মুমু নামে ছোট্ট একটি মেয়ের কান্নার গল্প শুনে হঠাৎ আমাদের ছাত্রজীবনের একটি অভিজ্ঞতার কথা মনে হলো। আমরা যখন আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম, আমাদের একজন কাছের বন্ধু নিয়মিত তাদের বাড়ির গাড়িতে করে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতো। তখন খুব অল্প কিছু ছাত্রছাত্রী গাড়িতে করে আসতো। তাতেই আমরা ধরে নিয়েছিলাম ও অবস্থাপন্ন ঘরের মেয়ে। ব্যস! এটুকুই। এর বাইরে ওর পোশাক-পরিচ্ছদ, চলাফেরা, খাওয়া-দাওয়া সব ছিল আমাদের মতোই। আমরা দলবলে যা খেতাম, যেভাবে চলতাম ও তাই করতো। কোথাও কোনো বাড়াবাড়ি ছিল না । বিকেলে আবার গাড়ি এসে ওকে বাড়ি নিয়ে যেতো।
একদিন ওর বাড়িতে আমাদের দাওয়াত দিল। ওর বাসা ছিল ধানমণ্ডিতে। ক্লাস থেকে দুপুরে ওর বাড়িতে পৌঁছে আমাদের চক্ষু চড়কগাছ। বিশাল দোতলা বাড়ি। এই পুরো বাড়ি জুড়ে ও, ওর ভাই, আর বাবা, মা মানে চারটি প্রাণী থাকে। বাড়িতে ৩/৪ জন সহকারি ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রতিটি ঘরে এসি, মার্বেল পাথরের টেবিল। সেই টেবিল ভর্তি নানা পদের খাওয়া। আমরা বিস্মিত। কারণ আমরা যারা ওর বন্ধু তাদের কারো আর্থিক অবস্থা ওর ধারেকাছে ছিল না। আমরা এসি নামক যন্ত্রটার কথাই কেবল শুনেছি, ব্যবহারের প্রশ্নই আসে না।

ও যে এতোটা বড়লোক বাড়ির মেয়ে তা গত তিন বছরে আমরা ধারণাও করতে পারিনি। কতো সাধারণের মতো থাকতো। স্কুলে, কলেজে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে এরকম আরও অনেকেই আমাদের সাথে ছিল, যাদের আর্থিক অবস্থা খুব ভাল বা খুব খারাপ ছিল। কিন্তু তাদের আর্থিক অবস্থা, সামাজিক পরিচয় কখনও আমাদের পারস্পরিক সম্পর্কের উপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। বন্ধু শুধু বন্ধুই ছিল, ক্লাসমেট শুধু ক্লাসমেটই ছিল। যাদের ভালো লাগতো, তাদের ব্যবহারের জন্যই লাগতো, যাদের ভালো লাগতো না, তাদেরও সেই আচার-আচরণের কারণেই লাগতো না।
সেই স্কুল ও পাড়ার জীবন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত কখনো মনে হয়নি কার আর্থিক অবস্থা কেমন? কার বাবা কী কাজ করেন, কারা কোন ধর্মের বা তাদের সামাজিক অবস্থা কী? এইসব পরিচয়ের মাপকাঠিতে বা এর উপর ভিত্তি করে আমরা খেলবো কি খেলবো না, বন্ধুত্ব করবো কি করবো না, এমন ছিল না। যাকে ভালো লেগেছে, সমমনা মনে হয়েছে, সেই আমাদের বন্ধু হয়েছে। অথচ সেই মানসিকতা থেকে আজ যে আমরা অনেকটাই যে সরে এসেছি, তা বুঝতে পারছি, মুমুর ও মুমুর মতো আরও কিছু ঘটনা থেকে।
