‘নোয়াখালী জেলার হাতিয়া দ্বীপের অসহায় মানুষের প্রাণের দাবি- নদীভাঙন রোধ চাই, হাতিয়া উপকূলে ব্লক চাই। ভাঙন রোধে সফল নেতৃত্ব চাই।’ সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে এই আহবান জানিয়েছেন দ্বীপ উপজেলার হাতিয়া ডিগ্রী কলেজের একজন অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর। তার এই আহবানের পক্ষে অসংখ্য সমর্থন। সকলের কথায়ই হাতিয়াকে নিরাপদ রাখার দাবি।
একজন লিখেছেন, ‘হাতিয়ার নদী ভাঙ্গন রোধে সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ জরুরি। এখানে কাউকে দোষারোপ করে পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই। আমাদের যার যার অবস্থান থেকে এই দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করবার জোর চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।’ আরেকজনের উক্তি, ‘প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য্যরে লীলাভূমি হাতিয়া। এখন থেকে ব্লক ফেলে বাঁধ দেওয়া না হলে একদিন হয়তো মানচিত্র থেকে মুছে যাবে হাতিয়ার নাম।’ আরেকজন উল্লেখ করেছেন, ‘এই দাবি হাতিয়ার ৭ লাখ মানুষের। দাবি মোদের একটাই। বাঁচার মত বাঁচতে চাই। দ্বীপ হাতিয়ার নদী ভাঙ্গন রোধে ব্লক বাঁধ চাই।’ আরেকজন লিখেছেন, ‘হাতিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের অধিকার, দাবি নয়। জন্মভূমির অস্তিত্ব রক্ষায় প্রত্যেকে নিজ নিজ যায়গা থেকে অধিকার আদায়ের দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠুন।’
সামাজিক মাধ্যমে সচেতন নাগরিক গোষ্ঠীর প্রতিনিধির আহবান এবং এই আহবানের পক্ষে বহুজনের সাড়া দেওয়ার বিষয়টি প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে জনপদ বাঁচানোর দাবিকে আরও জোরালো করে দেয়। এই জোরালো দাবি এটাও ইঙ্গিত দেয়, ২৯ এপ্রিল এখনও উপকূলবাসীর কাছে আতঙ্ক নিয়ে আসে। ১৯৯১ সালের এই দিনে উপকূলের একাংশের ওপর দিয়ে বয়ে যায় ‘ম্যারি এন’ নামের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়। মহাপ্রলয়ঙ্করী ও স্মরণকালের ভয়াবহ ছিল এ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস। এতে লণ্ডভণ্ড হয়েছিল মহেশখালী, কুতুবদিয়া, বাঁশখালী, স›দ্বীপ, হাতিয়া, কক্সবাজার, চট্টগ্রামের ৩০০ কিলোমিটার এলাকা। ঘূর্ণিঝড় ও সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ১ লাখ ৩৮ হাজার হলেও বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা দ্বিগুণ। মারা যায় ২০ লাখ গবাদি পশু। গৃহহারা হয়েছিলেন ৫০ লাখ মানুষ।
সেদিন বিপর্যয়ের মুখে পড়া মানুষগুলো আজও দিনটির কথা মনে করতে পারেন না। স্বজন হারানোর কষ্টটা তাদের মনে আবার উঁকি দেয়। কেউ হারিয়েছেন বাবা-মা, ভাইবোনসহ পরিবারের সবাইকে; কেউবা হারিয়েছেন অন্যান্য স্বজনদের। হাজারো মানুষ যুগ যুগে তিলে তিলে গড়া সম্পদ হারিয়ে পথে বসে। জীবন শুরু হয় আবার নতুন করে। পূর্ব-উপকূলের একটি বড় অংশ বিরাণ জনপদে পরিণত হয়েছিল সেদিন। অনেকের পক্ষেই পূনরায় জীবনের পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়নি। ওই ঘূর্ণিঝড়ের পরে বহু মানুষ স্থানচ্যুত হয়েছে; অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছে।
উপকূল ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে এমন বহু মানুষের সাক্ষাত পেয়েছি, যারা ২৯ এপ্রিলের সেই ভয়াল ঘূর্ণিঝড়ে সব হারিয়েছিলেন। চরম বিপর্যয় মোকাবেলা করে সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়েছিলেন তারা। সেই কালো রাতে ঝড়ের ছোবলে মায়ের কোল থেকে হারিয়েছিল দুধের শিশু, ভাই হারিয়েছিল অতি আদরের বোন, স্বামী হারিয়েছিল প্রিয়তমা স্ত্রীকে, স্বজন হারানোর কান্না আর লাশের স্তুপে পরিণত হয়েছিল সমুদ্রপাড়সহ উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর নদীর তীর- অভিজ্ঞতা থেকে এমনটাই জানচ্ছিলেন জানাচ্ছিলেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। টগবগে তারুণ্যের সব হারানো সেই সব মানুষদের অনেকেই বার্ধক্যে ন্যূয়ে পড়েছেন। অনেকে আবার দুঃসহ সেই স্মৃতি নিয়ে চিরদিনের জন্য বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু, সেই শোকগাঁথা এইসব এলাকার মানুষদের জীবনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। সেই ভয়াল রাতের ভয় এখনও এইসব এলাকার মানুষদের তাড়িয়ে ফেরে।
