মাত্র ৫২ বছর বয়স। অনেকটা দ্রুত এবং হুট করেই পৃথিবীর মায়া ছাড়লেন শেন ওয়ার্ন। অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি স্পিনার গত হলেও দুর্দান্ত সব পারফরম্যান্স তাকে বাঁচিয়ে রাখবে দর্শক-সমর্থকদের মনে। অনেকটা এমন, ক্রিকেট যতদিন থাকবে অথবা ক্রিকেটের ইতিহাস যতদিন লেখা হবে, ওয়ার্নের নাম অবধারিতভাবে উপরের সারিতে স্থান করবে।
বল অব দ্য সেঞ্চুরি: জুন, ১৯৯৩
পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরপারে পাড়ি জমানো কিংবদন্তি অজি লেগস্পিনার শেন ওয়ার্নের ক্যারিয়ারে অর্জনের অভাব নেই। তবে তাকে ক্রিকেট ইতিহাসে অমরত্ব দান করেছে ‘বল অফ দ্য সেঞ্চুরি’। তার করা অবিশ্বাস্য এক ডেলিভারি ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ডেলিভারি হিসেবে গণ্য হয়।
১৯৯২ সালে সাদা পোশাকের ক্রিকেটে অভিষেক হয়েছিল ওয়ার্নের। তবে সেই অবিশ্বাস্য ডেলিভারির কথা বলতে হলে অবশ্য তার পরের বছর ১৯৯৩ সালে ফিরে তাকাতে হবে। অ্যাশেজ সিরিজে ইংলিশ ব্যাটার মাইক গ্যাটিং ছিলেন সেই হতভাগা, যিনি সেই বলে হয়েছিলেন বোল্ড।

কানের দুল পরা স্বর্ণকেশী লেগ স্পিনার ১৯৯৩-১৯৯৪ মৌসুমে অ্যালান বর্ডারের নেতৃত্বে অস্ট্রেলিয়া দলের হয়ে অ্যাশেজ খেলতে ইংল্যান্ড সফরে গিয়েছিলেন। তখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের নাম চেনাতে তিনি ছিলেন মরিয়া। তখনই জাদুকরী ডেলিভারি দিয়ে গোটা ক্রিকেট দুনিয়াকে হতবাক করে দেয়। যার রেশ এখনও তাড়িয়ে তাড়িয়ে নেয় ক্রিকেট দুনিয়া।
দিনের শেষের শিকার বাসিত: ডিসেম্বর, ১৯৯৫
লেগ স্পিনকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া শেন ওয়ার্ন মাঠের খেলায় ছিলেন অতন্ত সুদক্ষ, চতুর এবং দুর্দান্ত এক ক্রিকেটার। অজিদের হয়ে ভুরিভুরি এমন ঘটনা আছে কিংবদন্তি লেগ স্পিনারের। এর মাঝে উল্লেখযোগ্য ডিসেম্বরের ১৯৯৫ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্টে।
সিডনিতে চলছিল টেস্টের তৃতীয় দিন। প্রথম ইনিংসে ২৫৭ রানে গুটিয়ে যাওয়ার পর পাকিস্তানের বিপক্ষে বোলিংয়ে দারুণ শুরু করেছিল অস্ট্রেলিয়া। ৪২ রানে লিড নিয়ে অবশ্য অস্বস্তিতেই ছিল সফরকারী দল। ওয়ার্ন-ম্যাকডরমেটে দ্বিতীয় ইনিংসে ৮২ রানের মাথায় তিন উইকেট হারিয়ে ফেলে পাকিস্তান। পরে দিনটা প্রায় শেষ করে ফেলছিলেন রমিজ রাজা ও বাসিত আলি। কিন্তু সেই কাজটায় ব্যাঘাত ঘটালেন শেন ওয়ার্ন।
ততদিনে অন্যতম তারকা হয়ে যাওয়া ওয়ার্নের হাতে দিনের শেষ ওভার করতে দিলেন অজি অধিনায়ক মার্ক টেলর। মান রাখলেন ওয়ার্ন। দিনের শেষ বলটা এমনভাবে টার্ন করলো যে ব্যাট দিয়ে বল ঠেকানোর সুযোগও পেলেন না স্ট্রাইকে থাকা বাসিত আলি। সরাসরি বোল্ড হয়ে ফিরলেন সাবেক পাকিস্তানি ক্রিকেটার।
ডিনার এবং সংবাদ সম্মেলনের জন্যই বুঝি তাড়া ছিল ওয়ার্নের। সেদিনের সেই ডেলিভারি নিয়ে রিচি বেনো বলেছিলেন, ‘আপনি এটি বিশ্বাস করবেন না। ওয়ার্ন তার পায়ের ভিতরে তাক করেছিল।’ বাসিতকে ফেরানোর ফলে পরের দিনে পাকিস্তান গুটিয়ে গেল দুইশ রান ছাড়ানোর পর। অবশ্য ম্যাচটি মুস্তাক আহমেদের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে ৭৪ রানে জিতেছিল পাকিস্তান।

দ্য ক্লাসিক: ডিসেম্বর, ১৯৯৬
ক্যারিয়ারের ৪৬তম টেস্ট খেলতে নেমেছেন শেন ওয়ার্ন। এসসিজি টেস্টে ক্যারিবিয়ানদের বিপক্ষে দুই ইনিংসেই বল হাতে দেখালেন দাপট। ঝালিয়ে নেওয়া টার্নকে ভালোভাবেই কাজে লাগালেন ওয়ার্ন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দুই ইনিংসে পেলেন সাত উইকেট। অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ জিতেছিল ১২৪ রানে। কিন্তু সেই টেস্টে ওয়ার্নের শিকার হওয়া শিবনারায়ন চন্দরপলের উইকেটটা থাকবে ইতিহাস হয়ে।
প্রথম ইনিংসে দুর্দান্ত ব্যাট করা চন্দরপল এগোচ্ছিল শতকের দিকে। ৭১ রানে ব্যাট করে চক্ষুসূল হচ্ছিলেন অস্ট্রেলিয়ানদের। সেখানে কাজটা দারুণভাবেই সারলেন ওয়ার্ন। প্রথম ইনিংসে ক্যারিবিয়ান ব্যাটারকে ফেরানোর পর দ্বিতীয় ইনিংসেও চন্দরপলকে হতাশ করলেন ওয়ার্ন। এবার ফেরালেন সরাসরি বোল্ড করে। তীক্ষ্ণ-টার্নিং উইকেট-টেকার বল বানিয়েছিলেন অজি স্পিনার। অফ স্টাম্পের বাইরে কয়েক ফুট রুক্ষ থেকে টার্ন করে চন্দরপলের প্যাডে এবং অফ স্টাম্পের দিকে ফিরে আসে। কিন্তু ব্যাট দিয়ে ঠেকাতে ব্যর্থ হলেন, ফল প্যাভিলিয়নের পথ।