মুমু ঢাকার খুব নামকরা একটি ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে ক্লাস থ্রিতে পড়ে। মুমুর মা বাবা এরকম একটি নামকরা স্কুলে বাচ্চাকে পড়াতে পেরে নিজেদের ঝামেলামুক্ত এবং ধন্য মনে করছেন। কিন্তু গোল বাঁধলো সেদিন, যেদিন মুমু স্কুল থেকে এসে কাঁদতে শুরু করলো। একদিন নয়, পরপর কয়েকদিন এরকমটা চলতে থাকলো। মুমুর অভিযোগ ওর ক্লাসের কয়েকটা ছেলেমেয়ে ওকে ক্ষেপায় এই বলে যে, মুমু ওদের চেয়ে পিছিয়ে আছে ক্লাসে, কারণ মুমু এখনও আমেরিকাই বেড়াতে যেতে পারেনি। মুমুর মা ক্লাস টিচারের কাছে অভিযোগ দিয়েছেন। ফলোআপটা এখনও জানা হয়ে ওঠেনি। শুধু বুঝতে পারলাম বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে আমেরিকা যাওয়া-না যাওয়াও একটা বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে এযুগের কোনো কোনো বাচ্চার জন্য।

আরেকটি নামকরা ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে শীতের ছুটির পর ক্লাস ফোরের বাচ্চাদের কাছে ক্লাস টিচার জানতে চাইলেন, এই ছুটিতে কে কোথায় বেড়াতে গিয়েছিল? উনি বিশেষভাবে জানতে চাইলেন, কারা কারা বিদেশে বেড়াতে গিয়েছিল? যারা বিদেশে গিয়েছিল, তারা যেন তাদের বেড়ানোর গল্প শোনায়। যে বাচ্চারা দেশের ভেতরে বেড়াতে গিয়েছিল, তাদের বেড়ানোর কোন গুরুত্বই দেননি শ্রেণি শিক্ষিকা । এতে করে যে শিশুরা কক্সবাজার বা রাজশাহী বেড়াতে গিয়েছিল, তার বেড়ানোটা তুচ্ছ করে তুললেন টিচার। কথাটা এরকমই একজন বাচ্চার মুখ থেকে শোনা, যে তার রাজশাহী বেড়াতে যাওয়ার গল্পটি করতে পারেনি ক্লাসে। এবার তাহলে ওর অভিভাবকেরও উচিৎ প্রিন্সিপালের কাছে গিয়ে অভিযোগ করা। কারণ এখানে-তো শ্রেণি শিক্ষক নিজেই ভেদাভেদ করছেন, যা তিনি পারেন না করতে।
শুধু কি ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল? না, বাংলা মাধ্যমের স্কুলের বাচ্চাদের মধ্যেও আলোচনা হচ্ছে কার বাবার গাড়ি আছে, কার বাবার নাই। কে রিকশায় করে স্কুলে আসে, কে আসে গাড়িতে। একটি নামকরা স্কুলের ক্লাস ফাইভের ছাত্রী তার বাবাকে বলেছে, ক্লাসে যাদের গাড়ি আছে, তারা এক দল।
নগরীতে এমন কিছু ইংরেজি মিডিয়াম স্কুল আছে যেখানে অভিভাবকদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে, তাদের চারিত্রিক বা শিক্ষাগত সনদপত্র না দেখে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক অবস্থার বিচারে তাদের সন্তানদের ভর্তি করানো হয়। সেসব স্কুলে টাকার অংকে ছাত্রছাত্রীকে মাপা হয়। ফলে সেখানে পড়তে আসা ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে মানসিক দৈন্যতা তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক।