কক্সবাজারের চকরিয়ার বদরখালী ইউনিয়নের নাপিতখালী গ্রামের ৬৫ বছর বয়সী হাজী নূর মোহাম্মদ বলছিলেন, তাদের যৌথ পরিবারে সদস্য সংখ্যা ছিল ৩৬। ঘূর্ণিঝড়ের তান্ডবে ১৬ জনের প্রাণহানি ঘটে। এর মধ্যে তার বাবা-মা ও পাঁচ ছেলেমেয়ে ছিল। শুধু বাবা ও এক ছেলের লাশ পেয়েছিলেন তিনি। বাকিদের কোনো সন্ধান মেলেনি। কথা বলতে গিয়ে অনেকের চোখ ভিজে ওঠে। সেদিন সন্ধ্যা ৭টায় বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। রাত ৮টায় বাড়িঘরে পানি ঢোকে। ৯টায় বাড়িঘর আর মানুষজন ভাসিয়ে নিতে শুরু করে। কেউ গাছ ধরেছেন, কেউ ভেসে গেছেন। রাত ১টার দিকে ভাটার টানে অধিকাংশ মৃতদেহ সমুদ্রে চলে যায়। এইসব দৃশ্য সমুদ্রপাড়ের মানুষদের স্মৃতিতে এখনও স্পষ্ট। চকোরিয়ার বদরখালীতে মাত্র পাঁচ শতাংশ বাড়ি অবশিষ্ট ছিল; বাকিগুলো উড়ে যায়। বদরখালী বাজার থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে ফিশারি ঘাটে চায়ের দোকানে আলাপকালে সেইদিনের ঘটনা বর্ণনা করছিলেন অনেকেই। মোজাফফর আহমেদ, নাসির উদ্দিন, মো. হাশেম, আলী হোসেনসহ উপস্থিত প্রায় সবাই ওই ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডব দেখেছেন। এখন আর তারা সেদিনের কথা মনে করতে চান না।
কক্সবাজারের পেকুয়ার উজানটিয়া, কুতুবদিয়ার তাবালচর, ধূরুং, চট্টগ্রামের বাঁশখালীর ছনুয়া, খানখানাবাদ, সদ্বীপের সারিকাইত, সীতাকুণ্ডের কুমিরার বহু মানুষের কাছে ২৯ এপ্রিলের প্রলয়ের গল্প শুনেছি। সকলেই যথাযথ প্রস্তুতির অভাবের কথা বলেছেন। ঘূর্ণিঝড় সতর্কীকরণ সংকেত সম্পর্কে মানুষের ধারণা ছিল না, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের অভাব ছিল, বেড়িবাঁধের অবস্থা ছিল নাজুক, যোগাযোগ ব্যবস্থাও ছিল অত্যন্ত খারাপ। অন্যসব বিষয়গুলো বাদ দিয়ে মাত্র এই চারটি বিষয়ের সঙ্গে বর্তমান অবস্থার মিল খুঁজতে গেলে আমরা কি পাবো? কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন এলেও অনেক বিষয়ে এখনও সেভাবে নজর দেয়া হয়নি।
ক. ঘূর্ণিঝড় সতর্কীকরণ
বিগত কয়েক বছরে ঘূর্ণিঝড় সতর্কীকরণ সংকেত নিয়ে ব্যাপক কাজ হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতির লক্ষ্যে দেওয়া সতর্কীকরণ বার্তা নিয়ে এখনও মানুষের মাঝে রয়েছে বিভ্রান্তি। ত্রুটিপূর্ন সতর্কীকরণ সংকেত ব্যবস্থায় পরিবর্তন করা হয়েছে। মানুষের কাছে আরও সহজলভ্য করা হয়েছে। কিন্তু এটা মানুষের কাছে কতটা পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে; সে বিষয়ে এখনও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। আমি উপকূলের বহু মানুষের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, এদের অনেকেই সতর্কীকরণ বার্তা সম্পর্কে সুস্পষ্ট বলতে পারেননি। অনেকে আবার বলেছেন, আমাদের ওসব বোঝার দরকার নেই। সবাই যখন ঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যায়; আমরাও তখন যাই। ২০০৭ সালে সিডর আঘাত করেছিল বাগেরহাটের শরণখোলার সাউথখালী গ্রামে। সেখানকার মানুষের সাথে কথা বলে জানতে পারি, সংকেত সম্পর্কে তাদের মাঝে বেশ সচেতনতা। তবে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার রাস্তাটি ঠিক নেই। মানুষই প্রশ্ন করেন, আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার সুবিধা না থাকলে সতর্কীকরণ সংকেত সম্পর্কে সজাগ থেকে লাভ কি?
