প্রত্যেক বছরের শেষেই সেই বছরটিকে ‘ঘটনাবহুল’ বলে আখ্যা দেয়া হয়। কিন্তু ২০১৭ সালের মতো এত বেশি বড় বড় ঘটনা মনে হয় না সাম্প্রতিক কোন বছরে একসঙ্গে ঘটেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, ২০১৭ ছিল বহু রাষ্ট্রের, বহু জনগোষ্ঠীর জন্য জীবনের মোড় ঘোরার মতো একটি বছর। এর সঙ্গে রয়েছে ঘূর্ণিঝড় ও ভূমিকম্পসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রকোপ আর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার প্রতিক্রিয়া।
ট্রাম্প দিয়ে বর্ষবরণ
প্রাকৃতিক থেকে শুরু করে মানবসৃষ্ট দুর্যোগময় ছিল ২০১৭, যা শুরু হয়েছে আলোচিত-সমালোচিত ডোনাল্ড ট্রাম্পের মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের মধ্য দিয়ে। জনমতের মাধ্যমে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হওয়াকেও একটা দুর্যোগই মনে করছেন বহু বিশ্লেষক।
ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের পরই বিশ্ব দেখতে থাকে তার কাণ্ড। প্রথমেই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল তোলার পরিকল্পনা। এরপর সবার জন্য জরুরি প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে সরে আসেন তিনি। এর ফলে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা প্রচেষ্টায় প্রাথমিকভাবে জটিলতা শুরু। ইউনেস্কো থেকেও সরে আসে যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্রে ৬টি মুসলিম দেশসহ ৮টি দেশের নাগরিকের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা প্রস্তাব করেও ব্যাপক সমালোচিত হন ট্রাম্প। এর পক্ষে-বিপক্ষে আইনি লড়াই চলার পর চলতি মাসে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট এতে অনুমোদন দিয়েছেন।
দেশটিতে অভিবাসী প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ এবং নারী অবমাননাকর কথা বলায়ও ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আশেকা ইরশাদ এ ব্যাপারে চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: নির্বাচনী প্রচারণার সময়ই ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হলে ভয়াবহ পরিস্থিতি হবে ধারণা করা হচ্ছিল। প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর এ পর্যন্ত তিনি সেই আশঙ্কাকে অনেকটাই সত্যি করে দেখিয়েছেন। একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে যে আচার-আচরণ, ভাষার ব্যবহার, নীতিনির্ধারণ আশা করা হয়, সবকিছুতেই তিনি লক্ষ্যণীয় পরিবর্তন এনেছেন, যেখানে তার নিজস্ব ব্যক্তিত্বের ছাপটাই বেশি। নিজস্ব চিন্তাধারা বাস্তবায়নে তিনি প্যারিস চুক্তিসহ বহু আমেরিকান প্রতিশ্রুতি ভেঙেছেন। ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডে বছরব্যাপী যে অদূরদর্শিতা এবং উগ্রতা দেখা গেছে, তা আগামী বছরও খুব ভালো ফল বয়ে আনবে না। বিশেষত জলবায়ু ইস্যু ২০১৮-র আলোচিত ইস্যুর একটি হবে বলে তার ধারণা।
মার্কিন নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ
সমালোচিত নির্বাচনী প্রচারণার ধারাবাহিকতায় ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ওঠে নতুন এক অভিযোগ: নির্বাচনে তার পক্ষে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ। ট্রাম্প এবং রুশ সরকার এ অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে এসেছে। তদন্ত বন্ধে বরখাস্ত হলেন এফবিআই প্রধান জেমস কোমি; ট্রাম্পের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইকেল ফ্লিনও তদন্তের ফাঁদে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করেন এবং এক পর্যায়ে ক্রেমলিনের সঙ্গে যোগাযোগের কথা স্বীকারও করেন। ট্রাম্প ফ্লিনের পক্ষে সাফাই গাইলেও তদন্ত বন্ধের চাপ দেয়ার কথা পুরোপুরি অস্বীকার করেন।
রুশ–মার্কিন সম্পর্কে দুর্যোগের ঘনঘটা
নির্বাচনী প্রচারণার সময় থেকেই আলোচনায় ছিল রুশ-মার্কিন দহরম-মহরম সম্পর্ক। কিন্তু বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত শহরে রাসায়নিক হামলার জবাবে সিরীয় বিমানঘাঁটিতে এপ্রিলে অর্ধশতাধিক টম্যাহক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ফলে সেই সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়। এরপরই যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার জবাবে রাশিয়া থেকে ৭৫৫ মার্কিন কূটনীতিক বহিস্কৃত হন। আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে একসঙ্গে এত বেশি কূটনীতিক বহিস্কারের ঘটনা এই প্রথম।
