৮ মাসের গর্ভবতী এক মা। যিনি মিয়ানমার সৈন্যদের এড়াতে রাতের বেলা নাফ নদী অতিক্রম করে পালিয়ে আসেন বাংলাদেশে। অথবা আরো অনেকের মতো সেই বাবা, যিনি তার দুই ছেলেকে ঘাড়ে করে, পায়ে হেঁটে মিয়ানমারে সহিংসতা থেকে বাঁচতে পালিয়ে এসেছেন বাংলাদেশে।
এসব রোহিঙ্গাদের জন্য সবার একটাই প্রশ্ন, নিজের দেশে তারা ফিরতে পারবে তো? পারলেও সেটা কতদিনে পারবে?
এরই মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে। বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দুই মাসের মধ্যে ফিরিয়ে নিতে ২৩ নভেম্বর বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। তবে ওই মাসেই আবার রোহিঙ্গাদের গ্রামে আগুন দেওয়ার খবর প্রকাশ করে ইউএনএইচসিআর।
তাই সীমান্ত পার হয়ে আসা মহাক্লান্ত, তৃষ্ণার্ত রোহিঙ্গা শরণার্থীরা কিংবা ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত সেই শিশুসহ বাবা, যে বাবা ও শিশুর মতো অনেক রোহিঙ্গা শরণার্থী রাতের বেলা পায়ে হেঁটে এবং দিনের বেলা বনের মধ্যে লুকিয়ে থেকে ১০ দিন বা তারও বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে এসেছে, তাদের সবার জন্য সারাবিশ্বের ভাবনার বিষয় এখন একটাই, তারা কি আবার নিজেদের দেশে ফিরতে পারবেন?
সমস্যা সমাধানে নেওয়া হচ্ছে নানা উদ্যোগ। রোহিঙ্গাদের আবার নিজ দেশ মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে মঙ্গলবার গঠন করা হয়েছে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ। বাংলাদেশের ১৫ জন এবং মিয়ানমারের ১৫ জন মিলে গঠিত হয়েছে এই ওয়ার্কিং গ্রুপ। বাংলাদেশের পক্ষে গ্রুপে নেতৃত্ব দিবেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক ও মিয়ানমারের পক্ষে নেতৃত্ব দিবেন মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিব মিন থো।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আশেকা ইরশাদ মনে করেন, দুই দেশের যে ওয়ার্কিং গ্রুপটা হলো সেটা এর আগে মিয়ানমারের নেপিদোতে হওয়া চুক্তির ফল। তারা তখন বলেছিলো দুই দেশের সমান সমান সদস্য নিয়ে ওয়ার্কিং গ্রুপ হবে। সেটা হয়েছে, বিষয়টা অবশ্যই ইতবাচক। যদিও ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের পর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু কবে হবে সেই বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। তবে এখানে মূল চিন্তার বিষয়টি হলো, এখনো রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পালিয়ে আসা বন্ধ হচ্ছে না। মিয়ানমারে সমস্যা আছে দেখেই তারা বাংলাদেশে আসছে। সুতরাং সেখানে সমস্যার সমাধান না হলে তো এই সমস্যার সমাধান হবে না।

সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন কবীরও যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের পদক্ষেপকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছেন।
তিনি বলেন, তবে প্রক্রিয়াগতভাবে সেটা এখনো কাজ করা শুরু করেনি। ফলে তা কতদূর এগোবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। সময়ই বলে দেবে রোহিঙ্গারা তাদের দেশে ফিরতে সক্ষম হবে কিনা।
এরই মধ্যে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি পরিদর্শন করতে একের পর এক বাংলাদেশে এসেছেন বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার প্রতিনিধিরা। সর্বশেষ রোহিঙ্গাদের দুর্ভোগ দেখতে সোমবার ঢাকায় এসেছেন তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদিরিম।
এসব সফরে হচ্ছে নানান বৈঠক ও আলোচনা। উঠে আসছে সমাধানের পথ। তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদিরিম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করবেন। বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যুর পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ বিষয় নিয়েও আলোচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করবেন। শরণার্থীদের অবস্থার উন্নয়নে প্রচেষ্টার বিষয় নিয়ে তিনি উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

তুরস্কের ফার্স্ট লেডি এমিনি এরদোগান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসগলু গত সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেন। এসেছিলেন বিভিন্ন দেশের ১৯ রাষ্ট্রদূত। আসেন পোপ ফ্রান্সিসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধানরা।

তুরস্কের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক আশেকা ইরশাদ।
বলেন, ‘তিনি বলেই এসেছিলেন যে রোহিঙ্গা বিষয়েই তার নজর থাকবে। সমস্যার সমাধান করতে হলে মিয়ানমারের উপর আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ প্রয়োজন হবে। আর প্যালেস্টাইন ইস্যুতে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে একটা ইউনিটির আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তাই তুরস্কের প্রধানমন্ত্রীর এই সফরটা বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
জাতিসংঘের হিসেব অনুযায়ী গত ২৫ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। তবে তাদের ফেরত পাঠাতে এখন তৎপর বাংলাদেশ। সেই অনুযায়ীই আলোচনা ও কার্যক্রম চলছে দুই দেশের মধ্যে।







