সুদীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বিশতম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। গণতন্ত্রের জন্য লড়াই সংগ্রামকারী রাজনৈতিক দলের জন্য দলীয় অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের উপস্থিতি অত্যাবশ্যক। নেতৃত্ব নির্বাচিত হবে কাউন্সিলরদের মতামতের ভিত্তিতে, বিতর্কিত, অযোগ্য, সুবিধাবাদী, সুদিনে তৎপর দুর্দিনে নিস্ক্রিয় এরকম নেতৃত্ব যাতে কেন্দ্রীয় কমিটিতে উঠে আসতে না পারে সেব্যাপারে কাউন্সিলর ও দলীয় আদর্শিক নীতিনির্ধারকদের সতত সজাগ থাকা উচিত।
বিএনপি জামাতের আমলে যারা তৎকালীন চারদলীয় জোটে থেকে আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের নেতাকর্মীদের শারীরিক ও অন্যান্যভাবে নির্যাতন করেছে। তাদের কেউ কেউ ক্ষমতার পালা বদলে আওয়ামী লীগে ঢুকে গেছে। জাতীয় সম্মেলনের সতত দৃষ্টি রাখা উচিত তাদের ব্যাপারে। দুর্দিনে তারা যে দলের নেতাদের পেটাবে আবার সুদিনে তারা সে দলেরই নেতা হয়ে যাবে এটা মানা যায় না। ১৪ দলীয় জোট ছিলো দুর্দিনে একে অপরের পাশে দাঁড়াবার জোট, অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষার জোট, আর মহাজোট সুদিন দখলের জোট। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ হেরে গেলে এরশাদের জাতীয় পার্টি মহাজোট পরিচয় দিতো না। এখন দিচ্ছে কারণ তারা বিরোধী দলীয় নেতা, সাংসদ ও সরকার দলীয় মন্ত্রী হতে পেরেছেন। এই এরশাদের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র রক্ষার জন্য দেশব্যাপী গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে। তার আমলেই বঙ্গবন্ধুর খুনীরা ফ্রিডম পার্টি নাম দিয়ে রাজনৈতিক দল গঠন করেছে ও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। এই খুনীদের সাথে তৎকালীন সময়ে যাদের দহরম মহরম সম্পর্ক ছিল তাদের মাঝেও কেউ কেউ ভোল পাল্টে আওয়ামী লীগার সেজে গেছে।
এবারের জাতীয় সম্মেলনে নেতাদের রাজনৈতিক জীবন বৃত্তান্ত সুস্পষ্ট করা হোক। কত সাল হতে কত সাল পর্যন্ত কে কোন দল করেছে, কত সালে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছে। বিভিন্ন গণতান্ত্রিক লড়াই সংগ্রামে কার কি ভূমিকা তাও স্পষ্ট করা হোক। আদর্শিক বৃত্তান্ত, নৈতিকতা, ত্যাগ, একনিষ্ঠতা ও দৃঢ়তাই যেন হয় নেতৃত্ব নির্বাচনের নিয়ামক শক্তি। ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ, ১৯৭৫ সালের নারকীয় হত্যাযজ্ঞে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবরণ, এরশাদ বিরোধী আন্দোলন, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, বিএনপি জামাতের আমলে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক চেতনার লড়াই, ওয়ান ইলেভেন পরবর্তী সময়ে নেতাদের ভূমিকা প্রভৃতি মাধ্যমে চুলচেরা বিচার বিশ্লেষণ করেই তবে নেতৃত্ব নির্বাচন করতে হবে। কারণ জাতীয় সম্মেলনে ভুল নেতৃত্ব নির্বাচিত হলে এর মাশুল গুনতে হবে পুরো জাতিকে। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষীয় রাজনীতির নেতৃত্বদানকারী দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। সুতরাং এই দলটির সুশৃংখলতা ও যথার্থ নেতৃত্ব নির্বাচন করতে পারা না পারার সুফল কুফল সমমনা দলগুলোর উপরও বর্তাবে।
দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধাপরাধীর বিচার, জননেত্রী শেখ হাসিনার আন্তর্জাতিক অঙ্গণে প্রশংসনীয় মর্যাদা অর্জন বাঙালি জাতিসত্তাকে চরম মর্যাদার উচ্চশিখরে পৌঁছে দিচ্ছে। তিনি দলের নন হয়ে উঠেছেন জাতির প্রধানমন্ত্রী। এই অগ্রযাত্রাকে রুখে দিতে পেট্রোল বোমা, জঙ্গিবাদ, আন্তর্জাতিক কূটবুদ্ধির ষড়যন্ত্র, কোনোটাই আলোর মুখ দেখেনি। যেসব দেশ প্রভুর মতো কর্তৃত্ব করে আসছে এতকাল সেসব দেশেরও অন্যায্য আচরণের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য ভূমিকা রেখে চলেছেন তিনি। কে কোন দল করে সেটা বিবেচ্য নয় প্রতিটি বিবেকবোধ সম্পন্ন মানুষের স্বীকার করতে হবে যে দেশাত্মবোধ তাড়িত রাজনীতি করে বেড়ে ওঠা, যুদ্ধ করে স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ও স্বাধীনতা যুদ্ধের স্থপতির ভূমিকায় ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার নেতৃত্ব অস্বীকার করে, স্বাধীনতা যুদ্ধে তার স্থপতির ভূমিকা অস্বীকার করে কারও রাজনীতি করা শোভন নয়। দেশকে ও দেশের মানুষকে প্রাণভরে ভালবাসতেন যিনি সেই মানুষটিকেই হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন নিজ দলেরই কতিপয় চক্রান্তকারী। বঙ্গবন্ধু জীবদ্দশায় এই মুনাফেকদের চিনতে পারেন নি। চেনা হয়েছে ইতিহাসের বর্বরতম হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হওয়ার পরে।
এবারের জাতীয় সম্মেলনে এরকম মুনাফেক, চক্রান্তকারী, আদর্শিক বোধহীন কেউ যাতে নেতৃত্বে না আসতে পারে সেব্যাপারে বুদ্ধিদীপ্ত সজাগ দৃষ্টি রাখা অতীব জরুরি। রাজনৈতিক আমলনামা যাচাই বাছাই করেই কেন্দ্রীয় কমিটিতে ঠাঁই দেয়া উচিত। অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনাদর্শিক ব্যক্তির উপস্থিতি যে কত পীড়াদায়ক তা যুগে যুগে প্রমাণিত হয়ে আসছে। ঘরের শত্রু বিভীষণদের নিয়ে ঘরের ভেতর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান মারাত্মক কুফল ডেকে আনে। এ ঘর হতে শান্তি চলে যায়। প্রতিনিয়ত শোনা যায় ভাঙ্গনের পদধ্বনি। প্রত্যেকের দলে যোগদানের প্রেক্ষাপট বুঝে মূল্যায়ন করতে হবে। যে সরকার দলে যোগদান করেছে তার মূল্যায়ন হবে একরকম আর যে বিরোধী দলে যোগদান করেছে তার মূল্যায়ন হবে আরেকরকম। এটা চিরসত্য যে বন্ধু চেনা যায় দুর্দিনে, সুদিনে নয়। সুদিনের বন্ধুরা দুর্দিনে থাকেনা আর দুর্দিনের বন্ধুদের সুদিনে না থাকারতো কোনো যুক্তিই নেই। জাতীয় সম্মেলনে যেনো এবিষয়টি ভাবা হয়।বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনে ভুল নেতৃত্ব নির্বাচন হলে এই ভুলের মাশুল গুনতে হবে ১৪ দলীয় জোটসহ সমমনা অপরাপর রাজনৈতিক দল তথা গোটা জাতিকে। পুরো জাতি চেয়ে আছে এই সম্মেলনের দিকে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







