সাবেক শিষ্যদের কাছে গর্ডন গ্রিনিজ শুধু একজন কোচই নন; অভিভাবকও। খালেদ মাসুদ, মিনহাজুল আবেদিন, হাবিবুল বাশারদের কাছে তিনি এককথায় অসাধারণ ভাল একজন মানুষও।
সোমবার সন্ধ্যায় টাইগারদের সাবেক কোচ গর্ডন গ্রিনিজকে মধ্যমণি করে স্মৃতিকথার আসর বসেছিল সোনারগাঁও হোটেলের গ্র্যান্ড বলরুমে। বাংলাদেশের ক্রিকেট ফিরে গিয়েছিল ২১ বছর আগে! সেখানেই গুরু সম্পর্কে কথার ঝাঁপি খুলে দেন সাবেক-বর্তমান ক্রিকেটাররা।
খালেদ মাসুদ পাইলট
১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ দলের কন্ডিশনিং ক্যাম্প ছিল। আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে খেলার জন্য যে ধরণের ট্রেনিং দরকার, আমার মনে হয় তিনি সেই ধরনের ট্রেনিংই আমাদের করিয়েছেন। একজন ব্যক্তি হিসেবে তিনি অসাধারণ। খুব সৎ ছিলেন। পুরো টিমকে এক সুতোয় বেঁধেছিলেন। খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ ছিলেন। কিন্তু মাঠে কোনোরকম আপোষ করতেন না।
প্রত্যেকটা খেলোয়াড়কে কঠোর পরিশ্রম করাতেন তিনি। কাজ আদায় করে নিতেন। তার সঙ্গে অনেক স্মৃতি স্বল্প সময়ে বলা কঠিন। প্রত্যেকটা মুহূর্ত ভাল কেটেছে। অনেক হার্ডওয়ার্কিং কোচ ছিলেন। আমার মনে আছে, বিকেএসপিতে সকাল ৭টায় অনুশীলন থাকত। তিনি ৫টায় উঠে ওয়ার্কআউট করে আবার আমাদের সাথে ওয়ার্কআউট করতেন।
বিশ্বকাপে যাওয়া পর্যন্ত পুরো টিমটাকে সন্তানের মতো করে আগলে রেখেছিলেন। অসাধারণ কোচ, অসাধারণ মানুষ। বাংলাদেশের ক্রিকেট এই জায়গায় আসার পেছনে তার অনেক অবদান। গর্ডনের সময় সুযোগ-সুবিধা কম ছিল। আধুনিক ছিল না। আপগ্রেটেড কিছু আইডিয়া দিতেন, এভাবে খেললে সুবিধা হবে। বিভিন্ন উইকেটে, ইংল্যান্ডের উইকেটে কীভাবে খেলতে হবে সেটি বলতেন।
ফিটনেসের উপর বেশি মনোযোগী ছিলেন তিনি। নান্নু ভাই, আতহার ভাই যখন খেলার শেষদিকে তখন এমন ফিট করে তুললেন তাদের! তারা পরে আরও দুই বছর খেলেছিলেন। সততা তার কাছে অনেক বড় জিনিস ছিল। নতুন টিম হিসেবে আমাদের এগিয়ে যেতে গর্ডনের মতো একজন কোচই দরকার ছিল।
মেহরাব হোসেন অপি
গর্ডনের প্রভাব আমার মধ্যে ব্যাপক ছিল। আমি যখন খেলা শুরু করি, তখনই তাকে পাই। তার যে জিনিসটা আমার খেলায় সবচেয়ে কাজে দিত, সেটি মোটিভেশন। তার মোটিভেশন ছিল অসাধারণ। প্রতিপক্ষ যে-ই হোক না কেন, তার মোটিভেশন এমন ছিল যে ভালো টিম যেমন- অস্ট্রেলিয়া, ওয়েস্ট ইন্ডিজ তাদের চেয়েও আমাদের উপরে রাখার চেষ্টা করতেন, উৎসাহ দিয়ে। সেদিক থেকে অসাধারণ একজন কোচ।
