একইসঙ্গে বইমেলা বসে। আগপিছ বলে কিছু নেই। প্রকাশকরা মাঠের বরাদ্দ ও নকশা পেয়েই নির্ধারিত জায়গায় তাদের স্টল বানিয়ে ফেলেন। ডিজিটাল পিভিসি প্রিন্ট, কাঠ বোর্ড আর এলইডি লাইট নিয়ে ইচ্ছেমতো খেলার যুগে যেকোনো স্থাপনাই বানিয়ে ফেলা যায় সামান্য সময়ে। এসব নির্মাণেও স্থাপনা শৈলীর শৌকর্য রয়েছে।
বড় বড় প্রকাশনীর স্টল একেকটি সুপরিকল্পিত স্থাপনা। প্রকাশকরা এখন আগেভাগেই ভেবে নেন, তাদের এবারের ‘থিম’ কী হবে? ভেবে নেন, স্টলে কোন রঙের প্রাধান্য থাকবে। যারা কাঠ, বাঁশ আর পিভিসি নকশার কাজ করেন, তাদের কাছে ডিজাইন আর থিম ধরিয়ে দিলে কাজ হয়ে যায় চোখের পলকে।
বইমেলায় মুজিব বর্ষের একটি স্টল আছে। সাদাকালোর অসাধারণ ব্যবহার স্টলটিতে। ভেতরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিভিন্ন বয়সের ‘কাটআউট’ আছে। সন্ধ্যায় যখন পরিকল্পিত আলো ছায়া জায়গামতো স্থাপিত হয়ে যায়, তখন দূর থেকে স্টলের দিকে তাকালে চমকে উঠতে হয়। একেবারে জীবন্ত দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু। এর আগে একটি অন্যপ্রকাশ ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর বাড়ির আদলে স্টল করেছিল। ৩২ নম্বরের বারান্দায় বঙ্গবন্ধু দাঁড়িয়েছিলেন।
এবারও অন্যপ্রকাশ এর স্টলের আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে। রাতের আলোআঁধারির মধ্যে স্টলে কয়েকশত মানুষের ভীড়। ওপরে গম্ভীর দাঁড়িয়ে হুমায়ূন আহমেদ। মাথায় ক্যাপ পরে। স্বভাবসুলভ নিরব ভঙ্গিমায় তাকে দেখে মন ভালো হয়ে যায়। বইমেলায় গিয়ে দিনের বেলায় হাঁটতে থাকলে স্টলগুলোর বৈচিত্র খুব বেশি চোখে না পড়লেও রাতের বৈচিত্র চোখ এড়াতে পারবে না। বিশেষ করে এলইডি আলোর যুগে সারা পৃথিবীতেই নির্মাণ ও স্থাপনাশিল্পে এক নতুন ধারা সূচিত হয়ে গেছে। বইমেলারি বিভিন্ন জায়গায় সুপরিকল্পিত স্পট লাইটে দাঁড়িয়ে কিশোর তরুণরা ‘সেলফি’ তুলছে। আলোর ব্যবস্থাটি পরিকল্পিতভাবেই করা হয়েছে।
যে কথাটি বলার জন্য এত কথা বলছি, বইমেলার বিশাল আলো ঝলমল আয়োজনের ভেতর ছন্দপতন হচ্ছে ‘লিটলম্যাগ চত্বর’। কোনোরকম দারিদ্রপূর্ণ অবকাঠামোর সঙ্গে একটি জায়গা বরাদ্দ করা হয়েছে। এখনও ওই বরাদ্দ জায়গায় অনেক ‘লিটলম্যাগ’ তাদের নামফলক পর্যন্ত স্থাপন করেনি। মেলার আগে তারা যোগাযোগ করেছে বটে, কিন্তু এখনও তারা আসেনি। জমে ওঠেনি লিটলম্যাগ চত্বর।
অন্যান্যবার ‘লিটল ম্যাগ’ চত্বরে যেমন সরগরম পরিবেশ দেখা যায়, এবার তেমনটিও নেই। এখানে আলো ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত। ‘লিটলম্যাগ’ বিষয়টির প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক এই একচক্ষু কিংবা চক্ষুহীন মনোভাব অত্যন্ত স্বাভাবিক। কিন্তু সাহিত্য সংস্কৃতির শুদ্ধ, সমৃদ্ধ ও শক্তির জায়গাটিকে এমন গৌণ করে রাখলে তা বইমেলাকেই ম্লান করে দেয়। আমি মনে করি, লিটলম্যাগ চত্বরটি বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকেই অসাধারণ শিল্প সুষমায় সাজানো উচিৎ।
যারা অসাধারণ জীবনবোধ আর মাটির গন্ধ বুকে নিয়ে লিটলম্যাগ চর্চা করেন, এই একমাস তাদের জন্য বইমেলা মাঠে থাকা উচিৎ বিশেষ সুযোগ সুবিধা। লিটল ম্যাগ চত্বরে থাকা উচিৎ বিশেষ মঞ্চ। সেখানে অবিরাম চলবে মৌলিক কবিতা পাঠ। লিটলম্যাগ চত্বরের চারদিকে বড় বড় ছবির ফলক থাকা উচিৎ। সেখানে থাকবে বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ লিটলম্যাগাজিন গুলোর প্রচ্ছদের ছবি। সম্পাদকের ছবি। লিটলম্যাগের ইতিহাস ও ক্রমবিবর্তনের সচিত্র প্রদর্শনও থাকা উচিৎ। প্রতি বইমেলায় নতুন লিটলম্যাগ সম্পাদকের জন্য পুরস্কার থাকা উচিৎ। লেখকের জন্য থাকা উচিৎ বিশেষ সম্মানী।
লিটলম্যাগ চত্বরে বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক কিছু সাময়িকপত্রকে জায়গা দেয়া হয়। জায়গাটিকে এজমালি করে তোলা হয়। আমি বলবো, এটি খুবই অবিবেচনাপ্রসুত কাজ। এখনও শুদ্ধ লিটল ম্যাগাজিন চর্চা হয়। সেসব লিটলম্যাগকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা উচিৎ। ‘লিটল ম্যাগ’ চত্বরে এসে কাছে এসে বাংলা সাহিত্যের সমকালীন গতিবিধি, প্রবণতা, ভাব, ভাষা সম্পর্কে সাধারণ পাঠক ও নতুন প্রজন্ম যাতে জানতে পারে, সে ব্যবস্থাটি ফুটিয়ে তোলার জন্য থাকা উচিৎ বিশেষ ব্যবস্থা। তাহলে বইমেলা পাবে এক সর্বজনীন মাত্রা।








