চ্যাম্পিয়ন্স লিগের নকআউট পর্বের ইতিহাস বলছিল, প্রথম লেগে চার গোলে হেরে পরের রাউন্ডে যাওয়ার ইতিহাস নেই। ম্যাচের সময় বলে দিচ্ছিল প্রায় ২০ বছর পর চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শেষ ষোলো থেকে ছিটকে পড়তে যাচ্ছে বার্সেলোনা। প্যারিস সেইন্ট জার্মেইনের উৎসব রাঙাতে ডাগ আউটে খেলোয়াড়রাও প্রস্তুত। একটুপর বার্সাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ন্যু ক্যাম্পে উৎসবে মাতবেন তারা। কিন্তু এটা যে বার্সেলোনা। অসম্ভবকে সম্ভব করার এক নজির গড়ে তাই পিএসজিকে উড়িয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে লুইস এনরিকের দল।
ফুটবল বিধাতা যেন সব রোমাঞ্চ লিখে রাখলেন শেষ দুই মিনিটের জন্য। বুধবার রাতে শেষ ষোলোর দ্বিতীয় লেগে শেষের ম্যাজিকেই পিএসজিকে ৬-১ গোলে উড়িয়েই অসাধ্য সাধন করেছে কাতালানরা।
প্রথম লেগে পিএসজির মাঠে ৪-০ গোলে হেরে আসা বার্সা ন্যু ক্যাম্পে ঘুরে দাঁড়াল। গড়ল ইতিহাস। দুই লেগ মিলিয়ে ৬-৫ গোলে কোয়ার্টারে তারা।
ম্যাচের ৮৮ মিনিটে ফ্রি-কিক পায় বার্সা। নেইমারের নেওয়া ২০ গজ দূর থেকে অসাধারণ কিকটি পিএসজি গোলরক্ষক বুঝে ওঠার আগেই জালে। খেলায় বার্সা তখনও ১ গোলে পিছিয়ে।
৯০ মিনিটে মাঝ মাঠ থেকে মেসির দূরপাল্লার শট ডি-বক্সে নিয়ন্ত্রণে নিতে গিয়ে ফাউলের কবলে পড়েন সুয়ারেজ। রেফারি পেনাল্টির নির্দেশ দেন। পেনাল্টি থেকে গোল করে ৫-৫ ব্যবধানে সমতা নিয়ে আসেন নেইমার।
নির্ধারিত সময়ের পর ৫ মিনিট বাড়তি পায় দু’দল। থমথমে নীরবতা আর উত্তেজনা, পুরো ন্যু ক্যাম্প জুড়ে। ম্যাচের সময় যখন ৯৩ মিনিট ছাড়িয়ে গেছে, বার্সা সমর্থকরা হয়তো আশা ছেড়েই দিয়েছিলেন। যোগ করা সময়ের শেষ রোমাঞ্চ তখনো ছিলই, কেননা আশা ছাড়েননি এনরিকের শিষ্যরা। ৯৫ মিনিটে নেইমারের উঁচু করে বাড়ানো বলে আলতো ছুঁয়ে জাল খুঁজে নেন সার্জিও রবের্তো। এ মৌসুমে এটাই রবের্তোর প্রথম গোল। উৎসবে ফেটে পড়ে পুরো ন্যু ক্যাম্প, বার্সার খেলোয়াড়-সমর্থকরা।
শেষ দুই মিনিটের গল্প যেন কিছুতেই ভাবতে পারছিলেন না পিএসজির খেলোয়াড়রা। কান্না ভেজা চোখ নিয়েই তাদের বিদায় নিতে হলো চ্যাম্পিয়ন্স লিগ থেকে।
ম্যাচের শুরুটাও ছিল বার্সাময়। মাত্র তৃতীয় মিনিটেই সুয়ারেজের গোলে এগিয়ে যায় বার্সেলোনা। পিএসজির ডি-বক্সে রাফিনহার ডান প্রান্ত দিয়ে ক্রসে পাওয়া বলে দারুণ হেডে জালে বল পাঠান উরুগুয়ে তারকা। গোললাইন অতিক্রম করার পর বল পিএসজি ডিফেন্ডার ঠেকিয়ে দিলেও রেফারি গোলের সিদ্ধান্ত দেন।
তিন মিনিটে এগিয়ে গিয়ে চাঙ্গাভাব চলে আসে মেসি-সুয়ারেজদের। ম্যাচের ১৫ মিনিটে ফ্রি-কিক পায় বার্সা। মেসির করা কিকটি অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। এর দুই মিনিট পরেই নেইমারের রকেট গতির একটি শট ইঞ্চিখানেক ব্যবধানের জন্য জাল খুঁজে পায়নি।
ম্যাচের ২৮ মিনিটে ইনিয়েস্তার দারুণ একটি শট জাল খুঁজে নিতে ব্যর্থ হয়। ম্যাচের ৪০ মিনিটে দ্বিতীয়বারের মতো এগিয়ে যায় বার্সেলোনা। ডি-বক্সে জটলা থেকে বল নিয়ে ইনিয়েস্তা গোল মুখে এগিয়ে গিয়ে আলতো করে ব্যাকহিল করেন, সেটি পিএসজির ডিফেন্ডার লেভিন কুরজাওয়ার পায়ে লেগে জালে জড়ায়।
প্রথমার্ধে ২-০ গোলে এগিয়ে থেকে মাঠ ছাড়ে বার্সা। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে ৩-০ গোলে এগিয়ে যায় এনরিকের শিষ্যরা। ম্যাচের ৪৮ মিনিটে ইনিয়েস্তার ফ্লিক থেকে বল পেয়ে নেইমার এগিয়ে যান, তবে ডি-বক্সে তাকে ফাউল করে পিএসজি। রেফারি প্রথম পর্যায়ে ফাউল নাকোচ করে দিলেও সহকারী লাইন্সম্যানের সঙ্গে কথা বলে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দেন। পেনাল্টি থেকে গোল করেন লিওনেল মেসি।
ঘরের মাঠে ৩-০ গোলে এগিয়ে গিয়ে বার্সা যেন প্রাণ ফিরে পায়। একের পর এক আক্রমণে পিএসজির ডিফেন্স ভেঙ্গে দিতে থাকে। তখনই পাল্টা আক্রমণ থেকে ৬২ মিনিটে কাভানির দুর্দান্ত গোলে ব্যবধান ৩-১ এ নিয়ে আসে পিএসজি। এই গোলে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলার স্বপ্নে মাতোয়ারা হয় তারা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বার্সেলোনার অসাধারণ সৌন্দর্যময় ফুটবলের কাছে হার মানতে হয়েছে।
তবে পিএসজি আফসোস থাকতেই পারে, ৬৪ মিনিটে কাভানির অসাধারণ শট ফিরিয়ে দেন টের স্টেগেন। আর সবচেয়ে বড় কষ্ট ঘরের মাঠে দুই গোল করা ডি মারিয়ার ম্যাচের ৮৫ মিনিটে সহজ সুযোগটা হাতছাড়া করা।
রাতের অন্য ম্যাচে পর্তুগালের দল বেনফিকাকে ৪-০ গোলে উড়িয়ে কোয়ার্টার-ফাইনালে উঠেছে জার্মানির বরুসিয়া ডর্টমুন্ড। দুই লেগ মিলিয়ে তাদের জয় ৪-১ গোলে। প্রথম লেগে ঘরের মাঠে ১-০ গোলে জিতেছিল বেনফিকা।







