শুরুটা হয়েছিল বাংলাদেশের মাটিতে। ১৯৯৮ সালের কথা। তখন নাম ছিল মিনি বিশ্বকাপ। ক্রিকেট বাণিজ্য-প্রসারের ক্ষুরধার মস্তিষ্ক, তৎকালীন আইসিসি সভাপতি জগমোহন ডালমিয়ার প্রসূত ১৯ বছর আগের সেই মিনি বিশ্বকাপই এখনকার আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি। বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম থেকে যাত্রা শুরু করে এবার ইংল্যান্ডে। আসর বসছে ১ জুন। স্বাগতিকদের বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচেই নেমে পড়বে ক্রিকেট দুনিয়ার নয়া ফেভারিট বাংলাদেশ।
তার আগে এক নজরে দেখে নেয়া যাক চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির আগের আসরগুলো কাদের দুহাত ভরে দিয়েছিল-
১৯৯৮ (চ্যাম্পিয়ন সাউথ আফ্রিকা)
মিনি বিশ্বকাপ নামে প্রথম আসর। বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে খেলা। আট ম্যাচের নকআউট টুর্নামেন্ট। যদিও অংশগ্রহণ ছিল না স্বাগতিক বাংলাদেশের। ফাইনালে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৪ উইকেটে হারিয়ে নিজেদের প্রথম ও একমাত্র বৈশ্বিক শিরোপা জেতে সাউথ আফ্রিকা। প্রথমে ব্যাট করে ক্যারিবীয়রা ৪৯.৩ ওভারে গুটিয়ে যাওয়ার সময় ২৪৫ রান তোলে। ফিলো ওয়ালেস ১১ চার ও ৫ ছয়ে ১০২ বলে ১০৩ রান করেন। কার্ল হুপার করেন ৪৯। জবাবে মাইক রিনডেলের ৪৯ আর অধিনায়ক হ্যান্সি ক্রনিয়ের অপরাজিত ৬১ রানে তিন ওভার হাতে রেখেই জয়ে নোঙর ফেলে প্রোটিয়ারা।
সাউথ আফ্রিকার হয়ে ফাইনালে ৭.৩ ওভার বল করে ৩০ রানে ৫ উইকেট নিয়েছিলেন জ্যাক ক্যালিস, সঙ্গে ব্যাটে ৩৭ রান। ফাইনাল সেরা হন এই অলরাউন্ডার, সেমিফাইনালেও ম্যাচসেরা ছিলেন। পরে টুর্নামেন্ট সেরার খেতাবও যায় তার দখলে। আসরে সবচেয়ে বেশি উইকেট (৮টি) ক্যালিসের হলেও সর্বোচ্চ রান ওয়ালেসের ২২১! আর কোয়ার্টার ফাইনালে শচীন টেন্ডুলকার ছিলেন ভারতের হয়ে দুর্দান্ত। ১৪১ রান ও ৪ উইকেটের অলরাউন্ড নৈপুণ্যে অস্ট্রেলিয়াকে একাই ধ্বসিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।
২০০০ (চ্যাম্পিয়ন নিউজিল্যান্ড)
কেনিয়ায় এই আসরে বাংলাদেশও খেলতে যায় প্রথমবার। সব টেস্ট খেলুড়ে দেশ আর স্বাগতিকদের নিয়ে ১১ দলের আসর। জহির খান, যুবরাজ সিং, মোহাম্মদ কাইফদের আবির্ভাবের আসরে দুর্দান্ত ছিল সৌরভ গাঙ্গুলির ভারত। গাঙ্গুলির ৯ চার ও ৪ ছয়ে ১৩০ বলে করা ১১৭ রান এবং শচীন টেন্ডুলকারের ১০ চার ও এক ছয়ে করা ৬৯ রানে নির্ধারিত ওভারে ৬ উইকেটে ২৬৪ তোলে ভারত। কিন্তু ম্যাচসেরা ক্রিস কেয়ার্নসের মহাকাব্যিক ৮ চার ও ২ ছয়ে ১১৩ বলে অপরাজিত ১০২ রানে শিরোপা যায় নিউজিল্যান্ডের ঘরে। দুই বল ও চার উইকেট হাতে রেখেই জয়ে নোঙর ফেলে স্টিভেন ফ্লেমিংয়ের দল।
বাংলাদেশ খেলা একমাত্র ম্যাচে প্রি-কোয়ার্টারে ইংল্যান্ডের কাছে হেরে টুর্নামেন্ট শেষ করে। টুর্নামেন্টে ভারতের ভেঙ্কটেশ প্রসাদ সর্বোচ্চ ৮ উইকেট ও গাঙ্গুলি সর্বোচ্চ ৩৪৮ রান করেন।
২০০২ (যৌথ চ্যাম্পিয়ন ভারত ও শ্রীলঙ্কা)
