ছোটবেলা থেকেই কারো বিপদ দেখলে দৌড়ে যেতেন শেখ মোস্তাফিজুর রহমান। রোববার সকালে চোখের সামনে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা দেখে দৌড়ে যান। পথচারীকে পাশ কাটাতে গিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে থেকে ছিটকে পড়ে মোটরসাইকেল আর তার চালক।
মোস্তাফিজুর রহমান দেখেন চালকের মাথা ফেটে রক্ত পড়ছে। স্থানীয়দের সহযোগীতায় দ্রুত হাসপাতালে পাঠান মোটরসাইকেল চালককে। ঘটনাস্থলে পাওয়া যায় একটি কালো ব্যাগ। মোস্তাফিজুর রহমান উপস্থিত সবার সামনে ব্যাগ খোলেন। ব্যাগে পাওয়া যায় অনেকগুলো টাকা। অক্ষত ব্যাগসহ টাকাগুলো রেখে দেনে নিজের কাছে।
আহত ব্যক্তির পরিচয় জানার পর মোস্তাফিজুর বলেন, ‘টাকাগুলো আমার কাছে আছে। চিন্তা করবেন না।’ মোটরসাইকেল চালক সুবল চন্দ্র রায় তার অফিসকে যোগাযোগ করতে বলেন মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে। সবার উপস্থিতিতে টাকা গোনা হয়। তিন লাখ ৪৫ হাজার টাকা। এক টাকাও এদিক সেদিক হয়নি।
ঘটনা ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ থানায়। কালীগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স কার্যালয়ের কাছে। মোস্তাফিজুর রহমান ফায়ার সার্ভিসের ড্রাইভার। তার বাড়ি একই থানার হাটবার বাজার পোস্ট অফিসের বেলাট দৌলতপুর গ্রামে।
আহত সুবল চন্দ্র রায় গ্রিনল্যান্ড নামে একটি ট্রাক্টর কোম্পানিতে চাকরি করেন। তার ব্যাগে ছিল অফিসের তিন লাখ ৪৫ হাজার টাকা। ব্যাংক বন্ধ থাকায় জেলা অফিসে জমা দিতে যাচ্ছিলেন।

ঘটনার এমন বর্ণনা দিয়ে মোস্তাফিজুর রহমান চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘আমি ১৯৯৪ সাল থেকে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সে ড্রাইভার পদে চাকরি করছি। কালীগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের কার্যালয়ের পাশেই ঘটনা ঘটে। সুবল চন্দ্র রায়ের অফিসের ম্যানেজার সাইদুর রহমান এলে সুবল চন্দ্রের সঙ্গে কথা বলে টাকা বুঝে দিয়েছি।’
ছোটবেলা থেকেই কুড়িয়ে পাওয়া টাকা পয়সা উপযুক্ত মালিকের কাছে ফিরিয়ে দিতেন জানিয়ে বলেন, ‘ছোটবেলায় গরু ব্যবসায়ীর অনেকগুলো টাকার বাণ্ডিল পেয়েছিলাম। অনেক খুঁজে খুঁজে টাকার প্রকৃত মালিক বের করে টাকাগুলো বুঝিয়ে দেই। এছাড়া ছোটখাটো যে কোনো কিছু খুঁজে পেলেই সেটা মালিকের কাছে ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করতাম।’
সততাই প্রতিটি মানুষের আসল পরিচয় জানিয়ে তিনি বলেন, প্রত্যেক মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার সততা। সততা ছাড়া মানুষ হয় কী করে? আমার কাছে যদি আরেকজনের সম্পদ নিরাপদ না থাকে তাহলে অন্যের কাছে আমার সম্পদ নিরাপদ হবে কী করে? এছাড়া আমি যে ফায়ার সার্ভিসে চাকরি করি, এটাও বিশ্বস্ততার চাকরি। সেটা প্রমাণ করতে পেরেছি হয়তো।’
মোস্তাফিজুরের সততার ঘটনা এলাকায় জানাজানি হলে বন্ধু, সহকর্মীরা তাকে অভিনন্দন জানান। এলাকার মুরুব্বীরা মোস্তাফিজুর রহমানকে নিয়ে গর্বিত বলে জানান।
এছাড়াও আহত সুবল চন্দ্রের অফিস থেকে মোস্তাফিজুর রহমানকে ফুল দিয়ে অভিনন্দন জানানো হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সকে দিয়েছেন প্রশংসা পত্র।

মোস্তাফিজুর রহমানের বড় ছেলে অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ছে। ছোট ছেলে পড়ে হাফেজিয়া মাদ্রাসায়। গ্রিনল্যান্ড কোম্পানির পক্ষ থেকে সততার পুরস্কার হিসেবে মোস্তাফিজুর রহমানের এক ছেলের পড়াশুনার খরচ চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান গ্রিনল্যান্ড ট্র্যাক্টর কোম্পানির সার্ভিস ইঞ্জিনিয়ার।
দেশের মানুষের উদ্দেশ্যে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘যার যার কর্ম ঠিকভাবে যেন সবাই পালন করে। নিজের মতো করে সবাই সবার উপকারে আসলে আমাদের দেশ, সমাজ ও পৃথিবী সুন্দর হবে।’








