রাশিয়া বিশ্বকাপের ফাইনালে দুই প্রতিপক্ষ ফ্রান্স ও ক্রোয়েশিয়া। ১৪ জুন আসর শুরুর হওয়ার সময় ২০১৮’র ফাইনালে এই দুই দলকে হয়তো অনেকই ভাবেনি। রোববার রাতে হয় একটি দল দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপের শিরোপা জিতবে, না হয় অন্য দলটি প্রথমবারের মতো এই কাজটি করবে।
একটি টুর্নামেন্ট যখন শেষ হয় তখন সমর্থকদের মনে সবসময়ই একটি ক্ষীণ অনুভূতি থাকে। যার একটি হতে পারে এশিয়ার অবস্থান। কারণ রাশিয়ার চলতি বিশ্বকাপের চমকপ্রদ অধিকাংশ মুহূর্তের খুব কমই এশিয়ার জন্য ফিরেছে।
পল পগবা, অ্যান্থনিও গ্রিজম্যান এবং কাইলিয়ান এমবাপেদের মতো তারকাদের নিয়ে গড়া ফ্রান্স দল নিঃসন্দেহে ফাইনালের বড় টিম। ১৯৯৮ সালে তারা বিশ্বকাপ জিতেছে। প্রথম জয়ের আট বছর পর (২০০৬) আরো একটি ফাইনাল খেলার অভিজ্ঞতা তাদের রয়েছে। ইতালির কাছে পেনাল্টিতে ফাইনাল হারের একদশক পর আবারও বিশ্বকাপ জেতার ফেভারিট ফরাসিরা।
ক্রোয়েশিয়ায় অবশ্য প্রচুর প্রতিভা আছে, যদিও ফাইনালে তারা আন্ডারডগ। নিজেদের অংশ নেয়া প্রথম বিশ্বকাপেই (১৯৯৮) শেষ চারে উঠেছিল বলকান দলটি। তবে তারা কখনোই যে তাদের স্পিরিট হারায়নি তার প্রমাণ এই ফাইনাল। এবারের ফাইনাল চিরকালের জন্য স্মরণীয় করে রাখতে পারে ক্রোয়েটরা।
এশিয়ার সমর্থকরা ফাইনালে যে কাউকে সমর্থন করতে পারে। কিন্তু যদি দল হিসেবে কাউকে সমর্থন করতে হয় তবে তা ক্রোয়েশিয়া হতে হবে। আর এটা ক্রোয়েশিয়ার কোচের পরিচয়ের কারণে। ২০১৭ সালে জাতীয় দলের দায়িত্ব নেয়ার দীর্ঘ ছয়টি বছর এশিয়াতেই ছিলেন কোচ জ্লাতকো দালিচ।
বছরের পর বছর ধরে এশিয়ায় অনেক বড় বিদেশি কোচ দেখা গেছে এবং এখনো যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে সংখ্যাটা বাড়িয়ে দিয়ে তারা কয়েক দশক ধরেই এশিয়াতে আসছেন। তবে তাদের প্রায় সবাই আগে থেকে বড় নাম ছিলেন।
এশিয়ায় পা রাখা বিদেশি বড় নামের কোচদের মধ্যে মারিও জাগালো ছিলেন অগ্রদূত। খেলোয়াড় এবং কোচ দুই ভূমিকাতেই বিশ্বজয়ের খ্যাতি আছে তার। ১৯৭৬ সালে কুয়েতের কোচ হন তিনি। পরে সৌদি আরবের ক্লাব আল হিলাল ও সৌদি জাতীয় দলের কোচ হয়েছিলেন। শেষে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দায়িত্বও নিয়েছিলেন এই ব্রাজিলিয়ান।
১৯৯৪ বিশ্বকাপ জেতা আরেক ব্রাজিলিয়ান কার্লোস আলবার্তো পেরেইরা। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে সৌদি আরবের দায়িত্বে ছিলেন। কিন্তু দুই ম্যাচ পরই তাকে বরখাস্ত হতে হয়। যদিও তিনি দালিচের মতো আন্তর্জাতিক সাফল্য পাওয়ার আগে এশিয়ায় মোটামুটি সাফল্য পেয়েছিলেন। ১৯৮৫তে আরব আমিরাতের, ১৯৮৮তে সৌদি আরব ও ১৯৯০ বিশ্বকাপে আবার আমিরাতের কোচের দায়িত্ব পালন করেন।
সম্প্রতি এশিয়ায় এসেছেন আরো দুজন বিশ্বমানের কোচ। আন্তর্জাতিকভাবে সাফল্য পেতে ইতালিকে বিশ্বকাপ জেতানো মার্সেলো লিপ্পিকে ভাড়া করেছে চীন। আর ঘরোয়া ফুটবলকে শক্তিশালী করতে ব্রাজিলের সাবেক কোচ ফিলিপ লুইস স্কলারিকে দলে নিয়েছে গুয়াংজু এভারগ্রান্ডে।
কিন্তু দালিচ সেই কাজটি করেছেন প্রথমে যেটা করেছিলেন আলবার্তো পেরেইরা। এশিয়া থেকে সরাসরি তাকে জাতীয় দলের দিকে সরানো হয়েছে। ব্রাজিলিয়ানের মতো অসাধারণ পুরস্কারটি পাওয়ার চূড়ান্ত সুযোগও পাচ্ছেন তিনি।
২০১০ সালে যখন সৌদি আরবে আসেন তখন তেমন অভিজ্ঞতা ছিল না দালিচের। তার সবচেয়ে বড় বদল ছিল ২০১৪তে আরব আমিরাতের আল আইন ক্লাবে যাওয়া।
২০১৬তে আল আইন এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে উঠলে পুরো এশিয়াতে ছড়িয়ে যায় দালিচের নাম। যদিও ঘরোয়া শিরোপা জেতা দালিচের দল ওই ফাইনাল জিততে পারেনি। তবে সাউথ কোরিয়ান ক্লাবের বিরুদ্ধে নিজেদের শক্তির জানান দিয়েছিল দালিচের আল আইন।
এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালের মতো ফ্রান্সের বিরুদ্ধে রোববার রাতেও দালিচের জন্য কিছু ঘটতে পারে। তবে তার সেই আল আইন দলের চেয়ে ক্রোয়েশিয়া দলে অনেক অনেক বেশি প্রতিভাবান ফুটবলার আছেন। তারাই রোববার রাতে হয়তো দালিচের জন্য আল আইন ইতিহাসের বিপরীত কিছু করে দেবেন।
লুঝনিকি স্টেডিয়ামের ৮০ হাজার দর্শক বা মস্কোর লেলিন মুর্তির সামনে যাই ঘটুক, তাতে কিছু আসে যায় না। কারণ ২০১০ সালে সৌদি আরবের আল ফায়সাল ক্লাবে যোগ দেয়ার পর থেকে বহুদূর এগিয়েছেন দালিচ।
এই বছর ফুটবলের সেরা, সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী গল্প তো তিনি আর তার দলই লিখেছেন। তার জন্য এশিয়া গর্বই করতে পারে। আর এ জন্যেই এখনো যারা নিরপেক্ষ আছে, তাদের ক্রোয়েশিয়াকেই সমর্থন করা উচিত।
ফক্স স্পোর্টস এশিয়ায় সাংবাদিক জন ডুরেডিনের লেখা









