অন্তর্বতীকালীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের নানা বিষয়ে জটিলতার সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে অন্যতম একটি আলোচনার বিষয় ছিল বাংলাদেশ দলের ভারতে হওয়া টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ না করা। মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেয়াকে কেন্দ্র করে অসন্তোষ সৃষ্টি হওয়া, তারপর এমন সিদ্ধান্ত। নিজের দেশে ফিরতে না পারা, জাতীয় দলের হয়ে বিদায়ী ম্যাচ বাংলাদেশে খেলতে না পারা এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন বাংলাদেশের বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। ভারতের একটি সংবাদম মাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে নিজের মনের দুয়ার খুলে দিয়েছেন তিনি। তার সাক্ষাৎকারের চুম্বকাংশ তুলে ধরা হয়েছে এ প্রতিবেদনে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের পর রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়। তার থেকে দেশের বাইরে সাকিব, জানিয়েছেন তাড়াতাড়ি দেশে ফিরতে চান। এ বিষয়ে সাকিব বলেছেন, ‘এ বছরের শেষদিকে দেশে ফেরার আশা করছি। অবস্থা যেকোনো সময় পরিবর্তন হতে পারে। আমরা কেউ জানি না আগামীকাল কী হতে পারে, সে কারণেই আবারও বাংলাদেশের হয়ে খেলার ব্যাপারে আমি আশাবাদী।’
জাতীয় দলে ফেরা নিয়ে সাকিবের মনোভাব, ‘বাংলাদেশ দলে ফেরার বিষয়টি আমার হাতে নেই। কিন্তু আমি এটার সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি।’
মোস্তাফিজের আলোচিত ইস্যু নিয়ে এ তারকা অলরাউন্ডার বলেন, ‘আইপিএল বিসিসিআই পরিচালিত ঘরোয়া আসর। তারা কাকে নেবে, কে বাদ যাবে তাদের সিদ্ধান্ত। তা সত্ত্বেও মোস্তাফিজের বিষয়টি আরও ভালোভাবে সামলানো যেত, বিশেষত বিসিবি ও ফ্র্যাঞ্চাইজির মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে।’
মোস্তাফিজের মত নিজেও এমন ঘটনার শিকার হয়েছিলেন জানিয়ে সাকিব বলেছেন, ‘মোস্তাফিজের ঘটনার মতো আইপিএলে আমিও একবার সম্মুখীন হয়েছিলাম। পুরো মৌসুম সময় দিতে পারব না বলে ফ্র্যাঞ্চাইজির সঙ্গে আলোচনা করলাম। বোঝাপড়ার মাধ্যমে তারা আমাকে ক্ষতিপূরণ দিয়েছিল।’

আইসিসিতে যাওয়া প্রসঙ্গে নিয়ে ৩৯ বর্ষী তারকা বলেন, ‘একটি ঘটনার জন্য সবকিছু ভেস্তে যাওয়া ঠিক নয়। বিসিবি ও বিসিসিআইয়ের মধ্যে কোন সমস্যা থাকলে অভ্যন্তরীণভাবে সমাধান করা উচিত ছিল। আইসিসির সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করার মতো পর্যায়ে বিষয়টিকে নিয়ে যাওয়া ঠিক হয়নি। আমার মতে, এটি গুরুতর ভুল পদক্ষেপ ছিল।’
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে দায়ী করে সাকিব বলেন, ‘ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিরা জনমতকে পুঁজি করে সেটিকে আরও উস্কে দিয়েছেন এবং শেষপর্যন্ত যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা খেলার স্বার্থের পরিপন্থী। এটি (বিশ্বকাপে না খেলা) একটি সুস্পষ্ট ভুল ছিল। বিসিবি তাদের বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরিচালনাকারীদেরও এর দায় রয়েছে।’
‘সেই (বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়া) সময়কালে দেশের বৃহত্তর মঙ্গলের জন্য তেমন কিছুই করা হয়নি। হয়তো কিছু প্রচেষ্টা ছিল, হয়তো কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপও। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে বাস্তব প্রভাব দেখতে পাইনি।’
বিসিবি-বিসিসিআইয়ে সম্পর্ক নিয়ে বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক বলেন, ‘আমি যা শুনেছি, বিসিসিআই ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছিল। এটি খুবই দুর্ভাগ্যজনক। যদি সত্যিই সেটা হয়ে থাকে, তাহলে উভয় পক্ষেরই ত্রুটি ছিল।’

