চ্যানেল আই অনলাইন
Advertisement
English
  • সর্বশেষ
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • রাজনীতি
  • খেলাধুলা
  • বিনোদন
  • অপরাধ
  • অর্থনীতি
  • আদালত
  • ভিডিও
  • জনপদ
  • প্রবাস সংবাদ
  • ফিফা ২০২৬
  • চ্যানেল আই টিভি
No Result
View All Result
চ্যানেল আই অনলাইন
En

‘অ্যান ওডেসি’: প্রফেসর নুরুল ইসলামের আত্মজৈবনিক এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি

ড. আতিউর রহমানড. আতিউর রহমান
৬:১৩ অপরাহ্ণ ০৬, নভেম্বর ২০১৮
মতামত
A A

নয়া প্রজন্মের অর্থনীতির ছাত্র-ছাত্রীরা জগৎবিখ্যাত অর্থনীতিবিদ প্রফেসর নুরুল ইসলামকে কতোটুকু জানে তা আমার জানা নেই। তার অবিস্মরণীয় লেখাগুলোর সাথেই তাদের কতোটা পরিচয় রয়েছে তাও আমি জানি না। এই বাস্তবতা মেনে নিয়েই তার আত্মজৈবনিক গ্রন্থ ‘অ্যান ওডেসি: দ্যা জার্নি অফ মাই লাইফ’ (প্রকাশক: প্রথমা, ২০১৮) বিষয়ে পাঠকদের সাথে আমার কিছু ভাবনা ভাগাভাগি করে নিতে চাই। প্রফেসর নুরুল ইসলাম বাংলাদেশের কয়েক প্রজন্মের অর্থনীতিবিদদের শিক্ষক ছিলেন। আমাদের শিক্ষকদেরও তিনি শিক্ষক। আমি সরাসরি ছাত্র না হয়েও বরাবরই তার স্নেহধন্য হতে পেরে নিজেকে খুবই ভাগ্যবান মনে করি। ছাত্র জীবন থেকেই তার সাথে অপ্রাতিষ্ঠানিক হলেও ছাত্র-শিক্ষকের এক গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আজও তা বলবৎ রয়েছে।

১৯৭৪ সালে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। তার নেতৃত্বে তৈরি প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা দলিলের ওপর এক বিশেষ সম্মেলনের আয়োজন করেছিল বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি। আমি আমাদের শিক্ষক, তৎকালীন চেয়ারম্যান, প্রফেসর মীর্জা নুরুল হুদার নির্দেশে ঐ সম্মেলন আয়োজনে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলাম। পাশাপাশি একটি অধিবেশনে প্রবন্ধও পড়েছিলাম। মাঝে মাঝে নানা বিষয়ে আলোচক হিসেবেও অংশগ্রহণ করেছিলাম। নুরুল ইসলাম স্যার মনে হয় বেশ মনোযোগ দিয়ে আমার অংশগ্রহণ খেয়াল করেছেন। তাই এর কিছু দিন পর বাংলাদেশ বিমানে জার্মানি যাবার পথে এথেন্স বিমান বন্দরে ট্রানজিটের সময় তিনি ঠিকই আমাকে চিনে ফেলেন এবং স্নেহে কাছে ডেকে নিলেন। সেটি ছিল আমার জীবনের প্রথম বিদেশ সফর। তাই খানিকটা নার্ভাস ছিলাম। স্যার একজন পিতার মতোই আমাকে সাহস যোগালেন এবং সম্মেলনে দেয়া আমার সমালোচনামূলক বক্তব্যের প্রশংসা করলেন। আর বললেন এভাবেই যেন সাহস করে সব সময় সত্যি কথাটি বলতে দ্বিধা না করি। সেই যে স্নেহবর্ষণ শুরু তা আজও আমাকে সিক্ত করে চলেছে।

