রাজধানী ঢাকায় যে কয়েকটি হাসপাতাল বা হাসপাতালের ইউনিটকে কোভিড ডেডিকেটেড ঘোষণা করে তাতে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছিল, সেসব হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউ শয্যার সংকটে পড়েছে। এ নিয়ে চ্যানেল আই অনলাইনের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষের দাবি, বাইরে থেকে রোগী আসতে থাকায় এই চাপ বেড়ে চলেছে। আবার যেসব রোগী আসছেন, তাদের অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৯০ এর নিচে। তিন থেকে পাঁচ দিনের মধ্যেই ওইসব রোগীর ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যে কারণে দ্রুত অক্সিজেন প্রয়োজন হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে উপায়হীন স্বজনরা বাধ্য হয়ে রাজধানীর বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ শয্যার জন্য ছুটছেন। ওই প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে; শুধুমাত্র আজকে (রোববার) সকাল সাড়ে নয়টা থেকে পৌনে এগারোটা পর্যন্ত সোয়া ১ ঘণ্টাতেই তিনজন রোগী আইসিইউয়ের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ফিরে গেছেন অন্য হাসপাতালে। কিন্তু খবর নিয়ে জানা গেছে, বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও আইসিইউ শয্যা সীমিত হয়ে আসছে। তাছাড়া খুব বেশি সংখ্যক মানুষের পক্ষে এর খরচ যোগান দেওয়াও সম্ভব না।
শুধু আইসিইউ শয্যার সংকট নয়, সংকট তৈরি হয়েছে অক্সিজেন নিয়েও। এরই মধ্যে সাতক্ষীরা, বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন জেলা হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেন সংকটে বেশ কয়েকজন রোগীর মৃত্যু হয়েছে অভিযোগ উঠেছে। মৃত ব্যক্তিদের স্বজনরা সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ করছেন, অক্সিজেনের অভাবেই মৃত্যু হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে এ নিয়ে স্পষ্ট করে কিছু না বলা হলেও তদন্ত কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি আমরা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখেছি, বগুড়ার কোভিড ডেডিকেটেড সরকারি মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত মাত্র ১৩ ঘণ্টায় করোনা আক্রান্ত সাতজন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলা সংকটের কারণে পর্যাপ্ত অক্সিজেন না পেয়ে তাদের মৃত্যু হয়েছে। যদিও বিষয়টি মানতে চায়নি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তাদের দাবি জেলা হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলা সরবরাহ করা হয়েছে। তবে এ নিয়ে জেলা হাসপাতালগুলোর যে তথ্য গণমাধ্যমে এসেছে, তাতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কথার সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি।
তার মানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া কাগজে-কলমের তথ্যের সঙ্গে বাস্তবের তথ্যের বিরাট ফারাক দেখা যাচ্ছে। একই চিত্র আইসিইউ শয্যা নিয়েও। আগেও একাধিকার দেখা গেছে, সরকার আইসিইউ শয্যার সংখ্যা নিয়ে যে তথ্য সরবরাহ করেছে, বাস্তবের সঙ্গে তার মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি। করোনাভাইরাসের শুরু থেকেই একটা ‘লুকোচুরি খেলা’ দেখছি আমরা। অথচ এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। এই মহামারির সময়ে চিকিৎসাসেবা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেলেও সমাধানের চেষ্টা আমরা খুব কম ক্ষেত্রেই দেখেছি।
কয়েকদিন আগে ভারত যখন করোনার নতুন ধরনে বিধ্বস্ত। অক্সিজেন, আইসিইউ না পেয়ে হাজারে হাজারে মানুষ মরছিল, তখন বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বারবার সরকারকে সতর্ক করে দিয়েছিল। করোনার নতুন ধরন থেকে রক্ষা পেতে তারা দ্রুত প্রস্তুতি নিতে বলেছিলেন। কিন্তু তখন তাদের কথা পাত্তা দেওয়া হয়নি। এখন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে ডেলটা ভ্যারিয়েন্ট।
এখন দেখা যাচ্ছে, ডেলটা ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে সেই অর্থে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কোনো প্রস্তুতিই ছিল না। এমন কি ঢাকার বাইর ব্যাপক সংক্রমণ দেখা গেলেও সেখানকার হাসপাতালগুলোতেও বাড়তি কোনো প্রস্তুতির কথা জানা যাচ্ছে না। জাতীয় সংসদে এসব নিয়ে কথা উঠেছে। এমন ব্যর্থতার জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিও উঠেছে।
আমরা মনে করি, প্রতিদিনই যেভাবে সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়ছে তাতে সামনের দিনগুলোতে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়তে যাচ্ছে দেশ। সেটা মাথায় রেখে যতটা দ্রুত সম্ভব অক্সিজেন ও আইসিইউ শয্যা প্রস্তুত রাখতে হবে। না হলে ভারতের মতো পরিস্থিতির মুখে পড়তে হবে আমাদেরও।







