মাছঘাটের আলো হঠাৎ নিভে গেল। থেমে গেল সবার ব্যস্ততা। রোজগার যা হয়েছে, তা নিয়েই ঘরমুখো সবাই। মাছধরা ট্রলারে থাকা সৌরবাতির প্যানেল, ব্যাটারি, কাঁথা-বালিশ, জাল, দড়িসহ সবকিছু নিয়ে ছুটছে মানুষগুলো। কারও হাতে রশিতে ঝোলানো দু’এক হালি ইলিশ। দুপুরে ইলিশ ভাজার গন্ধ নাকে এসে ধাক্কা দেয়। টাকা-পয়সার হিসাবের জন্য কেউ কেউ বসে আছেন রাস্তার ধারে। এতসব দৃশ্যপটের মাঝেও মানুষগুলো মলিন মুখ। কারণ,ইলিশ ধরার প্রধান মৌসুম এই চার মাসের শ্রমে যা পাওয়া গেল- তা এক কথায় ‘সমান সমান’ অথবা ‘ক্ষাণিকটা ঘাটতি’। শ্রমজীবী মানুষগুলো কয়েকদিন ভালো খাবে। ধারদেনা শোধ করবে। কেউ নতুন মোবাইল সেট কিনবে। কেউবা নতুন কাপড় কিনবে। অনেকে আবার অবসরে শহরে বেড়াতে যাবে। কারও প্রস্তুতি পরের ইলিশ মৌসুমে আরও ভালো প্রস্তুতি নেওয়ার।
গল্পটা ঢালচরের। ইলিশ মৌসুমে ঢালচর কতটা জমজমাট হয়, ইলিশ এলে সেখানে কেমন উৎসবের আমেজ তৈরি হয়- সেটাই দেখতে গিয়েছিলাম এবার। অন্য সময়ের ঢালচরের সঙ্গে এই সময়ের ঢালচলের অনেক তফাত। শুধু ঢালচরের মানুষই নয়, বাইরে থেকে বহু মানুষ এখানে মাছ ধরতে আসেন ইলিশ মৌসুমে। জুনের প্রথম সপ্তাহ থেকে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত এই চারটি মাসের জন্য অপেক্ষায় থাকেন জাল নৌকার ওপর ভর করা মানুষেরা। সকলেই সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে প্রস্তুতি নেন। এজন্য অর্থ ব্যয় হয় অনেক। মহাজনের কাছ থেকে ধারদেনা করতে হয়, এনজিও থেকে ঋণ নিতে হয়। ভাগ্যে কী ঘটবে, সেটা কেবল মৌসুম শেষেই বলা যাবে। এ বিষয়টিকে অনেকটা লটারির সঙ্গে তুলনা করা যায়। সেভাবেই জেলেরা নামেন নদী-সমুদ্রে।
ইলিশ মৌসুম শেষ হওয়ার আগে ঢালচরে পা রাখতেই ভেসে আসে মানুষের গমগম শব্দ। তারও আগে চরফ্যাশনের কচ্ছপিয়া ঘাট থেকে ছোট্ট লঞ্চে উঠেই ঢালচরে মানুষের চাপ অনুভব করা যায়। বুঝতে পারি, ব্যবসায়ীদের বেচাকেনা এখন বেশ ভালো। লঞ্চ ভরে যাচ্ছে মালামাল। বয়লার মুরগি, আখের আঁটি, বিস্কুটের বস্তা, তরকারি, চালডালের বস্তা, হোগল পাতার চাটাই- আরও অনেককিছু। সন্ধ্যা হতে না হতেই ঢালচরের প্রাণকেন্দ্র আবদুস সালাম হাওলাদার বাজার মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে। অন্য সময়ে এসে যে বাজার দেখেছি একেবারেই নিষ্প্রাণ, সে বাজার এখন যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। দোকানপাটে ভিড়। চায়ের দোকানে ঠাঁই নেই। কাপের পর কাপ চা আসছে। আলাপ হচ্ছে ব্যবসা বাণিজ্যের। ওদিকে আবার বাংলা সিনেমার গান বাজছে টেলিভিশনে। গানের তালে অজান্তেই মাথা দুলছে অনেকের।