বিআইডিএস (যার প্রতিষ্ঠাতাও তিনি) গবেষক হিসেবে যোগ দেবার পর মাঝে মধ্যেই স্যারের সাথে সংযোগ হতো। তদ্দিনে তিনি পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি-চেয়ারম্যান পদ ছেড়ে অক্সফোর্ডে কিছুটা সময় কাটিয়ে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা ‘ফাউ’ এর সহকারী মহাসচিবের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। ঢাকায় এলে তিনি অবশ্যই বিআইডিএসে আসতেন। তখন আমাদের সাথে তিনি বসতেন এবং মত বিনিময় করতেন। তরুণ গবেষকদের সাথে কথা বলতে তিনি বরাবরই খুবই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। আমার এখনও মনে আছে কয়েকবার স্যারকে তরুণ গবেষকদের সাথে মতবিনিময়ের সুযোগ করে দিতে পেরেছিলাম। দুই হাজার সালের দিকে তিনি উন্নয়ন সমন্বয়ের সভাকক্ষে তরুণ শিক্ষক ও গবেষকদের সাথে বসেছিলেন। এই প্রতিষ্ঠানটি আমি প্রতিষ্ঠা করেছি। এর পর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম তরুণ গবেষকদের সাথে আলাপ করার জন্যে। সেবার স্যারকে বাংলাদেশ ব্যাংক পুরস্কারে ভূষিত করতে পেরে নিজেরই সম্মানিত হতে পেরেছিলাম। এটা স্যারের অনেক আগেই প্রাপ্য ছিল। এর পরেও ‘বাংলাদেশ ইকোনমিস্ট ফোরামে’ (বিইএফ) স্যার কয়েকবার তরুণ গবেষকদের সাথে মতবিনিময় করেছেন। স্যার যে তরুণদের সাথে কথা বলে সন্তুষ্টি লাভ করেছিলেন সে কথা বহুবার তিনি আমাকে জানিয়েছেন। যতবার তিনি তরুণ গবেষকদের সাথে কথা বলেছেন ততোবারই অর্থনৈতিক গবেষণার মান এবং প্রয়োজনীয় পরিসংখ্যানের গুনমান নিয়ে মতবিনিময় করেছেন। তার সর্বশেষ বই ‘দ্যা ওডেসি’র শেষ অধ্যায়েও তিনি এ বিষয়ে প্রাসঙ্গিক আলাপ করেছেন।

ফাইল ছবি

স্যারের এই বইটি এবং আগের আরেকটি বই (‘দ্যা মেকিং অফ অ্যা নেশন’) পড়লেই বোঝা যায় তিনি একজন জাত শিক্ষক, গবেষক এবং দেশপ্রেমিক। এ দুটো বইতেই তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দূরদর্শী এবং উদারনৈতিক নেতৃত্বের নানা দিক তুলে ধরেছেন। ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে তিনি বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক দর্শনের সাথে সম্পৃক্ত হতে পেরেছিলেন। বঙ্গবন্ধুও তাকে গভীরভাবে মূল্যায়ন করতেন। ছয় দফার ভিত্তিতে কি করে সুষম অর্থনীতির রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করা যায় সে জন্যে তিনি তাকে তার কোর টিমে যুক্ত করেছিলন। ১৯৭০ সালে নির্বাচনে জেতার বেশ আগে থেকেই তিনি বঙ্গবন্ধুর সাথে কাজ করতেন। তখন তিনি পিআইডির পরিচালক। প্রায়ই পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসতেন এবং তার সাথে সংবিধানে কী করে ৬ দফার নির্যাস যুক্ত করা যায় সে বিষয়ে আলাপ করতেন। এরপর পিআইডি ঢাকায় স্থানান্তর করার পর তিনি আরো গভীরভাবে বঙ্গবন্ধু ও তার সহ-নেতাদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পান। যে দিন ইয়াহিয়া খান ঢাকায় সাংবিধানিক সংসদের অধিবেশন স্থগিতের ঘোষণা করেন সেদিনও তিনি বঙ্গবন্ধু ও তার সহকর্মীদের সাথে পূর্বানী হোটেলে সংবিধান প্রণয়নের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। এর পরের কাহিনী আমাদের সবারই জানা।

