বাঁশ চেনেনা এমন চালাক মানুষ বাংলাদেশে অন্তত একজনকেও পাওয়া যাবেনা। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আমাদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঁশ। জন্মের পর মা-খালা, নানি-দাদিরা যে দোলনায় চাপিয়ে দোল দিতে দিতে আমাদের গান শুনিয়েছেন, সেই দোলনা তো বাঁশেরই তৈরি ছিল। আবার মৃত্যুর পর বাঁশের খাটিয়াতে চড়েই কবরে যেতে হয়। দাফনের পর মাটিচাপা দেওয়ার আগেও বাঁশ লাগে। অর্থাৎ জীবনের কোনো প্রান্তেই বাঁশ থেকে মুক্তি নেই। কিংবা বলা যেতে পারে, আমাদের জীবন কোনোভাবেই বাঁশমুক্ত নয়।
আমাদের সাহিত্যেও বাঁশের ব্যবহার আছে। ‘বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই, মাগো আমার শোলক বলা কাজলা দিদি কই’ এক সময় যতীন্দ্রমোহন বাগচীর এই কবিতাটি লেখাপড়া জানা বাঙালির মুখে মুখে ফিরত।
এক কবি লিখেছেন, ‘বাঁশ থেকে হয় শক্ত লাঠি/বাঁশ থেকে হয় বাঁশি/বাঁশির সুরেই রাধার মুখে/উঠত ফুটে হাসি।’ রাধা-কৃষ্ণের অমর প্রেমকাহিনীর সঙ্গেও কী চমৎকারভাবে জড়িয়ে গেছে বাঁশ! বাঁশ থেকে যে বাঁশি তৈরি হয়, সেই বাঁশিতে সুর তুলতেন কৃষ্ণ। সেই সুরের টানে ঘর ছেড়ে বের হতেন রাধা। আর ‘বাঁশি শুনে আর কাজ নেই, সে যে ডাকাতিয়া বাঁশি’ গেয়ে শচীন দেব বর্মণ একদা বাঙালি হৃদয়ে গভীর দোলা দিয়েছিলেন! শুধু তাই নয়, ছোটবেলায় তেলমাখা বাঁশ বেয়ে বানরের উঠে যাওয়া ও নেমে আসার অঙ্ক তো অনেককেই করতে হয়েছে। কিন্তু একটি তেলমাখা বাঁশে একটি বানর কেন উঠতে যাবে, সে রহস্য আজ পর্যন্ত কেউ উন্মোচিত করতে পারেনি। অঙ্কটা যে ছাত্রজীবনে অনেকের জন্য বাঁশ ছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
বাঙালির জীবনের সঙ্গে বাঁশ ছায়ার মতো জড়িয়ে আছে। আগেকার দিনে ঘর-গৃহস্থালির নানা কাজে বাঁশ ব্যবহৃত হতো। সম্পন্ন গৃহস্থের বাড়িতে বড় বড় ধানের গোলা দেখা যেত। সেই গোলা তৈরি করতে বাঁশ লাগত। ঘরের খুঁটি দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হতো বাঁশ। আজকের দিনের মতো ব্যাংক যখন ছিল না, তখন গ্রামের প্রান্তিক মানুষের টাকা-পয়সা সঞ্চয়ের জন্য বাঁশের খুঁটিই ছিল নির্ভরযোগ্য জায়গা। একবার ঢুকিয়ে দিতে পারলে সেখানে তো গিন্নির হাতও যাবে না। বাঁশের ঝুড়ি এখনো ব্যবহৃত হয়। চাষির মাথায় যে মাথাল ব্যবহৃত হতে দেখা যেত, সেটাও তৈরি হতো বাঁশ দিয়ে। জমিতে যে বেড়া দেওয়া হতো, তার প্রধান উপাদান ছিল বাঁশ (যদিও ‘বেড়ায় ক্ষেত খেলে’ তার দায় বাঁশের ওপর বর্তায় না)! বাঁশের বেড়ার ঘরও অনেক দেখতে পাওয়া যেত গ্রামে। এখন হয়তো তা আর দেখা যায় না। শখের বাগানবাড়িতে কেউ কেউ বাঁশের ঘর তৈরি করে রাখেন বটে। রাখালের হাতে বাঁশির সঙ্গে থাকত লম্বা বাঁশের লাঠি। সেসব দিন তো অতীত হয়ে গেছে। অশিষ্ট শিক্ষার্থীদের শিষ্ট বানাতে এক সময় শিক্ষকদের বেতই ছিল প্রধান সহায়, যা সৃষ্টি হতো বাঁশ থেকে। বাঁশ না থাকলে এ জাতি বহু আগেই উচ্ছন্নে যেত। 
আমাদের ইতিহাসের সঙ্গেও বাঁশের যোগ রয়েছে। তিতুমীর এবং তার ‘বাঁশের কেল্লার’ নাম শোনেননি এমন ব্যক্তি বাংলাদেশে নেই বললেই চলে। আমরা ছোটবেলায় বাংলাদেশের ইতিহাস অংশে পড়েছি, তিতুমীরের আসল নাম মীর নিসার আলী। তিনি জমিদার ও ব্রিটিশদের বিরূদ্ধে সংগ্রাম ও তার বিখ্যাত বাঁশের কেল্লার জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন। কিন্তু এতো কিছু থাকতে তিনি কেন কেল্লা বানাতে বাঁশের উপর ভরসা করলেন? কারণ তখন বাঙ্গালির কাছে গ্রামের পথেঘাটে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাঁশই ছিল প্রধান অস্ত্র। তাই ইংরেজদের কামানগোলার বিরুদ্ধে বাঁশকেই তিতুমীর বেছে নিয়েছিলেন দুর্গ গড়ার কাজে।
