মানবদেহে মারাত্মক করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত প্রক্রিয়ায় ভুল রয়েছে বলে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কেননা অনেকগুলো দেশে এমন ঘটনা ঘটেছে যে, সর্বোচ্চ ছয়বার পর্যন্ত পরীক্ষা করেও অনেকের দেহে ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া না গেলেও পরে ঠিকই তাদের পরীক্ষা পজেটিভ এসেছে!
বিশ্বজুড়েই করোনা ভাইরাস এখন এক আতঙ্কের নাম। নতুন নাম ‘কোভিড-১৯’ দেয়া হলেও এখনো করোনা ভাইরাস হিসেবেই এটি বেশি পরিচিত। চীন ও বিশ্বের অন্যান্য দেশ মিলিয়ে এ পর্যন্ত ভাইরাসটিতে আক্রান্তের সংখ্যা ৭১ হাজারের বেশি। মৃত্যু হয়েছে প্রায় ১৭০০ জনের।
অনেকে আবার করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত নন, ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় তা প্রমাণিত হওয়ার পর কোয়ারেন্টাইন ও নজরদারি থেকে মুক্তিও পেয়ে যাচ্ছেন।
এই নেগেটিভ পরীক্ষার ফলধারীরা সত্যিই ভাইরাস মুক্ত, নাকি তাদেরকে যে পরীক্ষার মাধ্যমে নিরাপদ ঘোষণা করা হয়েছে সেই পরীক্ষায় ত্রুটি আছে, তা নিয়ে এখন সন্দেহ দেখা দিয়েছে।
চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে কোভিড-১৯-এ আক্রান্তদের গণনা করার পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনেছিল চীন সরকার। ভাইরাসের উৎপত্তিস্থল হিসেবে বিবেচিত দেশটির হুবেই প্রদেশ থেকে নতুন প্রক্রিয়া গণনা শুরু হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হওয়ার জন্য পরীক্ষা না করে শুধু লক্ষণের ওপর নির্ভর করে গণনা শুরু করেছিলেন।
আর এর পরপরই নতুন আক্রান্তের সংখ্যা হুট করে বেড়ে গিয়েছিল অনেক বেশি। একদিনেই প্রায় নতুন ১৫ হাজার ভাইরাস আক্রান্তের তথ্য এলো, যা এই মহামারীর মোট আক্রান্তের সংখ্যার প্রায় চার ভাগের এক ভাগ।
তবে তারপর থেকে গত চারদিনে সংখ্যাটি ধীরে ধীরে কমে এসেছে।
রোববার চীনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ওইদিন দেশজুড়ে এ ভাইরাসে ১০০ জন মারা গেছেন, যেখানে শনিবার সংখ্যাটি ছিল ১৩৯ জন। আর সোমবার পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় চীনে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা ২০৪৮ জন।
শনাক্তকারী পরীক্ষাটি কেমন?
পরীক্ষাটিতে মূলত মানবদেহে করোনা ভাইরাসের জিনেটিক কোড খুঁজে বের করা হয়।
প্রথমে রোগীর দেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। তারপর পরীক্ষাগারে যদি নমুনায় সন্দেহজনক কোনো ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া যায়, তবে সেটির জিনেটিক কোড আলাদা করে চিহ্নিত করে বারবার কপি করা হয় যেন কোডটি অতিক্ষুদ্র পরিমাণ থেকে অনেক বেড়ে যায় এবং তার প্রকৃতি শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
‘আরটি-পিসিআর’ (RT-PCR) নামক পরীক্ষাটি পুরো বিশ্বেই এইচআইভি থেকে শুরু করে ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো নানা রকম ভাইরাস শনাক্ত করার জন্য খুব বিশ্বস্ত এবং বহুল ব্যবহৃত একটি পদ্ধতি।
কিংস কলেজ লন্ডন’র ড. ন্যাটালি ম্যাকডারমট বিবিসি’কে বলেন, ‘এই পরীক্ষাগুলো সাধারণত খুবই জোরালো। এগুলোতে ভুলে পজেটিভ বা ভুলে নেগেটিভ ফল আসার হার অনেক কম।’
করোনা ভাইরাসের ক্ষেত্রে কি কিছু ভুল হচ্ছে?