অসহযোগের দিনগুলোতে বঙ্গবন্ধুই কার্যত: বাংলাদেশের প্রশাসন পরিচালনা করছিলেন। সে সময়ও তিনি অর্থনৈতিক বিষয়গুলো নিয়ে বঙ্গবন্ধু ও তার সহ-নেতাদের সাথে কাজ করতেন। তাই পাকিস্তানীরা ঠিকই জানতেন অর্থনীতিবিদ নুরুল ইসলাম বঙ্গবন্ধুর কতোটা ঘনিষ্ঠ। পঁচিশে মার্চ রাতে গণহত্যা শুরু হয়ে গেলে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার সামান্য পরেই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করার পর তাকে যে খোঁজা হবে তা স্যার জানতেন। বাস্তবেও তাই ঘটেছিল। তাই খুব দ্রুতই স্যার দেশ ছেড়ে ভারতের পথে রওনা হয়ে যান। তার ছাত্ররা তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেছে। অনেক প্রতিকূলতা পেরিয়ে দিল্লী পৌঁছুলে আওয়ামী লীগের নেতা তাজউদ্দীন আহমদ, ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম, অধ্যাপক রেহমান সোবহান, ও ভারতের প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন, অর্জন সেনগুপ্ত, অশোক মিত্রসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে তার দেখা হয়। হার্ভার্ডে তার সতীর্থ পি.এন. ধরের সাথেও সে সময় সংযোগ ঘটে। সেখান থেকেই সিদ্ধান্ত হয় যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্ব ব্যাংক, বিশ্ববিদ্যালয়, স্টেট ডিপার্টমেন্টসহ ক্ষমতার অন্যান্য কেন্দ্রে বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক মতামত গঠনে ভূমিকা রাখবেন। স্ত্রী সন্তানদের ফেলে নিঃশঙ্ক চিত্তে এই কাজে তিনি অংশগ্রহণ করেছেন। ঐ সময়ে তার মত অর্থনীতিবিদের বাংলাদেশের পক্ষে জোরালো ভূমিকা কতোটা ইতিবাচক ছিল তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই দেশ স্বাধীন হবার সাথে সাথে তিনি পশ্চিমের পেশাগত উন্নতির নানা সুযোগের হাতছানি উপেক্ষা করে স্ত্রী সন্তানদের বিদেশে ফেলেই চলে এলেন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে। উল্লেখ্য, ঐ সময় তিনি বিশ্ব ব্যাংকের একজন পরিচালক হিসেবে নিয়োগপত্রও পেয়েছিলেন। কিন্তু স্বদেশের ডাকে ঐ নিয়োগ উপেক্ষা করে তিনি বাংলাদেশে চলে এসেছিলেন। তখনও বঙ্গবন্ধু স্বদেশে ফেরেন নি। এসেই মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে দেখা করেন এবং চট্টগ্রামে যান আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে দেখা করার জন্যে।