খ. ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র
১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়ের আগে উপকূল অঞ্চলে আশ্রয়কেন্দ্র তেমনটা ছিল না। ওই ঘূর্ণিঝড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পরে এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের নজর বাড়ে। সজাগ হয় আন্তর্জাতিক সাহায্য প্রদানকারী সংস্থাগুলো। পর্যায়ক্রমে অসংখ্য আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয় উপকূল জুড়ে। কিন্তু এখনও ঝুঁকিতে থাকা সব মানুষের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। বহু এলাকার মানুষ এখনও ৩-৪ কিলোমিটার কিংবা ৬-৭ কিলোমিটার দূরের আশ্রয়কেন্দ্রে যান। ফলে বহু মানুষ কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেন না। ঘূর্ণিঝড়গুলো বার বার আমাদের শিখিয়ে গেলেও ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে এখনও আসেনি পরিবর্তন। প্রায় প্রতিটি ঘূর্ণিঝড়ের পরে অভিযোগ আগে, অমুক স্থানের তালাবদ্ধ আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে পারেননি ঘূর্ণিঝড় কবলিত মানুষেরা। অন্যদিকে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ তো আছেই। প্রভাব খাটিয়ে প্রয়োজন নেই, এমন স্থানেও নির্মাণ করা হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্র।
গ. ঝুঁকিপূর্ন বেড়িবাঁধ
উপকূলের বহু স্থানে রয়েছে ঝুঁকিপূর্ন বেড়িবাঁধ। বহু পুরানো বেড়িবাঁধ সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি অনেক স্থানে। অন্যদিকে বার বার ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাসে ক্ষতিগ্রস্থ বাঁধ মেরামতেরও কোন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। কক্সবাজারের টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের বেড়িবাঁধ জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যাওয়ার পর আর পূনঃনির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। গত পাঁচ বছরে দ্বীপ অনেকখানি ছোট হয়ে এসেছে। বহু মানুষ চলে গেছে অন্যত্র। শুধু শাহপরীর দ্বীপ নয়, আমি নিজে সরেজমিনে ঘুরে মহেশখালীর ধলঘাটা, মাতারবাড়ি, পেকুয়ার উজানটিয়া, কুতুবদিয়ার তাবালরচর, কিরণপাড়া, ধূরুং, সদ্বীপের সারিকাইতসহ বহু এলাকার ঝুঁকির চিত্র দেখেছি। হাজার হাজার মানুষ প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অনেক স্থানে বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাজে ধীরগতির কারণে মানুষের আতঙ্ক থেকেই যায়। শরণখোলার সিডর বিধ্বস্ত এলাকার মানুষ চেয়ে আছে বৃহৎ বাঁধ প্রকল্পের দিকে। কিন্তু কবে শরণখোলা নিরাপদ হবে; জানে না বিপন্ন মানুষেরা।
ঘ. নাজুক যোগাযোগ ব্যবস্থা
উপকূলের যোগাযোগ ব্যবস্থা এতটাই নাজুক যে, এক স্থান থেকে মানুষজনের অন্যস্থানে যাতায়াত অত্যন্ত কষ্টকর। বিশেষ করে দ্বীপ-চরের যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত খারাপ। ছোট দ্বীপের কথা বাদ দিয়ে আমরা যদি দ্বীপ উপজেলার কথা বলি; সেখানে সংকটের শেষ নেই। হাতিয়া কিংবা মনপুরায় দেখেছি, অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই খারাপ। দুর্যোগকালে অভ্যন্তরীণ যাতায়াতের বিষয়টি বড় হয়ে দেখা দেয়। মানুষজনকে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার তাগিদ দেওয়ার আগে অবশ্যই যাতায়াতের পথটা ভালো করতে হবে। ঘূর্ণিঝড়ের সিগন্যালের সময় অধিকাংশ দ্বীপ-চরে পানি উঠে যাওয়ায় মানুষজনের পক্ষে কোথাও যাওয়া সম্ভব নয়। তাছাড়া দ্বীপ-চর থেকে মূল ভূখন্ডে যাওয়ার ব্যবস্থা তো বরাবরই ঝুঁকিপূর্ণ। এইসব ক্ষেত্রে অবশ্যই মনোযোগ দিতে হবে।
দুর্যোগ মৌসুম এলে আতঙ্কে থাকে উপকূলবাসী। ২৯ এপ্রিলের বিশেষ দিনগুলো এলে তাদের সেই আতঙ্ক বাড়ে। আর ঘূর্ণিঝড়ের বিশেষ দিনগুলো সামনে এলে সেমিনার-সিম্পোজিয়াম হয়; বিভিন্ন দাবি নিয়ে মানবন্ধন হয়। এর পেছনে বেসরকারি সংস্থাগুলো খরচ করেন অনেক টাকা। এই টাকা উপকূলের ঝুঁকি কমাতে ব্যয় করা গেলে মানুষ বেশি উপকৃত হতে পারে। প্রতিবছর আমরা অন্তত একটি ছোট এলাকাকে ঝুঁকিমুক্ত করতে পারি; উপকূলের মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারি।
হাতিয়ার সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের আহ্বানের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলি, শুধু হাতিয়াকে নয়, সমগ্র উপকূলকে নিরাপদ রাখতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ চাই। আসুন, এ পর্যন্ত উপকূলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড়গুলো থেকে আমরা যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, আগে সেটুকুই কাজে লাগাই।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








