ব-দ্বীপ প্রকাশনীর ‘ইসলাম বিতর্ক’ কে ‘অশ্লীল’ আখ্যা দিয়ে বইটি পড়তে নিষেধ করায় অধ্যাপক ও লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবালকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে সামাজিক মাধ্যম জুড়ে। জনপ্রিয় এই লেখকের মন্তব্যকে অনেকেই সমর্থন জানাচ্ছেন।
তবে অনেকেই আবার বলছেন বইটি নিয়ে জনপ্রিয় লেখক হিসেবে এমন মন্তব্য না করে তাঁর উচিৎ ছিলো বিষয়টি পাঠকের ওপর ছেড়ে দেয়া। অথচ তিনি তা না করে বইটি যাতে পাঠক না পড়ে এমন পরামর্শ দিয়েছেন। যা তাঁর মতো একজনকে মানায় না।
মুহম্মদ জাফর ইকবালের সমালোচনায় প্রকাশক রবীন আহসান ফেসবুকে লিখেছেন,‘ সমাজে নতুন নতুন ফতোয়াবাজের উৎপাত শুরু হয়েছে। মুহম্মদ জাফর ইকবালের ফতোয়াটা ভালো লাগেনি।’
পাঠকদের কী পড়া উচিৎ নয় এমন পরামর্শের জন্য জাফর ইকবালের সমালোচনায় রবীন লিখেছেন,‘ …প্রায় সকল শিক্ষকই ভাবে ছাত্ররা শিশু।…একজন শিক্ষক-লেখক এই যে আহ্বান করলেন “কেউ যেনো বইটি না পড়ে” এই আহ্বান থেকে বাংলাদেশের বর্তমান চেহারা খুঁজে পাওয়া যায়’।
ফেসবুক স্ট্যাটাসে একটি প্রশ্নের মাধ্যমে উদ্বেগের দিকটি চিহ্নিত করে অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট জোবায়েন সন্ধি লিখেছেন,‘চিন্তার বিষয় হলো- আমাদের অনেকেই এই লোকটাকে সাক্ষাৎ পয়গম্বর বানিয়ে ফেলেছেন। এই লোকের ভক্তরা যদি এমন আচরণ করেন, তাহলে নবী মুহাম্মদ (সা:)এর ভক্তরা যে আচরণ করেন তা মানতে আপত্তি কেন?’
তবে জাফর ইকবাল ‘স্যারের’ অসংখ্য ভক্তরাও ছেড়ে কথা বলার পাত্র নয়। শুধু একটি মন্তব্যের জন্য মুহম্মদ জাফর ইকবালকে নিয়ে যা-তা বলা কিংবা তাকে হেয় করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
জনপ্রিয় লেখকের সাম্প্রতিক উক্তি ঘিরে সমালোচনার তীর বর্ষণের সমালোচনা করে আইনজীবী রাজেশ পাল ফেসবুকে লিখেছেন,‘ মাত্র একটি কথার জন্য যেভাবে জাফর ইকবাল স্যারের উপর স্ট্যাটাস বারি বর্ষণ করে চলেছেন, তাতে সত্যিই অবাক হতে হয়। স্যার কোন ধর্মগুরু বা পীর সাহেব নন। উনার সব কথা আপনার বা আমার ভালো নাই লাগতে পারে। তাই বলে একটি ঘটনার জন্য একটি মানুষের সারা জীবনের স্ট্যান্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করার যৌক্তিকতা কতটুকু?’