বঙ্গবন্ধু ফিরে আসার পূর্বক্ষণে তিনি চলে আসেন ঢাকায়। প্রথম সুযোগেই দেখা করেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে। আর ঐ সাক্ষাতেই তিনি তাঁকে পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি-চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের কৌশল নির্ধারণের আহ্বান জানান। সাথে সাথে তিনি বঙ্গবন্ধুর এই আহ্বানে সাড়া দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, বিআইডিএস ও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনাম-খ্যাত অর্থনীতিবিদ, প্রকৌশলী ও অন্যান্য পেশাজীবীদের সমন্বয়ে গড়ে তুললেন অনন্য এক জ্ঞান-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান। প্রফেসর নুরুল ইসলাম ও তার সহযোগীদের আন্তরিক সমর্থন নিয়ে বঙ্গবন্ধু অতি অল্প সময়ের মধ্যেই গড়ে তোলেন বাংলাদেশের শক্তিশালী অর্থনৈতিক উন্নয়নের নীতি-নির্ধারনী ভিত্তিভূমি। এই পেশাজীবীদের সর্ব্বোচ্চ আত্মত্যাগ ও পরিশ্রম বিনিয়োগ করা হয়েছিল দেশ গড়ার কাজে। যদিও ষড়যন্ত্রকারীরা বঙ্গবন্ধুকে এই অর্থনৈতিক পুনর্নির্মাণের ফসল ঘরে তুলতে দেয় নি, তা সত্ত্বেও একথা আজ আর অস্বীকার করার উপায় নেই যে তিনিই এসব পেশাজীবীদের সমর্থন নিয়ে আমাদের বর্তমানের দুরন্ত গতিতে এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশ অর্থনীতির মূল ভিত্তিভূমি স্থাপন করেছিলেন। আনন্দের কথা, তাঁরই সুকন্যা শেখ হাসিনার হাত ধরে বঙ্গবন্ধু স্বপ্নের সোনার বাংলা আজ ডানা মেলছে। সমৃদ্ধির পথে হাঁটছে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ।

Reneta

চট্টগ্রাম, কোলকাতা, এবং ঢাকায় শিক্ষা এবং পরবর্তী সময়ের পেশাগত জীবনের নানা স্মৃতি ছাড়াও প্রফেসর নুরুল ইসলামের আত্মজৈবনিক এই বইটির বিশাল অংশ জুড়ে আছেন বঙ্গবন্ধু। আগেই বলেছি তাঁর সাথে স্বাধীনতা-পূর্ব সময় থেকেই প্রফেসর ইসলামের যোগাযোগ ছিল। আর বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের দায়িত্ব নেবার পর এই সংযোগ আরও গভীর হয়েছিল। বরাবরই কঠোর পরিশ্রমী, রাশভারী এই শিক্ষক এখনও দারুণ ব্যস্ত। হালে তিনি খুব করে ইতিহাস পড়ছেন এবং দক্ষিণ-এশিয়ার ইতিহাস লিখছেন। অর্থনৈতিক ইতিহাসের বাইরেও সংশ্লিষ্ট নানা প্রসঙ্গের তিনি অবতারণা করছেন। বিশেষ করে হালের সমাজে কি করে অসাম্প্রদায়িক ভাবনা ও সংস্কৃতি নিষ্ক্রিয় হয়ে যাচ্ছে সে দিকটি নিয়ে তিনি যে বেশ উদ্বিগ্ন তা তার আলোচ্য বইটিতে এবং অন্যত্র বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠতে দেখেছি। তিনি সর্বক্ষণ গবেষণায় ব্যস্ত রয়েছেন। মনেই হয় না তিনি এখন অবসর জীবন কাটাচ্ছেন। যখনই ওয়াশিংটন ডিসিতে যাই স্যারের সাথে যোগাযোগ করি। সুযোগ পেলে দেখাও করি। অফিসে কিংবা বাসায়। দেখা বা কথা হলেই উন্নয়ন অর্থনীতির সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ নিয়ে আলাপ করেন। একজন শিক্ষকের কাছ থেকে যেমনটি প্রত্যাশা করা যায় তেমনটিই তিনি তাঁর বহু বছরের অর্জিত অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান সম্পদ অকাতরে আমাদের বিলিয়ে যাচ্ছেন। আমরা যদি তাঁর সর্বশেষ বইটি এবং আগে প্রকাশিত ‘মেকিং অফ অ্যা নেশন’ বইটি মিলিয়ে পড়ি তাহলে স্যারের ব্যক্তি ও পেশাগত জীবনের একটি পূর্ণ চিত্রের সন্ধান পাই।