তিতুমীর ছিলেন জমিদারের লাঠিয়াল বাহিনীর প্রধান ও পালোয়ান হিসেবে তার ব্যাপক সুনাম ছিল। আর এই লাঠিয়াল বাহিনীর প্রধান অস্ত্র ছিল বাঁশ। তাই বাঁশের ক্ষমতা যে কত ভয়াবহ হতে পারে তা সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন। তাই গ্রামের দরিদ্র কৃষকদের উপর জমিদার এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার অত্যাচারের বিরুদ্ধে তিনি বাঙ্গালিদের সংঘবদ্ধ করেন এবং হাতে বাঁশ তুলে নেন। যখন বাঙ্গালিরা হাতে বাঁশ ধারণ করত তখন তাদের কাছে মনে হতো যে তাদের হাতে আছে পারমানবিক বোমার রিমোট কন্ট্রোল। যে কোনো সময় শুধু বাটন প্রেস করবে আর ইংরেজরা মাটির তিনহাত নিচে চলে যাবে। এই বাঁশের জাদুতেই বুঝি তিতুমীরের অনুসারীর সংখ্যা বেড়ে এক সময় ৫,০০০ গিয়ে পৌঁছে।
ইংরেজ ও তাদের তাঁবেদার জমিদারদের হাতে পরাজয়ের বাঁশ ধরিয়ে দিতে তিতুমীর তার বাহিনীর নিরাপত্তা, অস্ত্রশস্ত্র (মানে বাঁশ) মজুদ ও বাহিনীকে রণকৌশল প্রশিক্ষণের জন্য ১৮৩১ সালের ২৩শে অক্টোবর বারাসাতের কাছে নারিকেলবাড়িয়ায় বাঁশ এবং কাদা দিয়ে দ্বি-স্তর বিশিষ্ট এই অপূর্ব কেল্লা নির্মাণ করেন।
বাঁশ খাওয়ার ভয়ে অবশেষে ১৮৩১ সালের ১৪ নভেম্বর কর্নেল হার্ডিং-এর নেতৃত্বে ব্রিটিশ সৈন্যরা ভারী অস্ত্রশস্ত্র ও কামানগোলা নিয়ে তিতুমীর ও তার অনুসারীদের আক্রমণ করে। তিতুমীর তার অনুসারীদের নিয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন, কিন্তু কামানগোলার আঘাতে তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা শেষ পর্যন্ত চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়। অনেক লড়াই শেষে ১৯শে নভেম্বর তিতুমীর নিহত হন। মূল কথা হলো, বাঁশ যদি না থাকতো তাহলে বাঙালি অনুপ্রেরণার উৎস তিতুমীর এতদূর আসতে পারত না, পারত না ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে। তিতুমীরের এই বিদ্রোহ পরবর্তীকালে আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছে। ভিন্নভাবে বলা যায় বাঁশই আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা, আমাদের একমাত্র অস্ত্র যার প্রতিটি গিঁটে গিঁটে রয়েছে পরাধীনতার শিকল ভাঙার উচ্ছ্বাস। তাই তো আজও যেকোনো আপদে-বিপদে আমরা বাঁশকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি ও অত্যাচারীকে বাঁশ দেওয়ার হুমকি দিই।
তবে আমাদের সমাজে দৃশ্যমান বাঁশের চেয়ে অদৃশ্য বাঁশের ব্যবহারই বেশি। কেউ কাউকে অতিমাত্রায় প্রশংসা করলে সে ব্যক্তিকে বন্ধুরা প্রশ্ন করে, তিনি কি তোমার প্রশংসা করলো, নাকি বাঁশ দিল? আর আমাদের রাজনীতি মানেই তো একে অপরের মধ্যে বাঁশাবঁশি। রাজনীতিতে এ ধরনের প্রকাশ্য বাঁশ-থেরাপি চলছে দীর্ঘদিন ধরে। আমরা এমনই পাষণ্ড এক জাতি যে, বাঁশ দেওয়ার পরও খোঁচাতে ছাড়ি না। যাকে বাঁশ দেওয়া হলো তার কাছে তো খারাপ লাগবেই, অধিকন্তু যিনি বাঁশ দিয়েছেন তাকেও প্রশ্ন করা হয় আপনি যে বাঁশ দিয়েছেন তা কি গিরাযুক্ত, নাকি মসৃণ? ছোলা না আছোলা? এটা বাঁশ দেওয়ার পরিমাণ-মাত্রা অনুধাবন করার জন্য জিজ্ঞাসা করা হয় না, খোঁচানোর জন্য করা হয়!