নর্থ কোরিয়ার দাপট, যুক্তরাষ্ট্রের অনিচ্ছা-স্বীকৃতি
২০১৬’র ধারাবাহিকতায় এ বছরের প্রথম থেকেই নর্থ কোরিয়া পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা শুরু করে। ৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবসে প্রথম আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালানোর জবাবে পরদিনই সাউথ কোরিয়া-যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মহড়া থেকেও চালানো হয় ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা। অন্যদিকে নর্থকে পারমাণবিক কার্যক্রম বন্ধের আহ্বান জানায় রাশিয়া ও চীন। এর একমাস পর নর্থ কোরিয়ার বিরুদ্ধে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে আরেকটি নিষেধাজ্ঞা পাস হয়। কিন্তু কোনোকিছুকে পাত্তা না দিয়ে সেপ্টেম্বরের শুরুতে সবচেয়ে বড় পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি শেষ করার ঘোষণা দেয় পিয়ংইয়াং।
যুক্তরাষ্ট্র একে ‘ফাঁকা বুলি’ বলে দাবি করলে একই মাসে অস্ত্রটির সফল পরীক্ষা চালায় নর্থ; তারপর নভেম্বরে আবার। প্রায় বছরজুড়েই চলে ট্রাম্প-কিম গালিবিনিময়। শেষমেষ ২৩ ডিসেম্বর দেশটির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে নিরাপত্তা পরিষদে সর্বসম্মতভাবে আরেক দফা অবরোধ আরোপিত হয়।
আশেকা ইরশাদের মতে, নর্থ কোরিয়া চাইছিল যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব যেন তার পারমাণবিক শক্তির অস্তিত্বের বিষয়টি স্বীকার করে নেয়; এবং এ বছর তারা সেটা পেরেছে। ‘তাই সম্ভবত এ বছরের সন্তুষ্টিটা তাদের মাঝে ২০১৮-তেও থাকবে এবং তারা আগামী বছর বিশ্ব-কাঁপানো কিছু ঘটাবে না। তবে নর্থ প্রশাসন খুবই আনপ্রেডিক্টেবল। তাই নিশ্চিত নয় কোনোকিছুই।’
রোহিঙ্গা ও মিয়ানমার
পুলিশ ও সেনাচৌকিতে ‘জঙ্গি হামলা’র জবাব হিসেবে ২৫ আগস্ট রাখাইনের রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী শুরু করে নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ। বিষয়টি প্রতিনিয়ত অস্বীকার করে বিশ্বব্যাপী নিন্দিত দেশটির সেনাবাহিনী এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতা শান্তিতে নোবেলজয়ী অং সান সু চি। জাতিসংঘ একে ‘পাঠ্যবইয়ে যোগ করার মতো জাতিগত নিধনের উদাহরণ’ বলে অভিহিত করেছে। ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স জানিয়েছে, ২৫ আগস্ট থেকে একমাসেই অন্তত ৯ হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা করেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। তখন থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে নভেম্বরের শেষদিকে মিয়ানমার ও বাংলাদেশ সফরে আসেন ক্যাথলিক ধর্মীয়গুরু পোপ ফ্রান্সিস। ২৪ ডিসেম্বর রাতে ক্রিসমাসের আগের রাতের অনুষ্ঠানে রোহিঙ্গাসহ সব শরণার্থীর জন্য প্রার্থনাও করেন তিনি।
ওইদিনই রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে রাখাইনে সেনা অভিযান বন্ধ করা এবং মিয়ানমারে জাতিসংঘের বিশেষ দূত নিয়োগ করার কথা বলেছে জাতিসংঘ। তবে জাতিসংঘে ১২২ ভোট পেয়ে অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা এই সমাধান প্রস্তাবনার বিরোধিতা করেছে চীন, রাশিয়াসহ ১০টি দেশ।
‘রোহিঙ্গা সংকট এতটাই জটিল যে মনে হয় না খুব সহজে এর সমাধান হবে। এবারের মতো আগামী বর্ষায়ও রাঙামাটিতে ভূমিধস হলে এর সঙ্গে বাড়তি এতগুলো মানুষের চাপ মিলিয়ে বড় ধরণের একটা বিপর্যয় ঘটতে পারে,’ বলেন অধ্যাপক আশেকা। তবে এ ইস্যুতে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক মহলের চলতি বছরের চাপ আগামী বছরও ধরে রাখলে ইতিবাচক কিছু হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ব্রেক্সিটের আনুষ্ঠানিক যাত্রা
যুক্তরাজ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়ার (ব্রেক্সিট) আনুষ্ঠানিকতা এ বছরই শুরু হয়। ১৫ ডিসেম্বর ব্রাসেলসে ইইউ’র সম্মেলনের শেষদিনে এ নিয়ে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে করা স্মারকের অনুমোদন দেয় ইইউ। (চলবে)