তার পিতা ছিলেন আজীবন শিক্ষাজীবী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে মাস্টার্স করেছেন। আর তাই তিনি স্যারকে যে শিক্ষাজগতেই যুক্ত থাকতে বলবেন তাতে অবাক হইনি। অথচ ঐ সময়টায় স্যারের মতো মেধাবী তরুণরা পাকিস্তান সরকারের সিএসপি তথা এলিট কর্মকর্তাদের গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবেই বেশি করে দেখতে পছন্দ করতেন। ক্ষমতা ও সম্মান দুই ই মিলতো এই গোষ্ঠীর সদস্যদের। বিএ অনার্স ও এমএতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েও স্যার ঐ দলে যোগদান করেন নি। তার বাবার অনুপ্রেরণায় বরং সরকারি বৃত্তি নিয়ে হার্ভার্ডে উচ্চ শিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যান। পিএইচডি শেষ করে আইএমএফের তরুণ পেশাজীবী হবার সুযোগ অগ্রাহ্য করে তিনি দেশে ফিরে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের রিডার (অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর) পদে যোগ দেন। ঐ সময়ের উপচার্য মি. জেনকিন্স এবং স্যারের শিক্ষক ড. মাযহারুল হকের সমর্থন না পেলে শুরুতেই একজন রিডার হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকা সম্ভব হতো কি না তাতে সন্দেহ ছিল। পরবর্তী সময়ে তাঁর আরেক শিক্ষক ড. এম.এন. হুদার সাথে তিনি একযোগে প্রফেসর হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছিলেন। সেবারও উপাচার্য ছিলেন শিক্ষক গোত্রের বাইরের একজন অর্থাৎ বিচারপতি হামুদুর রহমান। এ দুটো নিয়োগের সময়ই তিনি তার সহকর্মীদের কাছ থেকে তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়েছিলেন। প্রচলিত সামাজিকতায় তিনি সময় নষ্ট না করে সর্বক্ষণ শিক্ষণ ও গবেষণায় ব্যস্ত থাকতেন। এ জন্যে অনেক সময় তাঁকে ‘বুদ্ধিবৃত্তিক ঔদ্ধত্যে’র অপবাদ সইতে হতো। তবে পরবর্তী সময়ে তিনি একজন সফল শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে ঠিকই যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছিলেন। বিভাগের পাঠ্যসূচি আধুনিক করা, গবেষণার জন্যে ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চ প্রতিষ্ঠা করা এবং সহকর্মী শিক্ষকদের আধুনিক গবেষণা পদ্ধতির সাথে সম্পৃক্ত করার মতো অসংখ্য পেশাগত উন্নয়নধর্মী কাজ করে তিনি নিজের এবং বিভাগের সুনাম বৃদ্ধি করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষক হিসেবে তার বেড়ে ওঠার গল্পের মাধ্যমে আমরা ঐ সময়ের সমাজ, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির পরিবর্তনের ধারার কথাও জানতে পারি এই বই পড়ে। বিশেষ করে উদীয়মান মধ্যবিত্তের পরিবর্তনশীল সামাজিক ও সাংস্কৃতি মুল্যবোধের সন্ধানও পাই তার লেখায়।

গত ছয় দশকে আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতিতে যে অভাবনীয় পরিবর্তন ঘটেছে এই বই তার সাক্ষী। বিদেশে উচ্চ শিক্ষা শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরুর পর পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনীতির বৈষম্য নিয়ে তিনি তার পেশাদারি মতামত তৎকালীন নীতি নির্ধারকদের কাছে তুলে ধরেন। দু দুটো অর্থ কমিশনের সদস্য হিসেবে তিনি পূর্ব-বাংলার মানুষের আর্থিক বঞ্চনার উৎস, বাণিজ্য ও বাজেটের সংস্কারসহ নানা বিষয়ে বিতর্ক ও প্রস্তাবনা তৈরিতে আন্তরিকভাবে অংশগ্রহণ করেন। বর্তমান অতীতেরই ফসল। তাই নতুন প্রজন্মকে ইতিহাসের এই বাঁকবদল এবং তার পেছনের মানুষগুলোকে জানা এবং চেনা খুবই জরুরি।
এবারে পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান এবং পরবর্তী সময়ে ঊর্ধ্বতন জাতিসংঘ কর্মকর্তা হিসেবে প্রফেসর ইসলামের কিছু নীতিনির্ধারণী কর্মকান্ডের ওপর আলো ফেলতে চাই। ষাটের দশকের শেষ দিকে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে করাচিতে পাকিস্তান ইন্সটিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিক্সের (পিআইডিই) পরিচালক হিসেবে কাজে যোগদান করেন।

জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই গবেষণা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় তিনি যে কৃতিত্ব ও দক্ষতা দেখিয়েছেন তাতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অর্থনীতিবিদদের সাথে তাঁর গভীর যোগাযোগ ঘটে। অস্টিন রবিনসন, নোবেলবিজয়ী ইয়েন টিন্বারজেন এবং ইউস্ট ফাল্যান্ডসহ খ্যাতিমান অন্যান্য অর্থনীতিবিদগণ ঐ প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন। তার আমলে ঐ প্রতিষ্ঠান থেকে এমন কিছু গবেষণা প্রকাশিত বের হয়েছিল যেগুলোর মধ্যে পাকিস্তানের দুই অংশের অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিবরণ ছিল। ফলে পাকিস্তানের নীতিনির্ধারকরা তার ওপর বেশ ক্ষুব্ধ ছিলেন। তাছাড়া, অর্থ কমিশনের প্রতিবেদন তৈরির সময়ও তিনি পাকিস্তানী রাজনৈতিক ও আমলাদের রোষানলে পড়েন। সেজন্যে পিআইডিইর গবেষণা কর্ম নিয়ে তাকে নীতি নির্ধারকদের সাথে অনেক বিতর্কেও জড়িয়ে পড়তে হয়েছিল। এ সব দেখে তিনি নিশ্চিত হয়েছিলেন যে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের এই দ্বন্দ্ব সনাতনী রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতর নিরসনের কোনো উপায় ছিল না। আর সে কারণেই তিনি বঙ্গবন্ধু এবং ছয় দফাকে সাংবিধানিকভাবে সম্পৃক্ত করার কাজে নিজে নিয়োজিত হয়েছিলেন এবং তার সহযোগীদেরও যুক্ত করেছিলেন।

ফাইল ছবি

এই প্রস্তুতিমূলক কাজের এক পর্যায়েই ইয়াহিয়া খান ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য সাংবিধানিক পরিষদের অধিবেশন হঠাৎ করেই স্থগিত করে দেন। শুরু হয়ে যায়, অসহযোগ আন্দোলন। ঐ আন্দোলনের এক পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে দেন মুক্তির ডাক। আসে ২৫ শে মার্চ। শুরু হয় গণহত্যা। তার কিছু পরেই ২৬ শে মার্চের প্রথম প্রহরেই স্বাধীনতার ঘোষণা দেন বঙ্গবন্ধু। এর পরপরই তিনি গ্রেপ্তার হন। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে প্রফেসর ইসলামকে খুঁজতে থাকে। শত্রুদের চোখে ছাই দিয়ে তার ছাত্রদের সহযোগিতা নিয়ে তিনি সীমান্ত পারি দিয়ে দিল্লী পৌঁছতে সক্ষম হন। এরপর তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান এবং প্রবাসী সরকারের পক্ষে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, স্টেট ডিপার্টমেন্ট ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তথ্যাভিযান শুরু করেন।

