মাদকাসক্তি বিষয়টিকে আমরা অনেক গুরুত্ব নিয়ে দেখি। এই আসক্তির কুপ্রভাব ও চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করি, আসক্তকে নিরাময় কেন্দ্রে পাঠাই বা পাঠানোর কথা বলি। কিন্তু বর্তমান সময়ের এক আশির্বাদ যে আসক্তির অভিশাপ হয়ে তরুণ প্রজন্মের পিছু নিয়েছে সেদিকে আমাদের নজর নেই।
অভিশাপটির নাম ‘ইন্টারনেট আসক্তি’, যা কেড়ে নিচ্ছে তরুণ প্রজন্মের সামাজিক জীবন, মানুষ হারাচ্ছে চাকরি।
‘ইন্টারনেট আসক্তি’ (Internet Addiction) একটি একেবারেই নতুন সমস্যা। আমাদের দেশ তো দূর, উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতেও একে এখনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। ইন্টারনেটে আসক্ত ব্যক্তির মস্তিষ্কে ঠিক কী চলে – চিকিৎসাবিজ্ঞান এখনো তা বুঝে উঠতে পারেনি। এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট সংজ্ঞায়ও বাঁধা যায়নি ইন্টারনেট আসক্তিকে।
তবুও যুক্তরাষ্ট্রের বহু বাবা-মা অভিযোগ করেন, তাদের ছেলেমেয়ে কোনো না কোনো স্ক্রিনের দিকে সারাক্ষণ
তাকিয়ে থাকে। এর ফলে তারা পড়ায় ফাঁকি দিচ্ছে, অনেকে লেখাপড়া ছেড়েই দিচ্ছে। অন্যদিকে পরিবার, আত্মীয় ও বন্ধুদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সামাজিক বিভিন্ন পরিস্থিতিতেও অস্বস্তি বাড়ছে তাদের।
অভিভাবকদের সহায়তা প্রদানভিত্তিক যুক্তরাষ্ট্রের সংস্থা কমন সেন্স মিডিয়া ১৩শ’র বেশি কিশোর-কিশোরী ও তাদের ওঅভিভাবকদের ওপর একটি গবেষণায় দেখে, ৫৯ শতাংশ অভিভাবক মনে করেন তাদের সন্তানরা বিভিন্ন মোবাইল ডিভাইসের (স্মার্টফোন, ট্যাব…) প্রতি আসক্ত। সেখানে ৫০ শতাংশ ছেলেমেয়ে নিজেই নিজের ব্যাপারে এমন ধারণা পোষণ করে বলে গবেষণায় দেখা যায়।
পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর যে, অনেক বাবা-মা-ই এই আসক্তি থেকে বের করে আনতে তাদের সন্তানের
চিকিৎসা করাতে চাইছেন। এজন্য তারা হাজার হাজার ডলার খরচ করতে রাজি।
ইন্টারনেট আসক্তির শিকার ২২ বছর বয়সী অ্যালেক্স বলেন, ‘এটি (ইন্টারনেট আসক্তি) মাদকদ্রব্যে আসক্তির মতো স্পষ্ট নয়, কিন্তু এটি খুবই, খুবই বাস্তব একটি সমস্যা।’ অ্যালেক্সের বাবা-মা তাকে বেশি বেশি করে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত করতেন। কিন্তু তারা জানতেন না এর অতিরিক্ত ব্যবহারে লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হচ্ছে তাদের ছেলের।
অ্যালেক্স অনলাইন গেমস এবং ইন্টারনেটের অন্যান্য ব্যবহারে এতটাই ডুবে গিয়েছিলেন যে একসময় তার মনে হয়েছে ক্লাস অথবা কাজে যাওয়ার চেয়ে এ কাজগুলোই বেশি ভালো। তাই তিনি কলেজে যাওয়াই ছেড়ে দেন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে তাকালেও এখন চিত্র অনেকটা এমনই। শুধু তরুণ প্রজন্ম নয়, শিশুদের মধ্যেও এখন
দেখা যায় মোবাইল ফোন, ট্যাব, কম্পিউটার, ল্যাপটপ আর ইন্টারনেটের ব্যাপক ব্যবহারের প্রবণতা। নিয়মিত এসব ব্যবহারে অভ্যস্ত শিশু-কিশোররা কিছুক্ষণের জন্য এগুলো থেকে দূরে থাকলেই অস্থির হয়ে পড়ে। আর যাদের কাছে এই প্রযুক্তি-পণ্যগুলো নেই, আশপাশে দেশে তাদের মধ্যে জন্ম নেয় হাহাকার আর অপূর্ণতার অনুভূতি।
ইন্টারনেট এবং স্মার্ট ডিভাইসের প্রতি আসক্তি নতুন প্রজন্মকে তাদের পরিবার, আত্মীয়, ব্ন্ধুদের থেকে দূরে নিয়ে যাচ্ছে, সরিয়ে দিচ্ছে সঠিক শিক্ষা ও সুন্দর ক্যারিয়ার থেকে। নিজেকে ও সন্তানকে প্রযুক্তিতে উন্নত করতে গিয়ে বাংলাদেশের অবস্থাও যেন ইন্টারনেটে আসক্ত উন্নত বিশ্বের তরুণ প্রজন্মের মতো না হয় সে ব্যাপারে আগে থেকেই সতর্ক হওয়া উচিৎ।