নামে পরিবর্তন এল। নতুন নাম পেল টুর্নামেন্ট- আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি। ১৫ ম্যাচের আসরে ১২টি দলের অংশগ্রহণ। চার গ্রুপে ভাগ হয়ে খেলে গ্রুপসেরারা পেল সেমির টিকিট। স্বাগতিক শ্রীলঙ্কা ও ভারত ফাইনালে। কিন্তু শিরোপার নিষ্পত্তি করতে দেয়নি বৃষ্টি। দুই দিনে দুবার ফাইনাল হয়েছিল। একটি রিজার্ভ ডেতে। দুদিনই শ্রীলঙ্কা শুরুতে ব্যাট করার পর ভারতের ইনিংসে বৃষ্টির হানা। ট্রফির যাত্রায় একমাত্র যুগ্ম চ্যাম্পিয়নও মিলেছে ওই একবারই। ভারতের বীরেন্দ্রর শেবাগের সর্বোচ্চ ২৭১ রান ও লঙ্কানদের মুত্তিয়া মুরালিধরনের সর্বোচ্চ ১০ উইকেটে পর্দা নামে আসরের।
২০০৪ (চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজ)
ইংল্যান্ডের ওভালে আসরের ফাইনাল। স্বাগতিকদের ২১৮ রানের লক্ষ্যে নেমে একসময় ১৪৭ রানেই ৮ উইকেট নেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের। ক্যারাবীয়দের সেখান থেকে টেনে তোলেন কোর্টনি ব্রাউন (৩৫*) ও ইয়ান ব্র্যাডশ (৩৪*)। নবম উইকেটে তারা গড়েন অবিচ্ছিন্ন ৭১ রানের জুটি। জয়ের সময় তখনো ৭ বল হাতে ব্রায়ান লারার দলের। আর মাইকেন ভনের দলের ১০৪ রান করা মার্কাস ট্রেসকোথিক পরাজিতের কাতারে।
রানের সঙ্গে ২ উইকেট নিয়ে ফাইনাল সেরা ব্র্যাডশ। টুর্নামেন্ট সেরা রামনরেশ সারওয়ান। আসরের সর্বোচ্চ রান ২৬১ ট্রেসকোথিকের, সর্বোচ্চ উইকেট অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফের ৯টি।
২০০৬ (চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া)
ফরম্যাট বদলাল। ১০ দলের টুর্নামেন্টে দুভাগ। ৬ দল সরাসরি মুল পর্বে। বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও জিম্বাবুয়ে প্রথম পর্বে খেলল। যেখান থেকে মূল পর্বে যায় দুদল। ভারতের মাটিতে সেবার সেরা রিকি পন্টিংয়ের অস্ট্রেলিয়া। নাথান ব্র্যাকেন ও গ্লেন ম্যাগ্রাদের তোপে ব্রায়ান লারার দল ৩০.৪ ওভারেই অলআউট, মাত্র ১৩৮ রানে। শেন ওয়াটসনের অপরাজিত ৫৭ ও ডেমিয়েন মার্টিনের অপরাজিত ৪৭ রানে ২ উইকেট হারিয়ে জয়ে নোঙর ফেলে অজিরা। বৃষ্টি আইনে জয়টি ৮ উইকেটের।
ম্যাচ সেরা ওয়াটসন, ফিফটির সঙ্গে ২ উইকেট নিয়েছিলেন এই অজি অলরাউন্ডার। টুর্নামেন্ট সেরা ক্রিস গেইল, টুর্নামেন্ট সর্বোচ্চ ৪৭৪ রান এসেছিল এই ক্যারিবিয়ানের ব্যাটে। উইকেটে সর্বোচ্চ জেরোমি টেলর ১৩টি।
২০০৯ (চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া)
সাউথ আফ্রিকায় টুর্নামেন্ট। ষষ্ঠ আসরে টানা দ্বিতীয় শিরোপা অস্ট্রেলিয়ার। সেঞ্চুরিয়নে শুরুতে ব্যাট করে ফিফটিহীন ইনিংসে ৯ উইকেটে ২০০ রান তোলে নিউজিল্যান্ড। জবাবে ক্যামেরুন হোয়াইটের ৬২ ও শেন ওয়াটসনের ১০ চার ৪ ছয়ে ১২৯ বলে অপরাজিত ১০৫ রানে জয়ে ভেড়ে অজিরা। ২৮ বল ও ৬ উইকেট হাতে রেখেই।
যথারীতি ওয়াটসন ফাইনাল সেরা, অধিনায়ক রিকি পন্টিং টুর্নামেন্ট সেরা ২৮৮ রান জমা করে। সর্বোচ্চ উইকেট স্বাগতিকদের ওয়েন পারনেলের ১১টি।
২০১৩ (চ্যাম্পিয়ন ভারত)
বৃষ্টির কবলে পড়ে বার্মিংহামের ফাইনাল দেখেছিল টি-টুয়েন্টি ফরম্যাট। শুরুতে ব্যাট করে ২০ ওভারে ৭ উইকেটে ১২৯ রান তোলে ভারত। সর্বোচ্চ বিরাট কোহলির ৪৩। ইংল্যান্ড পরে মরগ্যান ৩৩ ও বোপারার ৩০ রানে নির্ধারিত ওভারে ৮ উইকেটে ১২৪ রানে থেমে যায়। ধোনির দল ৫ রানে চ্যাম্পিয়ন। ম্যাচসেরা রবীন্দ্র জাদেজা, সর্বোচ্চ ১২ উইকেটও এই অলরাউন্ডারের। টুর্নামেন্ট সেরা শিখর ধাওয়ান সর্বোচ্চ ৩৬৩ রান করে।






