রামে। বেড়ে উঠেছেন চট্টগ্রাম শহরে। পড়াশোনা, রাজনীতি, শিল্প-সাহিত্য এসব কিছুরই হাতেখড়ি হয় সেখানে। আবৃত্তির পাশাপাশি লেখালেখিও করতেন তিনি, সক্রিয় ছিলেন সাংস্কৃতিক আন্দোলনে।
১৯৭১ সালে ১ নম্বর সেক্টরে মেজর রফিকুল ইসলামের কমান্ডে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন কাজী আরিফ। এরপর যুদ্ধ শেষে বুয়েটে লেখাপড়া শুরু করেন আর সাথে সমান তালে এগিয়ে যেতে থাকে তার শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি। বাংলাদেশের আবৃত্তিশিল্পের অন্যতম রূপকার কাজী আরিফ। তিনি মুক্তকণ্ঠ আবৃত্তি একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা এবং বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য।









