পশ্চিমা বিশ্ব যখন জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের খেলাফতের অবসান ঘোষণা করেছে, ঠিক তার কিছুদিন পরেই শ্রীলঙ্কায় ভয়াবহ হামলার মাধ্যমে আবারো নিজেদের অবস্থার জানান দিয়েছে এই জঙ্গি সংগঠন।
স্মরণকালের এই ভয়াবহ হামলার পর নতুন করে প্রশ্ন উঠছে যে, পরাজিত হওয়ার পরও কীভাবে আইএস আবারও সংগঠিত হলো? এছাড়া বিশ্ব মানবতার জন্য হুমকি হয়ে ওঠা এই জঙ্গিদের আর্থিক ও সামরিকভাবে কারা তাদের মদদ দিয়ে আসছে?
এ প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়ে বেড়িয়ে এসেছে কিছু অবিশ্বাস্য তথ্য।
এই জঙ্গি গোষ্ঠীকে সহায়তা দেওয়ার তালিকায় তুরস্কের পাশাপাশি ভারতসহ ২০ দেশের সম্পৃক্ততা পেয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভিত্তিক স্টাডি গ্রুপ ‘কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চ (সিএআর)’।
ওই গ্রুপের করা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সংবাদ প্রকাশ করেছে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। ভারতের সম্পৃক্ততা থাকার ওই সংবাদ প্রকাশের পর দেশটিতে হইচই পড়ে গেছে।
আইএসকে বিষ্ফোরক সরবরাহ করে কারা?
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসলামিক স্টেট (আইএস)-কে ২০টি দেশের ৫১টি প্রতিষ্ঠান এমন সামরিক রসদ সরবরাহ করে থাকে। আইএসকে বিস্ফোরক সরবরাহ করা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ৭টি ভারতীয় প্রতিষ্ঠান!
ইসলামিক স্টেটের কাছে বিস্ফোরক এবং নানা ধরনের সামরিক রসদ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বেশি তুরস্কে। তারপরই রয়েছে ভারত। ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো অবশ্য বিষয়টি অস্বীকার করেছে৷
সিএআর প্রায় ২০ মাসের প্রয়াসে প্রাপ্ত তথ্যের আলোকে জানায়, সিরিয়া এবং ইরাকে আইএস যেসব অস্ত্র গোলাবারুদ নিয়ে যুদ্ধ করছে, তার মধ্যে বিশ্বের ২০টি দেশের ওই ৫১টি প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ করা অন্তত ৭০০ এমন ধরণের উপাদান রয়েছে যেসব উপাদান ‘ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস’ বা আইইডি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়৷
২০টি দেশের তালিকায় তুরস্ক, ভারত ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, রোমানিয়া, রাশিয়া, নেদারল্যান্ডস, চীন, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া আর চেক প্রজাতন্ত্রের মতো দেশের নামও রয়েছে৷
সিএআর জানিয়েছে, ২০টি দেশের ৫১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তুরস্কের প্রতিষ্ঠানই ১৩টি৷ সরবরাহ করা রসদগুলো লেবানন বা তুরস্ক হয়ে আইএস-এর কাছে পৌঁছায়৷
ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলার চেষ্টা করেছেন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদক৷ চারটি প্রতিষ্ঠান এমন কাজের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছে৷
তারা জানায়, লেবানন বা তুরস্কে তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো বিস্ফোরক বা বিস্ফোরক তৈরির উপযোগী দ্রব্য সরবরাহ করার তথ্যটি সম্পূর্ণ অসত্য৷ দুটি প্রতিষ্ঠান অবশ্য স্বীকার করেছে, তারা কিছু বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে ‘ফিউজ’ বা ডেটোনেটিং কর্ড-এর মতো কিছু জিনিস সরবরাহ করে থাকে৷
তবে প্রতিষ্ঠান দু’টির দাবি, সরবরাহকৃত রসদ শেষ পর্যন্ত কোথায় যায়, কে বা কারা সেগুলো ব্যবহার করে তা তাদের জানা নেই৷
ইরাক এবং সিরিয়ার কয়েকটি শহরে আইএস যোদ্ধাদের ফেলে যাওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ২০টি দেশের ৫১টি প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততার কথা জানতে পেরেছে সিএআর৷
সিএআর-কে তথ্য সংগ্রহে সহায়তা করেছে ইরাকের কেন্দ্রীয় পুলিশ সংস্থা ও সিরিয়ার ওয়াইপিজিসহ আরও কিছু কুর্দি সংগঠন৷
কোথা থেকে অর্থ পায় আইএস?
বেআইনিভাবে পেট্রোলিয়াম বিক্রি আইএস এর আয়ের প্রধান উৎস। সিরিয়া ও ইরাকে বেশ কিছু বড় তৈলকূপ আপাতত তাদের দখলে। মূলত তুরস্কের মধ্য দিয়েই তারা চোরাচালানের কাজ চালিয়ে থাকে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতে, কালোবাজারে তেল বিক্রি করে আইএস-এর মাসে প্রায় ৪ কোটি ডলার আয় হয়।
সিরিয়া ও ইরাকে কোনো এলাকা দখলের পর আইএস সবার আগে ব্যাংকগুলি কবজা করে ফেলে। মার্কিন প্রশাসনের ধারণা, এভাবে তারা ৫০ থেকে ১০০ কোটির ডলার আত্মসাৎ করেছে। এই অর্থ বছরে প্রায় ৫০ হাজার জিহাদি কর্মীর বেতন দেয়ার জন্য যথেষ্ট।
অন্যদিকে আইএস নিয়ন্ত্রিত এলাকার প্রায় ৮০ লাখ মানুষকে ৫ থেকে ১৩ শতাংশ আয়কর দিতে হয়। জার্মান সরকারের সূত্র অনুযায়ী, আইএস অ-মুসলিমদের কাছ থেকে জিজিয়া করও আদায় করে। চাঁদাবাজিও তাদের আয়ের আরেকটি উৎস।
আইএসের কথিত জেহাদিরা নিয়ন্ত্রিত এলাকায় প্রত্মতাত্ত্বিক সম্পদ ও প্রাচীন সমগ্র বিক্রি করেও প্রচুর টাকা আয় করেছে।
এছাড়া তারা মানুষকে জিম্মিকরে মুক্তিপণ আদায় করার মাধ্যমে তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রচার করার পাশাপাশি ও আর্থিকভাবে লাভবান হয়।
মুক্তিপণ ছাড়াও মানুষের সহানুভূতি নিয়ে আর্থিক তহবিল গঠনের নামে প্রচুর অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক এই সন্ত্রাসী সংগঠন।