এভাবেই তিনি প্রবাসে সর্বক্ষণ নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন বাংলাদেশের মুক্তির আন্দোলনে। আর আগেই বলেছি দেশ স্বাধীন হবার পর এক দ-ও তিনি বিলম্ব করেন নি স্বদেশের মাটিতে পা ফেলতে। আর দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পরিকল্পনা কমিশনই শুধু গড়ে তুলেছেন তাই নয় বঙ্গবন্ধুকে সর্বক্ষণ অর্থনৈতিক নীতিমালা তৈরি ও বাস্তবায়নের জন্য উপযুক্ত পরামর্শ দিয়ে গেছেন। অতি অল্প সময়ের মধ্যে প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা তৈরি করে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুদৃঢ় এক পাটাতন তৈরি করেছিলেন।

তবে ১৯৭৪ সাল নাগাদ মূলত: আমলাদের অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য পরিকল্পনা কমিশন তার ব্যাপ্তি ও গতি হারিয়ে ফেলে। তার পেশাজীবী সহমর্কীরা যার যার কর্মক্ষেত্রে ফিরে গেলেন। প্রফেসর ইসলামও এক পর্যায়ে বিদেশে (অক্সফোর্ড) চলে গেলেন গবেষণা কর্মে। এর পরের ট্র্যাজিক ঘটনা প্রবাহের কথা আমরা সবাই জানি। তিনিও এই আক্রমণের ধাক্কায় নিশ্চুপ হয়ে গিয়েছিলেন। এর পর তিনি জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার সহকারী মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেখানেও তিনি অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে তার দায়িত্ব সম্পন্ন করেন।

ঐ দায়িত্ব পালনকালে বাংলাদেশের তৎকালীন অর্থমন্ত্রী জনাব সাইফুর রহমানের প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন। বঙ্গবন্ধুর খুনি কর্নেল রশীদ তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হওয়া সত্ত্বেও তিনি তার সাথে কথা না বলে হোটেল থেকে স্যারের বাসায় চলে আসেন। এছাড়াও তিনি অনেক ‘বিচিত্র’ চরিত্রের মানুষদের কথা তার আত্মজীবনীতে তুলে এনেছেন। জাতিসংঘের বাংলাদেশের তৎকালীন স্থায়ী প্রতিনিধি বিচারপতি বি.এ. চৌধুরীর পাকিস্তানপ্রীতি, রাষ্ট্রদূত কায়সার রশীদ, বর্তমান অর্থমন্ত্রী, প্রফেসর ইউনূসসহ অসংখ্য মানুষের বিষয়ে খোলামেলাভাবে স্যার লিখেছেন। আমি ইচ্ছে করেই ঐ সব বিষয় তুলে ধরলাম না। পাঠক চাইলে এসব কথা পড়ে নিতে পারেন। প্রবাসীদের কর্মকাণ্ডের বিষয়েও স্যার তীর্যক মন্তব্য করেছেন। ভারত বা পাকিস্তানের প্রবাসীরা যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের সাথে তাদের দেশের পররাষ্ট্র নীতির পক্ষে তথ্য-নির্ভর শক্ত অবস্থান তুলে ধরেন আমাদের প্রবাসীরা তেমনটি করেন না। আমাদের মধ্যবিত্ত শিক্ষিত শ্রেণির বাংলাদেশের ইতিহাস বিষয়ে উদাসী মনোভাব, তাদের মৌলবাদী ধ্যানধারণার দিকে হেলে পড়া এবং সমাজ ও সংস্কৃতিতে এই মনোভাবের প্রভাব নিয়ে গভীরভাবে না ভাবার বিষয়গুলো স্যার এই বইতে তুলে ধরেছেন। এই বইটির সবচেয়ে ভালো দিক হচ্ছে প্রফেসর ইসলামের জীবন ও কর্ম বিষয়ে অকপট সত্যি কথা বলার সাহস। নিজেই বলেছেন যে কখনও কখনও হয়তো তাকে খুবই ‘অ্যারোগেন্ট’ মনে হতে পারে। তবে তিনি নিজে মনে করেন যে তিনি খুবই নরম স্বভাবের একজন মানুষ। তা সত্ত্বেও তিনি স্বীকার করেছেন যে তার জীবনেও অনেক ভুলত্রুটি ছিল। সেগুলো নিয়ে তিনি ‘রিগ্রেট’ও করেন। তবে এও বলেন যে জীবন তিনি যাপন করেছেন তা তো আর পুনঃযাপনের সুযোগ নেই। তাই জীবনের ভালো ও মন্দ দুটো দিকই তিনি মেনে নিয়েছেন। পেশাদারি উৎকর্ষের টানে তিনি তার স্ত্রী ও সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দেননি বলে এখনে তার দুঃখ হয়। আমরা অনেকেই এই ভুলটি করে চলেছি। স্যারের এই স্বীকারোক্তি থেকে যদি কিছুটা শিখতে পারি এবং এমন ভুল কমিয়ে আনতে পারি তাতেই বা কম কি।