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে বাঁশ শব্দের ব্যবহারেও পরিবর্তন এসেছে। কারো বাঁশ যাচ্ছে, কেউ বাঁশ খাচ্ছে, কেউ বাঁশ দিচ্ছে। কোনো ঘটনা কারো জন্য বাঁশ হয়ে যাচ্ছে। অমুক বাঁশ খেয়েছে, অমুক বাঁশ দিয়েছে, অমুক সেধে বাঁশ নিয়েছে- এমন অনেক কথা আমরা শুনে থাকি। এই বাঁশ খাওয়া-নেওয়া-দেওয়ার বিষয়টির সঙ্গে অনেকের বংশানুক্রমিক সম্পর্কও রয়েছে। উত্তরাধিকার সূত্রে কেউ কেউ বাঁশ খেতে, দিতে ও নিতে অভ্যস্ত।
বাঁশ যতই উপকারী হোক, হোক ঘাসজাতীয় উদ্ভিদ, বাঁশের এই ‘দেওয়া-নেওয়া-খাওয়া’ জাতীয় ব্যবহার আমাদের জন্য খুবই বিপদের কথা। কারো বাঁশ যাক, কেউ বাঁশ খাক- এটা আমরা চাই না। চাই না সুযোগ বুঝে কেউ বাঁশ দিক। কিন্তু আমাদের মতো আম-জনতার চাওয়ায় অবশ্য তেমন কিছু এসে যায় না। একদল মানুষ পুরো জাতিকে বাঁশ দিয়ে যাচ্ছেন। কাউন্টার ‘বাঁশ অ্যাটাক’ও যে কখনও হতে পারে-তারা সেটা বুঝতে পারছেন না! 
দুই.
জায়গার নাম বাঁশখালী। এটি চট্টগ্রাম জেলায় অবস্থিত। যেখানে শুধুই বাঁশ পাওয়া যায়, নাকি সব বাঁশ ঝাড়ে-বংশে খালি হয়ে গেছে, সেটা একটা জটিল ধাঁধা। তবে যে জায়গার নামের সঙ্গে বাঁশ-এর যোগ আছে, সেখানে বাঁশের প্রয়োগ-অপপ্রয়োগ কিছুটা ঘটবে-এটাই স্বাভাবিক। এখানে ঘটছেও তাই। এর আগে বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে ২০০৩ সালের ১৮ নভেম্বর রাতে বাঁশখালীর সাধনপুর গ্রামের শীলপাড়ার তেজেন্দ্র লাল শীলের বাড়িতে আগুন দিয়ে একই পরিবারের ১১ জনকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।
একটি পুরো পরিবারকে পুড়িয়ে মেরে সংখ্যালঘুদের অধিকার, একই সঙ্গে মানবধিকারের চেতনায় বাঁশ দেওয়া হয়!
সেই বাঁশখালী আবারও রক্তাক্ত ও কলঙ্কিত হয়েছে। এবার বাঁশখালীতে বেসরকারী উদ্যোগে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রতিবাদে গত ৪ এপ্রিল আয়োজিত স্থানীয় জনগণের বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের গুলিবর্ষণে চার ব্যক্তি (মতান্তরে ছয় ব্যক্তি) নিহত ও দুই শতাধিক লোক আহত হয়েছে। বাঁশখালী এবং এখানে প্রতিবাদী জনগণের উপর এমন গুলিবর্ষণের ঘটনা-ক্ষমতাসীনদের জন্য ‘বাঁশ’ দেখা দেয় কি-না এখন সেটাই ভাবনার বিষয়!
ছবি: ইন্টারনেট।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)










