পাকিস্তানে ব্লাসফেমি আইনে মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া আসিয়া বিবিকে সাজা থেকে অব্যাহতির ঘটনায় পুরো দেশজুড়ে চলছে কট্টরপন্থিদের বিক্ষোভ। পরিস্থিতি সামলাতে কট্টরপন্থি ইসলামি দলগুলোর সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে সরকার।
সমঝোতার অংশ হিসেবে এরই মধ্যে আসিয়া বিবি ওরফে আসিয়া নওরিনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। তবে কতদিনের জন্য এই নিষেধাজ্ঞা, তা এখনো জানানো হয়নি।
এছাড়াও সিদ্ধান্ত হয়েছে, বিক্ষোভকারীরা আসিয়াকে খালাস দিয়ে সর্বোচ্চ আদালতের দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা যাবে।
এ সমঝোতা নিয়ে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী ফাওয়াদ চৌধুরী বিবিসি’কে বলেন, ‘আমাদের কাছে দু’টো পথ খোলা ছিল: হয় বল প্রয়োগ করতে হবে, আর বল প্রয়োগ মানেই মানুষ মরবে; যা একটি রাষ্ট্রের কখনোই করা উচিত না…. দ্বিতীয় পথ হিসেবে আমরা তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসেছি। আর আলোচনায় বসা মানেই আপনি কিছু পাবেন আর কিছু হারাবেন।’
তবে এই সমঝোতার মধ্য দিয়ে পাকিস্তান সরকার চরমপন্থিদের কাছে আত্মসমর্পণ করছে এবং তাদের প্রশ্রয় দিচ্ছে – এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মন্ত্রী।
‘আমাদের চরমপন্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, এ ধরনের সহিংস বিক্ষোভের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে এবং একটি চিরস্থায়ী সমাধানে আসতে হবে আমাদের। আপাতত এই যে চুক্তি, এটা কোনো সমাধান নয়। এটা শুধুই আগুন নেভানো, সেটাই আমরা করছি। চিরস্থায়ী সমাধান এখন মূল ব্যাপার এবং আমাদের সরকার এই সমাধান বের করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ,’ বলেন তিনি।
প্রতিবেশীর সঙ্গে ঝগড়ার সময় হযরত মুহাম্মদকে (সা.) নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করে জাতিকে বিভক্ত করার অভিযোগে ২০১০ সালে ব্লাসফেমি আইনে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী আসিয়াকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়া হয়েছিল।
অবশ্য আসিয়া বিবি বরাবরই তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আসছেন।
তারপরও গত ৮ বছর ধরে প্রায় পুরোটা সময় কারাগারে একাকি বন্দী অবস্থায় কাটাতে হয়েছে তাকে।
পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সাকিব নিসার ৩১ অক্টোবর আসিয়াকে ওই সাজা থেকে অব্যাহতি দিয়ে নির্দেশ দেন, অন্য কোনো মামলায় আটক না থাকলে যেন তাকে অবিলম্বে মুক্তি দেয়া হয়।
২০০৯ সালের জুনে প্রতিবেশীদের সঙ্গে মিলে বাগান থেকে ফল সংগ্রহের সময় এক বালতি পানি নিয়ে তাদের সঙ্গে আসিয়ার ঝগড়া বাঁধে।
মুসলিম প্রতিবেশীদের অভিযোগ ছিল, যেহেতু আসিয়া তাদের বালতিতে রাখা পানির কাপটি ব্যবহার করেছে, সেহেতু তারা আর সেটি ব্যবহার করতে পারবে না। কারণ খ্রিস্টান আসিয়ার ছোঁয়ায় কাপটি অপবিত্র হয়ে গেছে।
এ নিয়ে প্রতিবেশী নারীদের সঙ্গে আসিয়ার কথা কাটাকাটি শুরু হয়। তর্ক-বিতর্কের এক পর্যায়ে ওই নারীরা আসিয়াকে ইসলাম গ্রহণ করতে বলেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর অভিযোগ, ওই সময় জবাবে আসিয়া বিবি মহানবীকে (সা.) নিয়ে কিছু আপত্তিকর মন্তব্য করেন।
এ ঘটনার পর আসিয়াকে তার ঘরে নিয়ে প্রতিবেশীরা মিলে মারধর করে তার বিরুদ্ধে ব্লাসফেমি বা ধর্ম অবমাননার অভিযোগ আনে। তারা দাবি করে আসিয়া ব্লাসফেমির অপরাধ স্বীকারও করেছেন তখন।
এরপর পুলিশি তদন্তের পর গ্রেপ্তার করা হয় আসিয়াকে। তারই ধারাবাহিকতায় বিচারিক আদালতে মামলার রায়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। মামলাটি আপিলের জন্য হাইকোর্টে উঠলে ২০১৪ সালে আগের রায়ই বহাল রাখেন উচ্চ আদালত।
অবশেষে ২০১৫ সালে সুপ্রিম কোর্টে আপিল আবেদন করার পর সম্প্রতি অভিযোগ থেকে খালাস পান আসিয়া।
কিন্তু রায়ের পর থেকেই পাকিস্তানে ব্লাসফেমি আইনের সমর্থক গোষ্ঠী রাজধানী ইসলামাবাদসহ দেশজুড়ে রাজপথে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ করছে।
এই মামলার বিভিন্ন কার্যক্রমের দিন মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রাখার দাবিতে আদালতের সামনে অসংখ্য মানুষ মিছিল করেছে। তাই রায়কে ঘিরে বুধবারও ইসলামাবাদজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল।
পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ধর্ম ইসলাম। দেশটির আইনি ব্যবস্থায় এর বিভিন্ন পদ্ধতি বেশ কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়। তাই ব্লাসফেমি আইনগুলোর প্রতিও অধিকাংশ জনগণের সমর্থন বেশ দৃঢ়। কট্টর রাজনীতিকরা তাদের সমর্থনের ভিত্তি মজবুত করার জন্য ব্লাসফেমির কঠোর শাস্তিকে সমর্থন করে আসছে।
সমালোচকদের মতে, ব্লাসফেমি আইনকে পাকিস্তানে বেশিরভাগ সময়ই ব্যক্তিগত বিরোধে প্রতিশোধ নেয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব মামলা খুবই দুর্বল প্রমাণের ওপর ভিত্তিতে করা হয়।








