ব্রিটিশদের ঔপনিবেশিক শাসন ও পাকিস্তান হয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত বামপন্থীদের উপস্থিতি দৃশ্যমান। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন ও এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে বিভিন্ন দল, উপদলে বিভক্ত বামপন্থীরা। আন্দোলন সংগ্রামের কথা বলে, বাম ঐক্যের কথা বলে দিনের পর দিন অনৈক্যের গতিটাকেই যেন বাড়িয়ে তুলছে তারা। কঠিন তত্ত্বকথা ও পাণ্ডিত্য চর্চায় বামদের জুড়ি মেলা ভার। বাম ঐক্যের আহবান জানিয়ে বিগত দিনে গড়ে তুলেছে ৫ দলীয় জোট, বামফ্রন্ট ও ১১ দলীয় জোট, ১০ দলীয় জোট, বাম মোর্চা, গণসংহতি আন্দোলন, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোট প্রভৃতি। কিন্তু এ পর্যন্ত কোন বাম জোটই গণসম্পৃক্ততা অর্জন করতে পারেনি। বাম সংগঠন অনেক পুরনো হওয়া সত্ত্বেও জনমত পেতে তাদের ঐক্য করতে হচ্ছে অনেক পরে সংগঠিত হওয়া নবাগত সংগঠনের সাথে। শোষণ বঞ্চনা ও মানব মুক্তির কথা বলা বাম সংগঠনগুলো পাকিস্তানী শোষন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে বাঙালির জাতিসত্তার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হয়। ১৯৭১ সালে বামপন্থীরা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ল। বামরা আওয়ামী লীগের চেয়েও পুরনো সংগঠন হওয়া সত্ত্বেও কেন মানুষ বামদের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ এই চিত্রটা দেখতে পারলো না?
১৯৭৫ এ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কে হত্যা করা হলো। ক্ষমতায় এলো খন্দকার মুশতাক আহমেদ ও পরে জিয়া, এরশাদ। তখন গঠিত হলো নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট, জাগ দল, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি। এসব নবগঠিত দলগুলো পুরনো বামদলে যোগ দেয়নি। পুরনো বামরাই যোগ দিয়েছে এসব ডান দলের ফ্রন্টে। অনেক তুখোর বামনেতা প্রথমে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টে যোগ দিয়ে পরবর্তীতে নিজেদের বিএনপিতে বিলীন করেছে। যেমন জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের সদস্য ছিল কাজী জাফরের ইউপিপি। কোন আদর্শিক চেতনায় তারা ডান ফ্রন্টে যোগ দিল। কথায় আছে পুরান চাল ভাতে বাড়ে বামরা দিনের পর দিন ভাতে কেন কমছে? বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে অনেক বাম নেতা জেল হতে বেরিয়ে আসে। এমন একজন জেলমুক্ত নেতার সাথে কথা বলে জানা যায় বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড না হলে আমাদের মুক্তি ঘটতো না। কিন্তু এই মুক্তিতে তাদের কি আদর্শিক কোন বিজয় হয়েছে? কী বিরোধ ছিল তাদের বঙ্গবন্ধুর সাথে? বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরোধিতা করে পরবর্তীতে অনেক বাম নেতাকে দেখা গেছে জিয়া ও এরশাদকে সমর্থন করতে। কেন বঙ্গবন্ধুর শাসনামল কি তাদের দৃষ্টিতে জিয়া ও এরশাদের চেয়েও খারাপ ছিল?