একজন কোচের মধ্যে খেলোয়াড়কে মোটিভেটেড করার ক্ষমতা থাকতে হয়। সেটা গর্ডনের মধ্যে প্রবল ছিল। যতদিন ছিল তার কাজের আগ্রহ দেখে ভালো খেলার চেষ্টা করতাম। সেটা ছিল আমাদের মূল শক্তি, আমাদের ভাল খেলার অনুপ্রেরণা। ওই সময় তার বিদায়ে স্বল্প সময়ের জন্য আমাদের ক্রিকেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এভাবে বিদায় হোক সেটা চাইনি। ভালো মানুষ, ভালো কোচ ছিলেন, আমরা সেটাই মনে রাখতে চাই।
মিনহাজুল আবেদিন নান্নু
আমাদের স্মরণ করে তিনি এসেছেন এটা অনেক বড় ব্যাপার। তার হাত ধরে সাফল্যের ধারাবাহিকতায় আমাদের টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়া। সে হিসেবে এই স্মৃতি সবসময় থাকবেই। ভালো ভালো স্মৃতি আছে। কী ধরনের প্র্যাকটিস করতে হয় লংগার ভার্সনের জন্য সেটা তার কাছ থেকেই শিখেছি। বাংলাদেশর ক্রিকেট যতদিন থাকবে তাকে আমরা স্মরণ করবো। তার কাছ থেকে টেকনিক্যাল অনেককিছু শিখেছি। ব্যাটিংয়ে উন্নতি ঘটিয়েছি। আমার ব্যাটিং সবচেয়ে বেশি পছন্দ করতেন। ১৯৯৯ বিশ্বকাপের আগে ইংল্যান্ডে খেলার অভিজ্ঞতা আমারই বেশি ছিল। বোলিং মেশিনে এমন কিছু প্র্যাকটিস করিয়েছেন, যা আগে কখনই করিনি।
হাবিবুল বাশার সুমন
বাংলাদেশকে নিজের দল হিসেবেই দেখতেন। আমরা যখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিয়মিত নই, তখনই তার কাছে জেনেছিলাম কীভাবে খেলতে হবে। এমনভাবে কাজ করতেন, যেন বাংলাদেশ নিজের দল। বিশেষ একটা অনুভূতি ছিল। তাকে আবার দেখতে পেয়ে ভালো লাগছে।
মোহাম্মদ আশরাফুল
অনূর্ধ্ব-১২ দলের বিকেএসপিতে সাতদিনের ক্যাম্প ছিল। ১৯৯৮ সালের কথা। বিকেএসপিতে প্রথম পরিচয়। একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি- আনোয়ার হোসেন ছিলেন উইকেটরক্ষক। ক্যাচ দিয়ে বলতেন, সহজ ক্যাচ। কিন্তু ধরা আসলে কঠিন। বাতাসে দিক বদলে দুই-তিন হাত দূরে পড়ত। তখন ক্যাচিং নিয়ে শেখালেন। তার কোচিং ছিল অন্য উচ্চতার। বিকেএসপির ফুটবল গ্রাউন্ডের অ্যাস্ট্রোটার্ফে আমাদের কোচিং দিতেন। বল আসার সময় সুতার আওয়াজ উঠত। এত জোরে মারতেন।
তার ব্যাটিং ভিডিওতে দেখেছিলাম। প্র্যাকটিসে বুঝেছি কত জোরে মারতেন। পরবর্তীতে দেখেছি বুলবুল ভাই, আকরাম ভাইদের কী পরিশ্রম করাতেন। মাঠে ১৫ চক্কর রানিং করাতেন। সিট আপ, পুশ আপ অসংখ্যবার করাতেন। এসব দেখে ১২ বছর বয়সে বুঝতে পেরেছিলাম বড় ক্রিকেটার হতে হলে পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। তাকে দেখে সেই অনুপ্রেরণার কথা এখনও মনে পড়ে। মানুষ হিসেবে তিনি অসাধারণ।