নিজের রাজনীতিতে আসা প্রসঙ্গে সাকিব বলেন, ‘পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয় অবসরের পর রাজনীতিতে আসা ভালো ছিল। সেটাই আদর্শ পরিস্থিতি হতে পারতো। ২০২৩ ডিসেম্বরে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিলাম, তখনই ঠিক করেছিলাম ২০২৫ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি আমার শেষ। সেই অর্থে এটিকে দেখেছি অবসরের পরবর্তী পরিকল্পনা হিসেবে। সে কারণে আমার মনে হয় সেটা সঠিক সময় ছিল।’
‘সমাজে বিভিন্ন স্তরের মানুষ তাদের কাজের মাধ্যমে রাজনীতিতে প্রভাব ফেলার চেষ্টা করেন। যেমন একজন ডাক্তার, অন্যরাও বিভিন্ন উপায়ে সংযোগ স্থাপন করেন। আমি ক্রিকেট ক্যারিয়ার ও জনপ্রিয়তা কাজে লাগিয়েছি, এটি ভুল ছিল না। তবে অবশ্যই মানুষের ভিন্নভাবে দেখার অধিকার আছে।’
রাজনীতি করার সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে সাকিব, ‘সবসময়ই অনুভব করেছি, যখন ভালো মানুষেরা রাজনীতি থেকে দূরে থাকেন, খারাপ ধরনের লোকদের আসার সুযোগ তৈরি হয়। ওই (নির্বাচনের) সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে, বিষয়টি আন্তরিকভাবে ভেবেছিলাম। চাইলেই যেকেউ রাজনীতিতে আসতে পারে। আসার পর দেখলাম বিষয়টি এত সহজ নয়। কিন্তু আমি দেশের জন্য অবদান রাখতে চেয়েছি।’

আন্দোলনের পর আক্রান্ত হওয়া প্রসঙ্গে, ‘জুলাই-আগস্টের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতি আমার জন্য কঠিন ছিল। সত্যি বলতে, আমার বাড়ি-ঘর আক্রান্ত হওয়ার পর জানতাম না কী প্রতিক্রিয়া দিবো। পুরো স্তম্ভিত ছিলাম। এমন পরিস্থিতিতে কখনও পড়িনি, সবকিছু আমার চিন্তার বাইরে ছিল।’
‘কানাডাতেও একটি ঘটনা ছিল, কিছু দর্শক প্রশ্ন তুলেছিলেন বাংলাদেশের জন্য কী করেছি। প্রায় দুই দশক দেশের প্রতিনিধিত্ব করার পর ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না এর কী জবাব দেব। এখন পেছন ফিরে তাকালে মনে হয় ওগুলো ছিল সাজানো প্রতিবাদ।’

দেশে আসতেও নিষেধ করা হয়েছিল সাকিবকে। এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘আমাকে বলা হয়েছিল দেশে না আসতে, বিদেশে খেলার জন্য। তার আগে পাকিস্তান-ভারতে সিরিজ খেললাম। পরিস্থিতি সহজ ছিল না। অবস্থা যে আদর্শ ছিল না তা স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিল।’
নিজের বিদায়ী ম্যাচ নিয়ে তিনি বলেন, ‘এমন পরিস্থিতিতে পড়তে চাই না, যেখানে শুধু একটি বিদায়ী ম্যাচের জন্য দলের বোঝা হয়ে দাঁড়াব। যতদিন অনুভব করব অবদান রাখছি, খেলা চালিয়ে যেতে চাইব। বিশ্বাস করি এখনও সেই সামর্থ্য আছে।’
‘যদি একজন বিসিবি সভাপতি তার মেয়াদ সম্পর্কে না জানেন, তার জন্য দীর্ঘমেয়াদী সিদ্ধান্ত নেয়া ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়। এই অনিশ্চয়তা খেলোয়াড়দের উপরও প্রভাব ফেলে।’
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ফাঁকা বুলি নিয়ে সাকিব বলেন, ‘আগের বোর্ড আমাকে ফেরানোর ব্যাপারে ইচ্ছাপোষণ করেছিল। কিন্তু বলা ও সেই কাজ করার মধ্যে বিরাট ফারাক রয়েছে। এখন শুনছি সবাই আমাকে ফেরানোর ব্যাপারে কথা বলছে। কিন্তু বাস্তবতা হল কেউ এ ব্যাপারে কোন পদক্ষেপই নেয়নি।’

অবসরের পর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে সাকিব, ‘‘অবসরের পর কোচিং তো আছেই, তবে এ ব্যাপারে এখনও মনস্থির করিনি। সত্যি বলতে, অবসরের পর ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত থাকার তেমন কোন ইচ্ছা আমার নেই। যদি হয়ও, তাহলে কোচিং অথবা ম্যাচ রেফারি। না হলে ব্যবসা, আর অবশ্যই রাজনীতি তো আছেই।’
‘আমি ইতিমধ্যেই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এখন হাতে আরও বেশি সময় থাকায় এটিকে পূর্ণকালীন পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে চাই। অবসরের পর ক্রিকেট প্রশাসক হিসেবে যুক্ত হওয়ার ইচ্ছা নেই। আগেই বলেছি, ভাগ্য যেকোনো জায়গায় নিয়ে যেতে পারে। তবে আমার পরিকল্পনায় এটি নেই।’








