গ্রামে গ্রামে ঘুরে ছোট বড় সবার দোরগোড়ায় বই পৌঁছে দিতেন পলান সরকার। পলান সরকার আর বই বিলি করবেন না। আজ তিনি বার্ধক্যজনিত রোগে ইন্তেকাল করেন। তাঁর ছয় ছেলে ও তিন মেয়ে। শনিবার হারুনুর রশিদ শাহ দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয় মাঠে পলান সরকারের জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।
নিজের টাকায় বই কিনে পাঠকের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিয়ে বই পড়ার একটি আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য পলান সরকার ২০১১ সালে একুশে পদক পান। ২০০৭ সালে সরকার তার বাড়ির আঙিনায় একটি পাঠাগার করে নির্মাণ করে দেয়। তাকে নিয়ে ‘সায়াহ্নে সূর্যোদয়’ নামে শিমুল সরকার একটি নাটক নির্মাণ করেছেন। চ্যানেল আই তা প্রচার করেছিল।
পলান সরকারের জন্ম ১৯২১ সালে। তাঁর আসল নাম হারেজ উদ্দিন। তবে পলান সরকার নামেই তাঁকে চেনে দশ গ্রামের মানুষ। জন্মের মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় তাঁর বাবা মারা যান। টাকাপয়সার টানাটানির কারণে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময়ই পড়াশোনায় ইতি টানতে হয় তাঁকে। তবে নিজের চেষ্টাতেই চালিয়ে যান পড়ালেখা। স্থানীয় একটি উচ্চবিদ্যালয়ের পরিচালনা পরিষদের সভাপতি ছিলেন পলান সরকার। তিনি ছিলেন বই পাগল মানুষ। প্রতিবছর স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে যারা ১ থেকে ১০-এর মধ্যে মেধাতালিকায় স্থান পাবে, তাদের তিনি একটি করে বই উপহার দিতেন। এখান থেকেই শুরু হয় তাঁর বই বিলির অভিযান। তারপর পায়ে হেঁটে হেঁটে তিনি বই বিতরণ করতেন শিক্ষার্থীদের দ্বারে দ্বারে। এই এক অসাধারণ কর্তব্যবোধ বা মানবিক গুণ বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল। একটানা ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে করেছেন এই কাজ। রাজশাহী অঞ্চলের বেশ কয়েকটি গ্রামে তিনি গড়ে তুলেছেন বই পড়ার এক অভিনব আন্দোলন।
তিনি এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন: আমি হাঁটতে হাঁটতে এই সমাজটাকে বদলানোর আন্দোলনে নেমেছি। যত দিন আমি হাঁটতে পারি, তত দিন আমার আন্দোলন চলবে। আমি হাঁটতে হাঁটতে মানুষের বাড়িতে বই পৌঁছে দেবই। যাঁরা পাঠাগারে আসবেন, তাঁরা ইচ্ছেমতো বই পড়বেন। তবে আমার বয়স হয়েছে। জানি না আর কত দিন হাঁটতে পারব। যেদিন আমার পথচলা থেমে যাবে, সেদিন এই পাঠাগার আমার পক্ষে আন্দোলন করে যাবে। তার হাঁটা থেমে গেছে আজ। এখন তার হাতে গড়া পাঠাগারই হবে তার স্বপ্নের চাওয়া পূরণের একমাত্র আধেয়।
পলান সরকার শুধু একটি নাম নয়। পলান সরকার একটি মানবিক সমাজ নির্মাণের আন্দোলন। আমরা যারা তাকে একজন আদর্শ পথপ্রদর্শক মনে করি বই পড়ার আন্দোলনে তারা চাই তার স্বপ্নের পথ ধরে যেনো এগিয়ে যায় আমাদের সমাজ। বিদ্যমান সমাজে এই নিঃস্বার্থ এরকম মহান মানুষের সংখ্যা অতি নগন্য। আমরা চাই তার স্মৃতি রক্ষার্থে যেনো তার বই পড়ানোর কর্মসূচি বন্ধ না হয়। তার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।