তবু মতপ্রকাশে বিশ্বাসী একজন লেখক এবং যুক্তিতে বিশ্বাসী বিজ্ঞানের শিক্ষক হয়েও জাফর ইকবালের এমন মন্তব্য নিয়ে সমালোচনা বন্ধ না হওয়ার লক্ষণ সামাজিক মাধ্যমে স্পষ্ট।জাফর ইকবালকে ব্যঙ্গ করতেও ছাড়ছেন না কেউ কেউ।
হযরত বিনয় ভদ্রে নামের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে লেখা হয়েছে,‘ কী পড়বেন, কী পড়বেন না… শ্লীল- অশ্লীল কী? জাফর ইকবালের নতুন বই আসন্ন’।
কিন্তু একটি বই নিয়ে মন্তব্য করায় শিক্ষাবিদ ও জনপ্রিয় লেখকের আগের সব অবদান খাটো করে দেখতে নারাজ জাফর ইকবাল শুভানুধ্যায়ীরা।
‘স্যার পাশে আছি’ জানিয়ে ফেরদৌস ফয়সাল নামের একজন স্ট্যাটাসে লিখেছেন,‘জাফর ইকবাল স্যার মৌলবাদী জামাত-বিএনপি-জঙ্গীদের গালি খেয়েছেন, হিট লিস্টেও আছেন তাদের। অতি-লীগার গালিও খেয়েছেন মাঝে মাঝেই। এখন অতিনাস্তিকদের গালিও খাচ্ছেন। বেচারা! জাফর স্যার বিতর্কিত হলে কার লাভ বেশী, সেটুকু বন্ধুদের সবাইকে আরেকবার ভাবতে বলি। উনার সকল বক্তব্যের সাথে একমত হতে বলি না, কিন্তু সবদিক বিবেচনায় নিয়ে প্রো-৭১ এর সবাইকে সংযত হতে অনুরোধ জানাই। স্যারও একজন মানুষ এটুকু যেন আমরা ভুলে না যাই’।
মাসকাওয়াথ আহসান ‘শ্রদ্ধার-থার্মোমিটার’ শিরোনামে ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন,‘ স্বৈরাচারী এরশাদের সিদ্ধান্ত সকাল বিকাল পালটায়। এই একই রকম অস্থিরচিত্ত একটি স্বৈরাচারী মতমোড়ল সমাজ আছে। এদের হাতে আছে “শ্রদ্ধার-থার্মোমিটার”। কেউ তাদের পছন্দমত কথা বললে; তারা থার্মোমিটার দিয়ে মেপে হেসে বলে দেবে, হ্যা লোকটাকে শ্রদ্ধা করা যায়। আর একই লোক তাদের মন মতো কথা না বললে সঙ্গে সঙ্গে তাদের থার্মোমিটারে অশ্রদ্ধার পারদ চড়ে যায়। আঙ্গুল উঁচিয়ে বলে, হোনো মিয়ারা এই লোক শ্রদ্ধা হারাইলেন’।
গত ১৭ তারিখে বই মেলায় লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল ব-দ্বীপের ‘ইসলাম বিতর্ক’ বই নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। বইটি নিয়ে তাঁর মন্তব্য দেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। গণমাধ্যমকে জাফর ইকবাল বলেন,‘ যে বইটির কারণে স্টলটি বন্ধ করা হয়েছে, সেটির কয়েকটি লাইন আমাদের বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক পড়ে শুনিয়েছেন। আমি কয়েক লাইন শোনার পর আর সহ্য করতে পারিনি। এতো অশ্লীল আর অশালীন লেখা। এই স্টলটিকে আর অন্য দশটি সাধারণ স্টলের সঙ্গে তুলনা করলে চলবে না। তিনি বলেন, আমি মনে করে লেখালেখির সময় কিছুটা সতর্ক থাকতে হবে। যাতে কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না আসে। আর যে বইটির বিষয়ে কথা হচ্ছে, আমার অনুরোধ কেউ যেন এই বইটি না পড়ে’।
তবে বইটি ও প্রকাশনী বন্ধ করা নিয়ে মন্তব্য করলেও মুহম্মদ জাফর ইকবাল ব-দ্বীপ প্রকাশনীর প্রকাশক শামসুজ্জোহা মানিককে হাতকড়া পড়ানোর বিষয়ে কিছু বলেননি।







