‘তিন কন্যা’ কিংবা ‘পারমিতার একদিন’। সমকালীন ‘আরশীনগর’ বা এ সময়ের ‘সোনাটা’। সাড়ে পাঁচ দশকেও সমান সজীব অদ্বিতীয় এবং বহুমাত্রিক অপর্ণা সেন। প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের প্রতিনিধি ইরানের অভিনেত্রী ফাতিমা সিমিনের দিকে। প্রশ্ন-উত্তর পর্ব হয়ে ওঠে যেন শৈল্পিক যুদ্ধক্ষেত্র। যে প্রশ্ন-উত্তর পর্বে সাবলীলতায় প্রবেশ করে প্যালেস্টাইন। ঘটে বিশ্বাস বৈচিত্র্যের সম্মিলন।
‘যে স্কার্ফ তুমি পরছ সেটি কি ধর্মীয় পরিচয়ের গন্ডিতে, বিশ্বাসে নাকি জোর করে চাপিয়ে দেওয়া ধরণ?’ অপর্ণা সেনের প্রশ্ন। স্মিত হাসিতে ইরানি মাঝবয়সী গোলাপ বলে ওঠেন, ‘যুদ্ধের বিষয় কোনটি হবে তা নির্ধারণ করতে পারাটা জরুরী। আট বছর ধরে দেশের বাইরে আমি স্কার্ফ দেই মাথায়। তার নির্দিষ্ট কোন নিয়ম নেই যে কতটুকু তুমি দেবে কতটুকু ঢাকবে কিন্তু স্কার্ফ তোমাকে দিতে হবে। আমি দেশের বাইরে গেলে স্কার্ফ থাকতো না। যেহেতু পরিচিত মুখ। এখন আরো ইন্টারনেটের সময়। ফলে কোথা কি করছি, যাচ্ছি এমনকি শয়ন কক্ষের ছবিও (হাসি) পৌছে যায় সবার দোরগোড়ায়। শাস্তি পেতে হয়েছিল দেশে ফিরে। শাস্তি এই অর্থে যে তারা বলেছিল তুমি দেশের প্রতিনিধিত্ব করছ। বিখ্যাত তুমি। তাই তোমার উচিত দেশকে রিপ্রেজেন্ট করা। হ্যাঁ, এই বাধ্যতামূলক ঘটনা ইসলামী বিপ্লবের পরে ঘটেছে ঠিকই। কিন্তু আমরা মেনেও নিয়েছি কিন্তু। সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের জায়গা ভেবে ।’

একটু ভারী কণ্ঠে সিমিন বলেন, কঠোরতা অনেক কমে গেছে। অভ্যস্ত হয়েছে যেমন সবাই তেমনি কথা বলার স্বরও বেড়েছে। স্কার্ফ জাতীয় বিষয় এখন আর আমাদের মূল আলোচনার টেবিলে নেই।’ পরিবেশ হালকা করে হাসতে হাসতে তিনি বলেন, গত ৪০ বছর ধরে এ বিষয়ে নারীরা নানা ভাবে বলতে বলতে ধরণ এত পাল্টেছে যে এখন একটু ছোঁয়া থাকলেই হয়। তা দেশে কিংবা দেশের বাইরে যেখানেই হোক।’
আবারো প্রশ্নকর্তা ‘আরশীনগর’ নির্মাতা। বলেন, ‘ইরানের চলচ্চিত্রে শিশু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নারী বিষয়ে ইরানের চলচ্চিত্রের দৃষ্টিভঙ্গি কী? উপমহাদেশের মূলধারার চলচ্চিত্রে নারী অনেকটা পণ্য হিসেবে চলচ্চিত্রে আসে। যে দৃষ্টিভঙ্গি ধীরে গতিতে হলেও বদলাচ্ছে। সেখানে ইরানের অবস্থা কী?’
সহজ ভাষায় ফাতিমা সিমিন বলেন, বিশেষ করে শেষ ১০ বছরে সৃজনশীল ক্ষেত্রে নতুন রক্ত সঞ্চালনে নতুন ভাষা তৈরী হয়েছে। ইরানের চলচ্চিত্রে শিশু যতটা গুরুত্ব পেয়েছে এখন নারীও নানা আঙ্গিকে উঠে আসছে। তবে নিজস্ব ভাষায়।’
নিজেদের আবাসভূমির স্বাধীনতা সংগ্রামেরত প্যালেস্টাইনের প্রতিনিধি ঢুকে পড়েন কথোপকথনে। নির্মাতা তরুণীর চলচ্চিত্র ‘রাইজ আপ’ প্রদর্শিত হবে এই উৎসবে। অগ্রজ অভিনেত্রীর প্রতি লন্ডনে বসবাসরত প্যালেস্টাইনির প্রশ্ন, ‘ইরানে সিনেমার সকল ক্ষেত্রে নারীর অবস্থান কেমন?’ দৃঢ় প্রত্যয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের নির্মাতা থেকে শুরু করে অভিনয়, প্রযোজনা, ক্যামেরা, সাউন্ডস-সব জায়গায় নারীর সতন্ত্র জোরালো অবস্থান রয়েছে। এমনকি পুরো প্রোডাকশন্স শুধুমাত্র নারীর, সেটিও আছে।’
১৬ তম ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে রাজধানীর আলিয়ঁস ফ্রাঁসেজ এ ‘সিনমায় নারী’ বিষয়ক চতুর্থবারের মত আয়োজিত সম্মেলনের প্রথম সেমিনারের বিষয় ছিল ‘তিন প্রজন্মের ইরানি অভিনেত্রী’। যেখানে সঞ্চালকের ভূমিকায় ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সিন্ডি লিভেন। ফাতিমা সিমিনের সঙ্গে সামনে বসে ছিলেন বাংলাদেশের সংস্কৃতি সাংবাদিক সাদিয়া খালিদ এবং ভারতের নির্মাতা মধুরিমা সিনহা।
সিনেমা শিল্পের প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে দর্শক সারির প্রথমে বসে থাকা অপর্ণা সেন এগিয়ে আসেন ফাতিমার দিকে। তার কাছ থেকে চেয়ে নেন একটি স্কার্ফ। দাড়ান পাশে। উঠতে থাকে আলোকচিত্র। বিশ্বাস বৈচিত্র্যের সম্মিলনে তৈরী হয় অসাধারণ ক্ষণ।