আমার মেয়ে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করেছে। সেই সুবাদে ওর অনেক বন্ধু-বান্ধবের সাথে আমি পরিচিত ছিলাম। কিন্তু ৭/৮ বছর আগেও তাদের মধ্যে এ ধরণের কোন অহমিকা লক্ষ্য করিনি। আমি আগেও ওকে জিজ্ঞাসা করেছি, এখনও জানতে চাই ওরাও কি একই রকম ছিল? টাকা পয়সা, বাড়ি-গাড়ি, সোশ্যাল স্ট্যাটাস এসব নিয়ে কি ওদের মধ্যে কোন আলোচনা হতো? ও এবং ওর স্কুল বন্ধুরা বলেছে, না কখনোই না। ওদের সাথে বিভিন্ন ধরণের বাচ্চা পড়তো। ওরা কখনও জানতেও চাইতো না কার বাবার কত টাকা ছিল। বন্ধুর পরিবার নিয়ে বা পারিবারিক স্ট্যাটাস নিয়ে ওদের কোন মাথাব্যথাও ছিল না।
এর মানে আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক চরিত্রটাই ক্রমশ দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। পরিবার থেকে বাচ্চা শেখে। পরিবারই একটি শিশুর প্রথম পাঠ কেন্দ্র। বাড়িতে শিশুরা দাদা-নানা, বাবা-মা-ভাই-বোনকে যা বলতে শোনে, যা করতে দেখে সেটাই রপ্ত করে। ওরা কান পেতে শোনে কী কী বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। এখনকার শিশুদের ঘরটাই সব। সারাদিন এরা চার দেয়ালের মাঝেই থাকে। আর এখান থেকেই প্রাথমিক পাঠ নেয়।
অথচ আমাদেও শিশুকালটা ঠিক এরকম ছিল না। আমরা বাইরে খেলার সুযোগ পেতাম, টাকা পয়সা, সোশ্যাল স্ট্যাটাস, শাড়ি-গয়নার গল্প, বাড়ি-গাড়ি এসব নিয়ে আলোচনা করার বা শোনার কোন পরিবেশ ছিল না। নিতান্ত সাদামাটা জীবন ছিল আমাদের। আর যারা পাশাপাশি থাকতাম বা যারা এক ক্লাসে পড়তাম, তাদের অধিকাংশই ছিল প্রায় এক মানের।

আজকের দিনে নামকরা স্কুল মানেই কি পয়সাওয়ালাদের বাচ্চাদের জন্য স্কুল? কেন একটি নামকরা স্কুলে পড়তে হলে বাচ্চার বাবা মায়ের ইন্টার্ভিউ নেয়া হবে? যদি তাই হয়, তাহলেতো নগরীর ‘বিখ্যাত বা কুখ্যাত’ কালো টাকার মালিকের, চোর, বাটপারের, ভূমি দস্যুর বাচ্চারা, নাতি-নাতনিদের এসব স্কুলে ভর্তি হওয়ার কথা না । বাবা-মায়ের ইন্টার্ভিউ নেয়ার সময় স্কুল কর্তৃপক্ষ কি দেখেন, অভিভাবক কতটা ধনাঢ্য, নাকি শিক্ষিত, নাকি বিখ্যাত, নাকি তার সামাজিক স্ট্যাটাস? কোনটা?
আসলে সত্যি কথা বলতে আমাদের দেখার চোখ ও মন সব পাল্টে গেছে। এখন অনেক পরিবারেই শিশুকে ভেদাভেদ করার মানসিকতা দিয়ে বড় করে তোলা হয়। কিছু স্কুল এই মানসিকতার উপর ঘি ঢালে। পরিবার, শিক্ষাব্যবস্থা, সমাজ, পরিবেশ, পরিস্থিতি শিশুকে সংকীর্ণ মন নিয়ে বড় হয়ে উঠতে বাধ্য করছে। বাহ্যিক জৌলুস এতটাই প্রকট হয়ে উঠছে যে তা মনের দীনতাকে আরও বড় করে দিচ্ছে। শিশুর বড় হওয়ার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি স্তম্ভ পরিবার ও স্কুল, এই দুটি স্তম্ভ কি পারছে শিশুকে যথাযথ শিক্ষা দিয়ে বড় করতে? আমরা কি বাচ্চাকে শেখাতে পারছি যে তারা যেন মানুষকে মানুষ হিসেবেই দেখতে শেখে, আর কোনো পরিচয়ে নয়। তাকে কি ভাল-মন্দ বিচার করার বোধ জাগিয়ে তুলতে পারছি? জানি না, বুঝতে পারছি না। এইসব ছোট ছোট ঘটনা মনে কেবল প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