‘রেডিওলজি’ নামক জার্নালে সম্প্রতি প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৬৭ জন রোগীর স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর তাদের মধ্যে ৫ জনের ক্ষেত্রে ফলাফল নেগেটিভ এসেছিল। যদিও তখনই তাদের ফুসফুস স্ক্যান করে দেখা গিয়েছিল তারা অসুস্থ। ওই ৫ জনকে পরবর্তী সময়ে আবার পরীক্ষা করে দেহে ঠিকই কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাস পাওয়া গেছে।
প্রথমে কয়েক দফা পরীক্ষায় ভাইরাস না পেয়ে পরে আবার সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার এরকমই আরও অসংখ্য ঘটনার দাবি করেছেন আক্রান্ত আরও অনেকে।
এদের মধ্যে রয়েছেন চীনের উহান শহরের সেই চিকিৎসক, ডা. লি ওয়েনলিয়াং, যিনি প্রথম করোনা ভাইরাস নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন এবং নিজেই পরে এতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

তিনিও বলেছিলেন, তাকে বেশ কয়েকবার নানারকম পরীক্ষা করার পরও প্রত্যেকবার করোনা ভাইরাসের টেস্ট রিপোর্ট নেগেটিভই আসছিল। অবশেষে ৩০ জানুয়ারি নিউক্লিয়িক অ্যাসিড টেস্টের ফলাফল পজেটিভ আসে। ওই দিনই চীনের সোশ্যাল মিডিয়া উইবোতে পোস্ট দিয়ে পুরো বিষয়টি জানান এই চিকিৎসক।
চীনের বেশ কয়েকজন সাংবাদিকও করোনা আক্রান্ত এমন রোগী বের করেছেন, যাদেরকে পরপর ৬ বার পরীক্ষা করেও ভাইরাস পাওয়া যায়নি। অথচ সপ্তমবার ঠিকই নিশ্চিত হওয়া গেছে যে তারা আগেই এ ভাইরাসে আক্রান্ত।
চীন ছাড়াও সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডসহ কোভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়া অন্যান্য বেশ কয়েকটি দেশে একই ধরনের ঘটনা ঘটার খবর পাওয়া গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন’র ডা. ন্যান্সি মেসোনিয়ার বলেছেন, তার সংস্থা করোনা শনাক্তের যতগুলো পরীক্ষা করেছেন তার মধ্যে কয়েকটিতে ‘অনিশ্চিত’ ফলাফল দেখাচ্ছে।
অনিশ্চয়তার সম্ভাব্য কারণ
# প্রথমে রোগ ধরা না পড়ে পরে শনাক্ত হওয়া মানেই যে পরীক্ষাটি ভুল, তা না-ও হতে পারে। একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে: পরীক্ষাগুলো নির্ভুলই আছে। আসলে প্রথমে যখন নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছিল তখন রোগীরা করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন না।
তাছাড়া এখন চীনে সর্দিজ্বর ও ঠাণ্ডার মৌসুম চলছে। হতেই পারে যে রোগীরা তাদের ঠাণ্ডাজ্বরকে করোনা ভাইরাসের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলছেন। কারণ দু’টো রোগের উপসর্গ একই ধরনের।
ড. ম্যাকডারমট বলেন, ‘হয়তো তারা আগে আক্রান্ত ছিলেন না। কিন্তু পরে ভাইরাসের সংস্পর্শে এসে তারা এতে আক্রান্ত হয়ে যান এবং পরের পরীক্ষায় করোনা ভাইরাস পজেটিভ আসে।’
# আরেকটা কারণ হতে পারে যে, প্রথম দিকে যখন আরটি-পিসিআর পরীক্ষা করা হয়েছিল তখন করোনা ভাইরাসের পরিমাণ এতটাই কম ছিল যে নমুনা পরীক্ষায় জিনেটিক কোড অনেক বাড়িয়েও তা শনাক্ত করার অবস্থায় নেয়া যায়নি।
‘কিন্তু ছয়বার পরীক্ষার পরে নিশ্চয়ই এই যুক্তি আর খাটবে না,’ বলেন ড. ম্যাকডারমট।
# তাছাড়া পরীক্ষা পদ্ধতিতেও থাকতে পারে ত্রুটি।
করোনা ভাইরাসের ক্ষেত্রে একের পর এক রোগীর থুতুর নমুনা নিতে হচ্ছে ল্যাবকর্মীদের। তাদের গলার ভেতর তুলো লাগানো কাঠি ঘষে নমুনা সংগ্রহ করা হয়।
‘তো সেই ঘষাটা কি হালকা করে দেয়া হচ্ছে, নাকি ভালোভাবে?’ প্রশ্ন রাখেন ড. ম্যাকডারমট।
সংগৃহীত নমুনাগুলো ঠিকঠাকভাবে সংরক্ষণ বা নাড়াচাড়া না করলে সেগুলো থেকে সঠিক ফল না-ও পাওয়া যেতে পারে।
# এছাড়াও বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, যে ডাক্তার বা ল্যাব কর্মীরা নমুনা সংগ্রহ করছেন, তারা সঠিক জায়গা থেকে নমুনা নিচ্ছেন কিনা। কেননা নাক, গলা বা কণ্ঠের অন্যান্য সংক্রমণের ক্ষেত্রে কণ্ঠের সামনের দিকের নমুনা নিলেও চলে। কিন্তু করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ফুসফুসের গভীর পর্যায়ের একটি সংক্রমণ হওয়ায় কণ্ঠনালীর ভেতরের দিকের নমুনা নেয়া প্রয়োজন।
# ভাইরাস পজেটিভ হয়েও নেগেটিভ আসার সর্বশেষ কারণ হতে পারে যে, নতুন করোনা ভাইরাসের জন্য যে আরটি-পিসিআর পরীক্ষাটি করা হচ্ছে সেটিই ত্রুটিপূর্ণ বিজ্ঞানের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত।
পরীক্ষাটির জন্য পরীক্ষাকারী গবেষকদেরকে প্রথমে ভাইরাসের জিনেটিক কোডের এমন একটি অংশ বেছে নিতে হয় যেটিতে সময়ের সাথে পরিবর্তন আসবে না বলে তারা মনে করেন। একে ‘প্রাইমার’ বলা হয়।
এই প্রাইমারের সঙ্গে নমুনায় থাকা ভাইরাসের কোড ভালোভাবে মিলে গেলে এর সাহায্যে নমুনার ভাইরাসটির জিনেটিক কোডকে কপি করে পরিমাণে বাড়ানো হয়। কিন্তু এই মিল যদি কম হয় তখন পরীক্ষার ফলাফল নেগেটিভ আসতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে আসলে নিশ্চিতভাবে কিছুই বলা সম্ভব হয় না। তবে ড. ম্যাকডারমটের মতে, ফলাফল নেগেটিভ আসার পরও যদি উপসর্গগুলো থেকে যায় তবে পরে আবারও পরীক্ষা করানো দরকার।








