ছেলেমেয়েগুলো কিছুক্ষণ আগে ফুল দিয়ে এসেছে। শহীদ মিনারে মূলবেদীতে। কয়েক বছর ধরে নিয়মিত দেয়। তবে ওদের সংগঠন অনেক বছর ধরে দেয়। ফুল দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের গেটের পাশের রাস্তায় বসেছে ৬০/৭০ জন। বৃত্তাকার।
একটা ছেলে গান ধরল ‘আমার হাড় কালা করলামরে/ ও আমার দেহ কালার লাইগারে/ আমার অন্তর কালা করলামরে দুরন্ত পরবাসে।’ গান চলছে। গলাও মেলাচ্ছে সবাই। গান চলছে দুই গীটার আর কাওনের সঙ্গে। গান শেষে তুমুল করতালি। বৃত্তের বাইরে দাড়িয়ে অনেকে বৃত্তের গান শুনছে। শুনছে তাদের কথা। সেই কথা পরিচিত বাংলা নয়। অন্যরকম উচ্চারণ। এরই মাঝে গান শেষে বৃত্তের একজন অপরিচিত ভাষায় বলে উঠলেন কিছু একটা। বৃত্তের সবাই তাতে সম্মতি জানাল বোঝা যায়।
বৃত্তকে ঘিরে দাড়ানোদের একজন তাদের মত দেখতে। বাঙ্গালি নয় তা স্পষ্ট। তার কাছে প্রশ্ন বাংলাতেই। আচ্ছা, এটা তো বাংলা ভাষা নয়। কোন ভাষা? ছেলেটি উত্তর দেয়, গারো ভাষা। কি বলা হল গারো ভাষায়? প্রশ্নে ছেলেটি জানায়, গায়ককে মাতৃভাষায় গাইতে বলছে সবাই। এবার খোলাসা হয় পুরো বিষয়। ছেলেটি জানায়, তারা সবাই বাগাছাস (বাংলাদেশ গারো ছাত্র সংগঠন) এর সদস্য। আজ তারা এসেছে ঢাকা মহানগরের সদস্যরা। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে শহীদ মিনারে ফুল দিতে। বেশিরভাগই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। রাজধানীর অন্যান্য শিক্ষালয়ের সদস্যরাও আছে।
কথা জমে উঠে ছেলেটির সঙ্গে। নাম শুধু জানায় ডায়মন্ড। নতুন যুক্ত হয়েছে সংগঠনের সঙ্গে। গারো ভাষার লিখিত বর্ণমালা আছে কি না প্রশ্নে সে জানায়, না। এই বর্ণমালা উদ্ধারের ইচ্ছা জাগেনা? মাথা নাড়িয়ে ছেলেটি বলে, ইচ্ছা তো অবশ্যই আছে। তবে অগ্রজরা এখন কাজ করছে এ বিষয়ে। কিছু বর্ণ আবিষ্কারও হয়েছে। ডায়মন্ড জানান, বাংলাদেশ অংশে গারোদের ভাষা আবেং নামে পরিচিত। তবে বাংলাদেশ পেরিয়ে পাহাড়ের ওপারে এটা আচিক। মূলত আচিক গারোদের আদি ভাষা। আবেং এর আবার শাখা প্রশাখা রয়েছে।
বাংলা ভাষা নিয়ে কোন ছুৎমার্গ নেই ডায়মন্ডের। ওর মতে, অন্যদেরও নেই। বরং নিজের জন্মভূমির রাষ্ট্রীয় ভাষায় কথা বলতে ভালোই লাগে তাদের। কিন্তু মাতৃভাষায় কথা বলতে সবচেয়ে ভালো লাগে। ডায়মন্ডের কাছে প্রশ্ন রাষ্ট্র তাদের ক্ষুদ্র জাতিস্বত্বায় অভিহিত করছে সাংবিধানিক ভাবে, এতে এ প্রজন্মের গারো সদস্যরা কি মনে করে? তারা কি আদিবাসী সংজ্ঞায়নের কট্টরতায় বিশ্বাসী? মুচকি হেসে ডায়মন্ড জানায়, সবার বিষয় বলতে পারিনা কিন্তু ক্ষুদ্র জাতিস্বত্বা বা আদিবাসী শব্দ নিয়ে আমার মাথাব্যাথা নেই। আমি বাংলাদেশের গারো, বাঙ্গালি নই। গারো পরিচয়ে বাঁচতে চাই বেড়ে উঠতে চাই। তবে রাষ্ট্র ক্ষুদ্র জাতিস্বত্তা বলছে তাতে ভুল কিছু নেই কিন্তু।
বিদায়ের মূহুর্তে ডায়মন্ডকে প্রশ্ন, আমি আমার মায়ের ভাষাকে ভালোবাসি, এটি গারো ভাষায় কি বলা হবে? স্নিগ্ধ হেসে হাতের ডায়রিতে নিজ হাতে লিখে দেয় গারো শিক্ষার্থী। ‘আংআ আংনি আমানি খুশুক্কু নামনিকো। লিখে তারপর মুখে বলে দেয় অর্থ শব্দ ধরে ধরে।
আংআ (আমি) আংনি (আমার) আমানি (মায়ের) খুশুক্কু (ভাষাকে) নামনিকো (ভালোবাসি)।
বৃত্তে নতুন গান শুরু হয়েছে এবার গারো ভাষায়। অর্থ বোঝা যায়না। তবে ভালোবাসার কোন উচ্চারণ হবে হয়ত।