বাজারে হাঁটি। কথা বলি মানুষের সঙ্গে। দুলাল বেপারি, যিনি দ্বীপ-চরে ফেরি করে চুড়ি-ফিতা-আংটিসহ মেয়েদের বিভিন্ন সাজসজ্জার সামগ্রী বিক্রি করে বেড়ান; তার রোজগার ভালো। বিকেল পাঁচটায় দোকান বসিয়ে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার মধ্যে বিক্রি করে ফেলেন প্রায় ৭শ’ টাকা। বাজারের দক্ষিণে যে চায়ের দোকানে অন্য সময় কোন লোকই দেখিনি; এখন সেখানে বসার স্থান পাওয়া কষ্টকর। ইলিশ মৌসুমকে ঘিরে দেশ কয়েকটি নতুন খাবারের দোকান বসেছে। এগুলোতেও বেচাকেনা ভালো। নতুন কাপড়ের দোকানে বেশ ভিড় লক্ষ্য করা গেল। কেউ নতুন জামা বানাচ্ছে, কেউ নতুন লুঙ্গি কিংবা শাড়ি কিনছে। যে বাজার রাত ১০টার মধ্যে নিস্তব্ধ হয়ে যেতে দেখেছি; সে বাজার এই মৌসুমে অধিক রাত পর্যন্ত জমজমাট। বাজার থেকে মাঠঘাট পর্যন্ত- এ যেন একখণ্ড শহর। মানুষের জটলা, আলাপচারিতা, টাকার হিসেব, বৃদ্ধা আর তর্জনী আঙ্গুলে থুথু লাগিয়ে টাকা গোনার দৃশ্য। এই চিত্রটুকু ছবির ফ্রেমে ধরে রাখলে মনে হবে ঢালচর বেশ উন্নত-আধুনিক কোন জনপদ।
এই যে একটা ঝিমিয়ে থাকা জনপদ জমজমাট হয়ে ওঠে, দোকানপাটে বেচাকেনা ভালো হয়, মানুষের হাতে টাকা আসে- এর নেপথ্যে রয়েছে ‘ইলিশ’। অন্য মৌসুমে কে কী করবেন, সেটা ঠিক না থাকলেও ইলিশ মৌসুমে সবাই বেশ ভালো করেই প্রস্তুতি নেন। জেলেরা নদীতে নামার আগে উপকূল ঘুরে দেখেছি তাদের প্রস্তুতি। নৌকা মেরামত, প্রয়োজন হলে নতুন নৌকা তৈরি, আলকাতরা লাগিয়ে নৌকা টেকসই করা, জাল কেনা, জাল বুনন- ইত্যাদি নানান কাজ। সবার লক্ষ্য কিন্তু একটাই, বেশি ইলিশ পেয়ে বেশি লাভবান হওয়া। ছোটবড় সকলে নামে নদীতে। একজন নৌকায় থাকা মানে আহরিত ইলিশের ‘একভাগ’ পাওয়া। অন্য সময়ে যে সব শিশুরা দোকানপাটে যোগালির কাজ করে, এই সময়ে তারা যায় মাছধরার নৌকায়। কাঞ্চন মাঝির ছেলে রাজিব কাজ করছিল হোটেলে; ভরা ইলিশ মৌসুমে তাকে খুঁজেই পাওয়া গেল না। জানা গেল, সে মাছ ধরতে গেছে।
ইলিশ মৌসুম সামনে রেখে জেলেদের সব আয়োজন। কিন্তু শেষ অবধি জেলেরা কী পাচ্ছেন? মৌসুমের শুরুর দিকে বিভিন্ন স্থানের জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, ইলিশ তেমন পড়ছে না। কেউ কেউ বললেন, এতটা মাছশূন্যতা এর আগে কখনো দেখিনি। মৌসুমের শেষ দিকে এসে জেলেদের মুখে শুনলাম, জালে এত ইলিশ তারা এর আগে কখনো দেখেননি। মানে মাছশূন্যতা এবং ব্যাপক মাছ পড়া, দু’টো চিত্রই