বেশিরভাগ গবেষণা এবং পর্যবেক্ষণ অনুসারে আইএস বিশ্বের সবচেয়ে ধনী জঙ্গি গোষ্ঠী। কিন্তু সম্প্রতি বেশ ভালো রকমের অর্থসঙ্কটে পড়েছে সংগঠনটি। আইএসের সাম্প্রতিক কার্যক্রম দেখে মনে হচ্ছে নিজেদের ঘোষণা করা ‘খিলাফত’-এর অধীনে থাকা লাখ লাখ সাধারণ মানুষকে শাসন করার পাশাপাশি যুদ্ধের পেছনে টাকা ঢালতে গিয়ে তারা হিমশিম খাচ্ছে।
আইএস যে ব্যয় সংকোচনের চেষ্টা করছে তার প্রমাণ ইতোমধ্যেই পাওয়া যাচ্ছে। সম্প্রতি যোদ্ধাদের বেতন ৪০০ মার্কিন ডলার থেকে কমিয়ে ৩০০ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেন’স ইনফরমেশন গ্রুপ’র মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষক কলাম্ব স্ট্র্যাক। শুধু তাই নয়, দলটি ৬০ থেকে ৯০ লাখ মানুষের ওপর কৃষিকাজ ও মোবাইল ফোনসহ নানা বিষয়ে অতিরিক্ত কর চাপিয়ে অর্থ আয়ের চেষ্টা চালাচ্ছে বলেও জানান তিনি।
আইএস শাসনাধীন এলাকাগুলোতে সহায়তা দেওয়ার কাজও অনেকটাই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে সেখানে দারিদ্র্য দিন দিন চরম আকার ধারণ করছে। সেসব জায়গায় জরুরি ওষুধের সঙ্কটের পাশাপাশি ঘন ঘন ও টানা বিদ্যুৎ সঙ্কট চলছে বলে জানান সিরিয়ার কয়েকজন মানবাধিকার ও ত্রাণকর্মী।
ইরাক এবং সিরিয়ায় মার্কিন সমর্থিত বাহিনীগুলো আইএসের দখলকৃত উল্লেখযোগ্য পরিমাণের এলাকা পুনর্দখল করেছে। এতে সেসব এলাকা থেকে দলটির হাতে আগের মতো ব্যাপক অর্থ আসার রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। যে শহর ও গ্রামগুলো থেকে পাওয়া করের ওপর আইএস নির্ভরশীল ছিলো, আরব এবং কুর্দি প্রতিপক্ষরা সেসব দখলে নিয়ে নিয়েছে।
অন্যদিকে নতুন এলাকার দখল নিতে না পারায় নতুন তেলক্ষেত্র, জব্দ করার মতো সম্পদ এবং মুক্তিপণ আদায়ের মতো বন্দীসহ অর্থ আয়ের বিভিন্ন উৎসে টান পড়ে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ব্রিগহ্যাম ইয়াং ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কুইন মেকহ্যাম মনে করেন, আইএসের একটা সমস্যা হলো, গত দু’বছরে তাদের অধিকাংশ আয়ই দখল, বাজেয়াপ্ত এবং চাঁদাবাজি উপায়ে এসেছে। এভাবে পাওয়া অর্থসম্পদ বেশিদিন টেকে না।
‘আর এখন তারা (আইএস) বিভিন্ন এলাকার দখল হারিয়ে ফেলছে, ফলে সেসব উৎস থেকে অর্থ আদায় করাও তাদের জন্য অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। তাদের ওপর এখন অনেক চাপ,’ বলেন তিনি।
আইএসের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বেশ অস্পষ্ট একটি বিষয়। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাচার এবং চাঁদাবাজির মতো উপার্জনের বহুমুখী উৎস থাকায় সংগঠনটি মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের টানা বিমান হামলার মধ্যেও এক বছরেরও বেশি সময় বেশ ভালোভাবেই টিকে থাকতে পেরেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। রাজস্ব বিভাগের সাম্প্রতিক হিসেব অনুযায়ী, শুধু তেল বিক্রি থেকেই মাসে প্রায় ৪ কোটি মার্কিন ডলার আয় করে জঙ্গিরা।
এক আইএস কর্মকর্তা গত জানুয়ারিতে গণমাধ্যমকে জানায়, আইএসের ২০১৫ সালের বাজেট ধরা হয়েছে ২০০ কোটি মার্কিন ডলার। তবে অংকটিকে অতিরঞ্জিত বলে মনে করেন জঙ্গিবাদ বিশ্লেষক বেনজামিন বাহনি। কারণ টানা বিমান হামলায় বর্তমানে দখল করা এলাকার এক-তৃতীয়াংশই হারিয়েছে দলটি। এর মধ্যে ছিলো ইরাকের তিকরিত আর বাইজি তেল শোধনাগারের মতো সমৃদ্ধ কিছু উৎস।
এভাবে দিনের পর দিন নতুন নতুন এলাকার দখল হারানোর প্রভাব পড়ছে দলটির অর্থনীতিতে। একারণেই শত্রুদের ভয় দেখাতে এলাকার বাইরেও হামলা শুরু করেছে আইএস। প্যারিসে চালানো হামলাটি এমনই একটি উদাহরণ। ইরাক-সিরিয়ায় আরো অঞ্চলের দখল হারালেও যেনো ভেঙ্গে পড়তে না হয় সেজন্যই লিবিয়াসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোতে মিত্র এবং অনুসারীর সংখ্যা বাড়াচ্ছে বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের।







