পাকিস্তানে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় পূর্ণাঙ্গ রূপান্তরের পথে দেশীয় ব্যাংকগুলোর জন্য কঠোর বাধ্যবাধকতা আরোপ করলেও বিদেশি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর জন্য আলাদা সুবিধা রাখছে দেশটির সরকার।
২০২৮ সাল থেকে দেশীয় ব্যাংকগুলোকে পুরোপুরি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং পরিচালনা করতে হবে, তবে বিদেশি ব্যাংকগুলো প্রচলিত ও ইসলামী উভয় ধরনের ব্যাংকিং সেবা চালিয়ে যেতে পারবে—এ সিদ্ধান্তে বাজারে অসম প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জাপান-ভিত্তিক ইংরেজি ভাষার সংবাদমাধ্যম ‘নিক্কেই এশিয়া’ বিষয়টি নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
সম্প্রতি পাকিস্তান সরকার ঘোষণা দিয়েছে, ২০২৮ সাল থেকে সরকারি ঋণসহ সব ধরনের ব্যাংকিং লেনদেন শরিয়াহসম্মত পদ্ধতিতে পরিচালিত হবে। সুদভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থা বাদ দিয়ে বাণিজ্য, ইজারা, অংশীদারিত্ব ও মুনাফা ভাগাভাগিভিত্তিক অর্থায়ন ব্যবস্থার দিকে যাবে দেশটি। ২০২২ সালে আদালতের এক রায়ের আলোকে অর্থ বিভাগ প্রকাশিত ‘পাকিস্তানে ২০২৭-পরবর্তী আর্থিক ব্যবস্থা’ শীর্ষক নীতিপত্রে এ পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে।
নীতিমালা অনুযায়ী, দেশীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো ধাপে ধাপে প্রচলিত ঋণ ও অর্থায়নের পরিবর্তে শরিয়াহসম্মত বিকল্প চালু করবে। তবে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে নেওয়া প্রচলিত ঋণ ও আর্থিক দায় চুক্তি অনুযায়ী পরিশোধ করা হবে।
বর্তমানে পাকিস্তানে ৩৩টি ব্যাংক রয়েছে। এর মধ্যে সাতটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংক এবং ১৬টি প্রচলিত ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকিং সেবা প্রদান করে। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ দেশটির ব্যাংকিং খাতের মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ২২৮ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে ইসলামী ব্যাংকগুলোর সম্পদ প্রায় ৫২ বিলিয়ন ডলার বা মোটের ২৩ শতাংশ।
তবে বিদেশি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোকে প্রচলিত ও ইসলামী দুই ধরনের সেবা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। খাতসংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি বলছেন, এই হাইব্রিড ব্যবস্থা বিদেশি ব্যাংকগুলোকে প্রতিযোগিতায় বাড়তি সুবিধা দেবে।
একটি শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, হাইব্রিড মডেলের কারণে বিদেশি ব্যাংকগুলো একদিকে তাদের প্রচলিত সব ধরনের পণ্য ও সেবা বজায় রাখতে পারবে, অন্যদিকে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের ক্রমবর্ধমান গ্রহণযোগ্যতা ও লাভজনকতার সুবিধাও পাবে।
তার মতে, পাকিস্তানে কার্যরত অনেক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে ভোগ্যপণ্য খাতের কোম্পানিগুলোর কাছে ব্যাংকিং সিদ্ধান্ত ধর্মীয় নয় বরং বাণিজ্যিক বিষয়। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কিছু প্রতিষ্ঠান ছাড়া অধিকাংশই ইসলামী অর্থায়নে যাওয়ার বিশেষ আগ্রহ দেখায় না।
ইসলামাবাদের স্বাধীন অর্থনীতিবিদ শহীদ মেহমুদ বলেন, ব্যাংকগুলোর ওপর জোর করে শরিয়াহভিত্তিক আইন চাপিয়ে দিলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও বৈশ্বিক ব্যাংকগুলোর কাছে নেতিবাচক বার্তা যাবে এবং প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে। তাই বিদেশি ব্যাংকগুলোর জন্য এই ব্যবস্থা একটি সমঝোতার পথ।
অন্যদিকে পাকিস্তানের অর্থমন্ত্রীর উপদেষ্টা খুররম শেহজাদ বলেন, হাইব্রিড ব্যবস্থা কোন প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা তৈরির উদ্দেশ্যে নয়; বরং সাংবিধানিক নির্দেশনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি আর্থিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার রক্ষা করাই এর লক্ষ্য।
তবে ২০২৮ সালের মধ্যে দেশীয় ব্যাংকগুলোকে পুরোপুরি ইসলামী ব্যাংকিংয়ে রূপান্তর করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে।
এক ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, নতুন ব্যবসা শরিয়াহসম্মত কাঠামোয় পরিচালনা করা সম্ভব হলেও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিদ্যমান শাখা, গ্রাহক হিসাব এবং চলমান অর্থায়নকে ইসলামী কাঠামোয় রূপান্তর করা।
লাহোরভিত্তিক আইন ও কর পরামর্শক ইকরাম উল হক বলেন, নির্ধারিত সময়সীমা বাস্তবায়নের জন্য সংসদে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘সুদ নিষিদ্ধকরণ আইন’ পাস করা জরুরি। এতে সুদের স্পষ্ট সংজ্ঞা, অনুমোদিত অর্থায়ন পদ্ধতি, রূপান্তরের নীতিমালা, কর-নিরপেক্ষতা এবং বিরোধ নিষ্পত্তির কাঠামো থাকতে হবে।
তার মতে, এই রূপান্তর সফল হলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়তে পারে, ইসলামী অর্থায়ন খাত শক্তিশালী হবে এবং শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগে আগ্রহী বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে।
তবে ব্যাংকিং খাতের অন্য একটি অংশের মতে, শুধু ইসলামী ব্যাংকিং চালু করলেই আর্থিক অন্তর্ভুক্তির সমস্যা সমাধান হবে না। তাদের মতে, এ জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী অর্থনীতি, কার্যকর প্রতিষ্ঠান এবং মানুষের আয় বৃদ্ধি।