বাম দাবিদার জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের তাত্ত্বিক নেতা রাজনীতির রহস্যপুরুষ খ্যাত সিরাজুল আলম খান দাদা ভাই ও তার অনুসারীরা বঙ্গবন্ধুর শাসনের বিরোধিতা করলেন আবার এরশাদের শাসন কে সমর্থন জানালেন। এর রহস্য কী। আসম আব্দুর রব এরশাদের গৃহপালিত বিরোধী দলের নেতা হয়ে গেলেন। শাহজাহান সিরাজ, গৌতম চক্রবর্তী ও গয়েশ্বর রায় প্রমুখরা হয়ে গেলেন সমাজতন্ত্র ঘাতক বিএনপি নেতা। এই যদি বাস্তবতা হয় তাহলে তারা বঙ্গবন্ধু শাসনামলে কেন সমাজতন্ত্রের দোহাই দিয়ে নাশকতা চালিয়েছিলেন? জিয়াকে বন্দীদশা হতে ছাড়িয়ে আনলো কর্নেল তাহের। এর পেছনে কী উদ্দেশ্য ছিল? কর্নেল তাহের কি জিয়াকে দিয়ে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন? যদি তাই হয় তাহলে এ স্বপ্নের যৌক্তিক ব্যাখ্যা কী।
বঙ্গবন্ধুর তুখোড় বিরোধীকেও পরবর্তীকালে দেখা যায় বঙ্গবন্ধু কন্যার অনুসারী হতে। কর্নেল তাহেরের দুই ভাই অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন ও ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল আজ শেখ হাসিনার সুহৃদ। আরও সুহৃদ হাসানুল হক ইনু, বেগম মতিয়া চৌধুরী, নূরুল ইসলাম নাহিদ প্রমুখ। শেখ হাসিনা বন্দনায় সে সময়ের বঙ্গবন্ধু বিরোধীরা আজ সর্বত্র উচ্চকিত কন্ঠ। এটা কি কেবলই ক্ষমতা বন্দনা নয়? আদর্শিক মিত্রতার লক্ষণ দেখা যায় দল ক্ষমতার বাইরে থাকার সময়। আদর্শকে টার্গেট করে আদর্শ বাস্তবায়নের রাজনীতি কতজন করছে? ক্ষমতার জন্য আদর্শিক সত্তাকেও বাদ দিয়ে দিচ্ছে অনেকেই। নির্বাচনে জেতার জন্য সাম্প্রদায়িক অপশক্তির সাথে আপোষ করে চলেছে অনেক অসাম্প্রদায়িক দাবিদার। ক্ষমতার মসনদকে পোক্ত করতে বৈদেশিক শক্তির সাথে লিয়াজো করতে সহায়ক হিসাবে চরম ডানপন্থী দলকেও দেখা গেছে বামনেতাকে সফর সঙ্গী বানাতে। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে সাম্যবাদী দলের দিলীপ বড়ুয়াকে দেখা গেছে খালেদা জিয়ার চীন সফরের সঙ্গী হতে। যার প্রতিক্রিয়ায় দিলীপ বড়ুয়া ১১ দলের সমন্বয়কের পদ হারান। দীলিপ বড়ুয়া কেন জানি বিএনপি ও আওয়ামী লীগ দুপক্ষেই গুরুত্বপূর্ণ। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে এই দীলিপ বড়ুয়াই মন্ত্রীসভায় স্থান পান। ১৪ দলীয় জোটে যেসব দলের সংসদে প্রতিনিধিত্ব আছে তারা কেউ মন্ত্রীসভায় ঠাঁই পেলোনা। পেলো সংসদে ঠাঁই না পাওয়া দল সাম্যবাদী দল(এমএল)। এ দলটিকে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মেজর জিয়াও কাছে টেনেছিলেন। এ দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ তোহাকে জেল থেকে ছাড়িয়ে এনে নির্বাচনে দাঁড় করিয়েছিলেন তিনি। এ দলটির গুরুত্ব কি কেবলই চীনা লবিং করার জন্য নয় কি?
কোন দেশ যেমন নিজের পতাকাকে ভুলতে পারে না। কোন আন্তর্জাতিক প্রোগ্রামে গেলে কোন গরীব দেশ গরীব বলে কেউ ভিনদেশী পতাকা তুলেনা। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর কোন সভা হলে সেখানে ভুটান ছোট দেশ বলে বড় দেশ ভারতের পতাকা তুলতে পারে?এক দেশের সাথে আরেক দেশের মৈত্রী মানে সেদেশের পতাকা গ্রহণ যেমন ঠিক নয় তেমনই একটি রাজনৈতিক দলের আরেকটি রাজনৈতিক দলের দলীয় প্রতীক গ্রহণও ঠিক নয়। কিন্তু এই কাজটিই করে চলেছে বাংলাদেশের কিছু বামপন্থী দল। তারা নির্বাচনী ‘জয় বাংলা’ ও’ জয় বঙ্গবন্ধু’ও বলছে। নির্বাচনী পোস্টারে লিখছেনা, দুনিয়ার মজদুর এক হও। পোস্টারে রাখছেনা তাদের দলীয় প্রতীক। এক নির্বাচন ও এক দল কিন্তু তারা নির্বাচনে যায় দুই প্রতীকে। কেন এর ব্যাখ্যা কি? একক প্রতীকে নির্বাচনের কি জোটগত কোন সিদ্ধান্ত হয়েছে? হয়ে থাকলে জোটের কোন বৈঠকে তা নির্ধারণ হয়েছে? আর দুই প্রতীকে একই দলের নেতাদের অংশগ্রহণের ব্যাখ্যা কী?
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)









