বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী শিশু সংগঠনগুলো ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। কচিকাঁচার মেলা, খেলাঘর আসর, চাঁদের হাট, মুকুল ফৌজের মতো বড় সংগঠনগুলোর কার্যক্রম এখন খুবই কম। পাড়া-মহল্লাভিত্তিক শিশু সংগঠনগুলোও আর আগের মতো দেখা যায় না।
শিশু সংগঠনের প্রসঙ্গ আসলে প্রথমেই যে নামটি চোখের সামনে ভেসে ওঠে, সেটি কচিকাঁচার মেলা। এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ছিলেন সবার শ্রদ্ধেয় রোকনুজ্জামান খান দাদা ভাই। ১৯৯৯ সালে তার মৃত্যুর পর থেকেই কচিকাঁচার মেলার কার্যক্রম ধীরে ধীরে সীমিত হয়ে আসতে থাকে। দেশের প্রতিটি উপজেলায় একসময় এর শাখা থাকলেও এখন প্রতি জেলায়ও শাখা নেই। একসময় পাঁচশোর মতো শাখা থাকলেও এখন ৪৩ জেলায় শ’খানেক শাখা টিকে আছে কচিকাঁচার। ঢাকায় আছে ১০টির মতো শাখা।
দাদা ভাইয়ের মৃত্যুর পর কচিকাঁচার মেলার হাল ধরেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকার খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ। কচিকাঁচার মেলার কার্যক্রম সীমিত হয়ে আসার বিষয়টি তিনি স্বীকার করেন। তবে এর পেছনে কিছু কারণ রয়েছে বলেও তিনি মনে করেন। ‘আগে মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে এসব সংগঠনে কাজ করতো। এখন পয়সা ছাড়া কেউ সময় দিতে চায় না। কাজ করতে চায় না। এটা আমেরিকান সংস্কৃতি। বিশ্বায়নের কুফল। বিশ্বায়ন আমরা ঠেকাতে পারব না, কিন্তু আমাদের বাঙালি হয়ে বড় হতে হবে। বিদেশি হয়ে বড় হতে গিয়ে শুধু আমাদেরটা নয়, সবগুলো শিশু সংগঠনের এখন একই হাল।’- বলেন খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ।
এই মুহূর্তে শিশু সংগঠনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শাখা আছে কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসরের। তবে সংগঠনটি আবার দুই ভাগে বিভক্ত। দুটি মিলিয়ে সারাদেশে খেলাঘরের শাখা পাঁচ শতাধিক। একটির নেতৃত্বে আছেন অধ্যাপিকা পান্না কায়সার, অন্যটির নেতৃত্বে প্রফেসর মাহফুজা খানম। বিষয়টি নিয়ে কথা বলছিলাম মাহফুজা খানমের সঙ্গে। তিনি বলেন, সংগঠনের প্রতিটি কার্যক্রম সম্পূর্ণ ব্যক্তিগতভাবে নিজেদের অর্থ দিয়ে চালাতে হয়। এটি করতে গিয়ে অনেক সময় হিমশিম খেতে হয়। এক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সরকারেরও সাহায্য-সহযোগিতা দরকার বলে তিনি মনে করেন। এরপরও খেলাঘরের কার্যক্রম খুব একটা কমেনি বলে তিনি জানান। দেশের বড় সাংস্কৃতিক কার্যক্রমগুলোতে খেলাঘর সবসময় অংশ নেয়।