আমাদের তরুণ প্রজন্মের জন্য বইটি খুবই গুরুত্ব বহন করে এই কারণে যে লেখকের ব্যক্তি ও পেশা জীবনের নানা ঘটনা প্রবাহ, ব্যক্তি বিশেষকে চেনার সুযোগ করে দিতে সক্ষম। সাধারণ পাঠকদের কাছেও এই বইটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের এক উজ্জ্বল দলিল হিসেবে প্রতিভাত হবে বলে আমার বিশ্বাস। স্যারের দীর্ঘ জীবন কামনা করে এই আলোচনাটির সমাপ্তি টানছি।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Channel-i-Tv-Live-Motiom

শেয়ারTweetPin

সর্বশেষ

নরওয়ের গোলবাতিল-ব্রাজিলের পেনাল্টি মিস, প্রথমার্ধে গোলশূন্য সমতা

জুলাই ৬, ২০২৬

ইংলিশ খেলোয়াড়রা আসলেই ভায়াগ্রা খেয়ে মাঠে নামবে?

জুলাই ৬, ২০২৬

বাংলাদেশ শুনে সাক্ষাৎকার দিলেন, বাংলাদেশে আসবেন বললেন আর্জেন্টিনার সাবেক অধিনায়ক

জুলাই ৬, ২০২৬

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের টানাপড়েন দূর করতে ভারতেরই এগিয়ে আসা উচিত

জুলাই ৫, ২০২৬

শিল্পী সমিতিতে হেরে প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচার চাইলেন পলি

জুলাই ৫, ২০২৬
iscreenads

প্রকাশক: শাইখ সিরাজ
সম্পাদক: জাহিদ নেওয়াজ খান
ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেড , ৪০, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সরণী, তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮, বাংলাদেশ
www.channeli.com.bd,
www.channelionline.com 

ফোন: +৮৮০২৮৮৯১১৬১-৬৫
[email protected]
[email protected] (Online)
[email protected] (TV)

  • আর্কাইভ
  • চ্যানেল আই অনলাইন সম্পর্কে
  • চ্যানেল আই সম্পর্কে
  • চ্যানেল আই সকল সোস্যাল মিডিয়া

Welcome Back!

Login to your account below

Forgotten Password?

Retrieve your password

Please enter your username or email address to reset your password.

Log In
Bkash Stickey June 2025 Desktop

Add New Playlist

No Result
View All Result
  • সর্বশেষ
  • প্রচ্ছদ
  • ফিফা ২০২৬
  • চ্যানেল আই লাইভ | Channel i Live
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • স্বাস্থ্য
  • স্পোর্টস
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • কর্পোরেট নিউজ
  • আইস্ক্রিন
  • অপরাধ
  • আদালত
  • মাল্টিমিডিয়া
  • মতামত
  • আনন্দ আলো
  • জনপদ
  • আদালত
  • কৃষি
  • তথ্যপ্রযুক্তি
  • নারী
  • পরিবেশ
  • প্রবাস সংবাদ
  • শিক্ষা
  • শিল্প সাহিত্য
  • চ্যানেল আই সকল সোস্যাল মিডিয়া

© 2023 চ্যানেল আই - Customize news & magazine theme by Channel i IT