দেখেছেন এবার জেলেরা। তবে মাছ পড়ার সময়টা ছিল খুবই কম, মাত্র ১২ থেকে ১৫ দিন। ইলিশ মৌসুমের শেষদিন পর্যন্ত বহু জেলের সঙ্গে কথা বলি। জানতে পারি, এবার তাদের রোজগার ভালো নয়। যে আয়োজন-প্রস্তুতি নিয়ে তারা নদীতে নেমেছিলেন, সে অনুযায়ী মাছ মিলেনি। ঢালচর গিয়ে প্রথমেই জেলেদের নানান অভিযোগের মুখে পড়ি। তারা বলেন, প্রথমদিকে ভালো মাছ পাওয়া গেলে এবার দোনা শোধ করেই লাভবান হতে পারতাম। কিন্তু ইলিশ পাওয়া গেছে শেষ সময়ে। ইলিশ যখন পড়া শুরু করলো, তখনই নিষেধাজ্ঞার সময় এসে গেল। আর দশটা দিন মাছ ধরতে পারলে কেউ লোকসানে থাকতো না।
ইলিশ মৌসুমের শুরুতে যেভাবে ইলিশ ধরার প্রস্তুতি দেখেছি, ঠিক সেভাবেই মৌসুম শেষে জেলেদের ঘরে ফেরার প্রস্তুতিও দেখেছি। ঢালচরের প্রায় সকল জেলে নিষেধাজ্ঞা শুরুর একদিন আগেই মাছধরা বন্ধ করেছেন। আড়তদারদের সঙ্গে হিসাব নিকেশ করা, ট্রলারের মালামাল নিয়ে ঘরে ফেরার দৃশ্য দেখে কোনভাবেই মনে হয়নি, এদের কেউ নিষিদ্ধ সময়ে মাছ ধরতে নামবেন। তারপরও মা-ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা শুরুর এই ৪-৫দিনে অন্তত ২৫-৩০জন জেলেকে আইন অমান্য করার অভিযোগে আটক করা হয়েছে। অনেকের শাস্তিও হয়েছে। কিন্তু যে জেলেরা মাছ ধরে মোটামুটিভাবে খেয়ে পড়ে টিকে থাকতে পারেন, তারা আইন ভেঙ্গে নদী-সমুদ্রে নামতে চান না। নিষিদ্ধ সময়ে জেলেদের জন্য যে সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, সেটা এখনও মাঠে যায়নি। আবার মাঠে গেলেও সেটা সকলের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছায় না। সরকারি সহায়তা বিতরণে রয়েছে নানান ধরণের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। নিষেধাজ্ঞা সময়ে জেলেদের নদী-সমুদ্রে যেতে বারণ করার আগে এইসব বিষয়ে নজর দেওয়া জরুরি।
ট্রলার থেকে উঠে সব মালামাল নিয়ে যে জেলে ঘরে ফিরলো, তাকে অন্তত ছ’মাস বেকার থাকতে হবে। শীত মৌসুমে মাছ ধরতে নামবেন খুব কম জেলে। মার্চ-এপ্রিলে আবার ঝাটকা মৌসুমের নিষেধাজ্ঞা। এই সময়ে জেলেরা কী খাবে? বেকার সময়ে কাজের সুযোগ করে দিন, জেলেরা নিষেধাজ্ঞা ভেঙে নদী-সমুদ্রে যাবে না। আইন অমান্য করে তারা আর জাল ফেলবে না। অধিক ব্যয়সাপেক্ষ অভিযানও চালাতে হবে না। জাল পোড়াতে হবে না, জেলেদের জেলেও পুড়তে হবে না। এমন একটা পদ্ধতি গড়ে উঠুক; যাতে জেলেরা নিজেদের কথা চিন্তা করেই নিষিদ্ধ সময়ে মাছ ধরা বন্ধ রাখে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