স্বাধীনতার আগে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে মুকুল ফৌজ ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয় শিশু সংগঠন। মুকুল ফৌজের অনেক সদস্য সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। কেন্দ্রীয়ভাবে বর্তমানে এর কোন কার্যালয় নেই। একসময় ইউনিয়ন পর্যায়ে থাকলেও বর্তমানে সারাদেশে এর শাখা আছে ২০-২৫টি। মুকুল ফৌজের কেন্দ্রীয় সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ চপল এর পেছনে কয়েকটি কারণের কথা উল্লেখ করেন। প্রথমত, সংগঠনে বর্তমানে নেতৃত্বের অভাব আছে বলে তিনি মনে করেন। ‘এই সংগঠনে ভালো কাজ করা নেতাদের বেশিরভাগই মারা যাওয়ায় নেতৃত্বশূন্যতা তৈরী হয়েছে। পাশপাশি পাড়া-মহল্লায় আর আগের মতো বাচ্চা পাওয়া যায় না। এখন সবাই পড়াশোনা-কোচিং নিয়ে ব্যস্ত থাকে। এসব সংগঠনে মা-বাবারা আর বাচ্চাদের পাঠাতে চায় না’-বলেন মহিউদ্দিন আহমেদ চপল।
তবে মুকুল ফৌজ এখনো তার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে ময়মনসিংহে। এর পেছনে যার একক অবদান, তিনি আমীর আহম্মেদ চৌধুরী রতন, মুকুল ফৌজের ময়মনসিংহ শাখার সভাপতি। বর্ষীয়ান এই সংগঠক ময়মনসিংহের মুকুল নিকেতন বিদ্যালয়েরও প্রতিষ্ঠাতা। তিনি বলেন, বাচ্চাদের জন্য যারা দরদ দিয়ে, আন্তরিকতা দিয়ে, মমতা দিয়ে কাজ করবে, তারাই পারবে শিশু সংগঠন চালাতে। এখন এমন মানুষ আর কোথায় পাওয়া যাবে? প্রশ্ন রাখেন তিনি।
একসময় সারাদেশে সক্রিয় থাকা চাঁদের হাটের কার্যক্রমও এখন খুবই সীমিত। বর্তমানে এই সংগঠনের নেতৃত্বে আছেন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাহ আলমগীর। তিনি বাংলাদেশ শিশু কল্যাণ পরিষদেরও সভাপতি। দেশের বেশকিছু শিশু সংগঠন এর আওতায় কাজ করে। শিশু সংগঠনের আর আগের মতো অবস্থা না থাকার পেছনে তিনিও কিছু কারণের কথা উল্লেখ করেন। ‘এখন বাচ্চাদের পড়াশোনার চাপ বেশি, খেলার মাঠ নেই। সাথে যোগ হয়েছে মোবাইল ফোনের নানা অ্যাপ্লিকেশন। এছাড়া অভিভাবকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতাবোধ আগের তুলনায় বেড়েছে। যানজট, যাতায়াতের ভালো ব্যবস্থা না থাকাও একটা কারণ। আর আগে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে সবাই কাজ করতো। এখন চিন্তা করে আমি কী পাব।’ তবে আগের মতো আর কার্যক্রম চালানো কঠিন মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘এখন যেহেতু পরিস্থিতি পরিবর্তন হয়ে গেছে, তাই শিশু সংগঠনগুলোকে চিন্তা করতে হবে যে, মোবাইল, ল্যাপটপ ইত্যাদির মাধ্যমেই যেন বাচ্চাদের মধ্যে দেশপ্রেম জাগ্রত করা যায়। সরকারও এ বিষয়ে সহযোগিতা করতে হবে।’
পাড়া মহল্লায় উদ্যোগী আরো অনেক সংগঠনের কার্যক্রম এখন আর নেই। সবুজ সেনার সাধারণ সম্পাদক নাসের ইকবাল যাদু বলেন, ‘বিশ্বায়নের ফলে এখন স্বেচ্ছাশ্রমের ট্রেন্ড চলে গেছে, এখন এসেছে এনজিও ট্রেন্ড। ফলে যা হবার তাই হচ্ছে।’
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন প্রতিভা বিকাশের পাশাপাশি শিশুদের মধ্যে দেশপ্রেম জাগাতে শিশু সংগঠনগুলোকে আবারো জাগিয়ে তোলা দরকার। আর এজন্য প্রয়োজন অভিভাবকদের সচেতনতা, উদ্যোগী সংগঠক আর সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা।







