শহরের সব মসজিদেই জুতো স্যাণ্ডেল চুরি হয়। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায়। কিছু মানুষ নামাজ চলাকালীন সময়ে কাজটি করেন। এখানে ধরা পড়ার সুযোগ খুবই কম। কারণ, যার জুতো চুরি হয় তিনি প্রার্থনার ধ্যানে থাকেন। চোর থাকেন চুরির ধ্যানে। এক্ষেত্রে পারস্পরিক মগ্নতা সার্থক হয়। নামাজ পড়ার চেয়ে চুরির কাজটি কঠিন। তিনি এই কঠিন কাজটি করেন প্রার্থনায় না গিয়ে। চুরির সময় তার মনটা পলায়নপর হয়ে ওঠে। তার মধ্যে এক ধরণের অস্থিরতাও থাকে হয়তো। কারণ, ধরা পড়ার শঙ্কা থাকে। ধরা পড়লে পরিস্থিতি মোকাবিলার কৌশলটিও নিতে হয় তাকে।
গতবার বইমেলার প্রার্থনাকক্ষে আমার জুতো চুরি হলো। আমি চোরকে না দেখেও যেন দেখতে পাচ্ছিলাম। তার জন্য কষ্ট হচ্ছিল, একটি নির্দিষ্ট সময়ের ভেতর আমার জুতোজোড়া নিয়ে উধাও হতে তাকে কতই না চাপ নিতে হচ্ছে।
পৃথিবীতে অনেক চোরই মহত্ব পেয়ে যান একসময়। অনেক বিশিষ্টজনও চুরি করতে ভালোবাসেন। চুরি বিদ্যাটি তার কাছে যোগ্যতার মতো। সম্পদ চুরি করে ধরা না পড়া পর্যন্ত অনেকের ওপর মাথা তুলে থাকেন তিনি। কিন্তু সম্পদ চোর আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চাপ ছাড়া কোথাও স্বীকার করতে চান না। যখন স্বীকার করেন তখন তিনি সমাজে চোর হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান। সেটি মানুষের মন থেকে মুছতে বেশ সময় লেগে যায়।
যে চুরির মধ্যে মহত্ব আছে, তা হলো বই চুরি। মার্ক টোয়েন তার প্রিয় মানুষদের কাছ থেকে বই পড়তে এনে দিতেন না। তার বিশাল কক্ষভর্তি বইয়ের সংগ্রহ জমে গিয়েছিল। বইগুলো তিনি সুবিন্যস্ত রাখতে গলদঘর্ম হতেন। অনেকেই রস করে তাকে বই চোরের মহিমা দিতে চান। এই চোর চোর নয়, এই চোর জ্ঞান আহরণকারী। পৃথিবীতে বইয়ের প্রসার ঘটছে। তার চেয়ে দ্রুততায় প্রসার ঘটছে বাণিজ্য ও পুঁজির। মানুষ এখন টাকা ছাড়া কোনো কিছুর কার্যকারণ খুঁজে পান না। তাই এখনকার বই চুরির সঙ্গে জ্ঞান আহরনের সম্পর্ক হারিয়ে গেছে।
তারপরও বই চুরি শেষ হয়নি। গতকাল বইমেলার কয়েকটি স্টলে গিয়ে খোঁজ নিয়েছি বই চুরির। দেখা গেল এই আধুনিক যুগেও স্টল থেকে বই চুরির কোনো হিসাব থাকছে না। সব স্টলেই শেষ কথা যেটি শোনা গেল, তা হলো, ‘বই চুরি হয় হয়তো, হিসাব রাখা হয় না।’ একটি প্রকাশনীর এক বিক্রয়কর্মী বললেন, এবার একুশে ফেব্রুয়ারি সবচেয়ে ভীড়ের দিন এক ভদ্রমহিলা দুটি বই তার শিশুর হাতে দিয়ে নিঃশব্দে কেটে পড়তে চাইছিলেন। পরে তাকে ডাকাডাকি করে স্টলে ডেকে আনা হলে তিনি দুঃখ প্রকাশ করে দাম মিটিয়ে দিয়ে যান।
বইমেলায় অনেক লেখকের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা বলেছেন, প্রতিদিন যে সংখ্যক বই চুরি হচ্ছে, তা একেবারে কম নয়। প্রকাশকরা তাদের হিসেবের মধ্যে উপহার ও চুরির হিসাবটি রেখে থাকেন। তাছাড়া একটি বয়সে বই চুরির মধ্যে যে জয়লাভের আনন্দ ছিল তা অনেকেই গভীরভাবে উপলব্ধি করেন। অনেকের স্মৃতিতে সেটি স্বর্ণালি হয়ে আছে। তাই বই চুরি নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে নেই। চোর যদি চুরি করা বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টে একটি পাতা পড়ে ফেলে, তাহলেই সার্থকতা এসে যায় অনেকের। সেখানেই জয়লাভ লেখকের, প্রকাশকের।







