বাংলাদেশ

অমঙ্গল ঠেকাতেই মুখোশে নিষেধাজ্ঞা

অমঙ্গল ঠেকাতেই মুখোশে নিষেধাজ্ঞা

১৪২৩ শুরুর সকালে দেশ-জাতির মঙ্গলকামনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে পুরোদমে চলছে মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রস্তুতি।

শিশু খুন, ধর্মীয় উগ্রতা, নারীর প্রতি পাশবিকতার এই অসময়ে সব গ্লানি দূর করতে এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার মূল প্রতিপাদ্য রবিঠাকুরের মানবতার বাণী ‘অন্তর মম বিকশিত করো অন্তরতর হে’।

আয়োজনের এই প্রতিপাদ্য নির্বাচন ও জাতীয় পোস্টারটি ডিজাইন করেছেন চিত্রশিল্পী ও শিক্ষক শিশির ভট্টাচার্য।

কিন্তু মানবতার জয়গানে যে মঙ্গল শোভাযাত্রা, সে আয়োজনের নিরাপত্তা নিয়েও ভাবতে হচ্ছে এবার। গতবছরের বর্ষবরণের মতো অপ্রীতিকর কোনো ঘটনা এড়াতে সতর্ক রয়েছে আয়োজক ও প্রশাসন।

এবার মঙ্গল শোভাযাত্রায় কেউ যেনো মুখে মুখোশ পরে না আসে সেজন্য আয়োজকদের সুপারিশে মুখোশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নিষিদ্ধ করা হয়েছে ভয়ঙ্কর শব্দযন্ত্রণা ‘ভুভুজেলা’।

কিন্তু, কেনো মুখোশ পরতে মানা?

আয়োজকদের একজন খালিদ হাসান রবিন জানান, ‘শোভাযাত্রায় দেশের গণ্যমান্যরা ছাড়াও অনেক বিদেশীও আসেন। তারা শোভাযাত্রার সামনের দিকে থাকায় সেদিকে নিরাপত্তাকর্মীদের সজাগ দৃষ্টি থাকে। সাধারণ শৃঙ্খলার দিকটি দেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনসিসি ইউনিট এবং সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি দেখে পুলিশ। আর গোটা শোভাযাত্রায় নিজেদের মতো করে সমন্বয় বজায় রাখে চারুকলা পরিবার। মঙ্গল শোভাযাত্রায় মুখে মুখোশ পরার চল নেই। লোকজ আবহে আমরা যেসব মুখোশ তৈরি করি সেগুলো মুখে পরার মুখোশ নয়। তবে বাইরে থেকে কিন্তু প্রচুর মানুষ আসে, তারা মুখোশও পরে। সেক্ষেত্রে শোভাযাত্রায় কেউ অপ্রীতিকর কিছু করলে তাকে সনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়বে ভেবেই মুখোশ নিষিদ্ধের সুপারিশ করা হয়েছিলো।’

বিকাল ৫টার পর অনুষ্ঠানে নিষেধাজ্ঞায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া
বিকাল ৫টায় সকল উন্মুক্ত আয়োজনে সরকারি নিষেধাজ্ঞা নিয়ে কিছুটা দ্বিধান্বিত সাধারণ মানুষ। কিন্তু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আশা করছেন এই সিদ্ধান্তের ফলে এবার ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত ভীড় ছাড়া স্বাচ্ছন্দেই বর্ষবরণ করা যাবে।

নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আহমেদ জামিল সিয়াম বলেন, ‘এবার নিজেরা নিজেদের ক্যাম্পাসে বিড়ম্বনাহীন পহেলা বৈশাখ পেতে যাচ্ছি। ভুভুজেলা ও বিকাল ৫ টার পর বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বহিরাগতের প্রতি নিষেধাজ্ঞা জারি করায় এবার গতবারের মতো কোনো ঘটনা ঘটবে না।’

তবু মুখোশ!
বাঙালির শেকড়ের উৎসব বলে কথা। তাই শঙ্কার ধূসরতাকে ঢেকে দিচ্ছে চারুকলার নতুন-পুরোনো শিক্ষার্থীদের হাতে তৈরি বাঘ, পেঁচার লোকজ আবহের বর্ণিল মুখোশ।

চারুকলা অনুষদের গেট দিয়ে ঢুকতেই সেই কর্মযজ্ঞ চোখে পড়ে। জয়নুল গ্যালারির সামনে একটি লম্বা টেবিলে চলছে লক্ষ্মী সরা, মুখোশ, কাগুজে পাখি রাঙানোর কাজ।

একমনে বাঘের মুখের আদলে গড়া লোকজ মোটিফের মুখোশে কালো ডোরা কাটছিলেন চারুকলার শিক্ষার্থী জয়তু জাহান। জানালেন, ‘প্রথম বর্ষ থেকেই চারুকলার শিক্ষার্থীরা বৈশাখের জন্য মুখিয়ে থাকে। মনের তাগিদেই সবাই কাজ করে চৈত্র সংক্রান্তির গভীর রাত পর্যন্ত।’

স্পন্সর ছাড়া যে কর্মযজ্ঞ
চারুকলার প্রবেশমুখে অস্থায়ী স্টলে চলছে বিক্রিবাট্টা। মুখোশ, সরা, টি-শার্ট, জলরঙ-তেল রঙের পেইন্টিং বিক্রির টাকা দিয়েই মঙ্গল শোভাযাত্রার মতো বিশাল আয়োজনের কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। কারণ বরাবরের মতোই কোনোরকম ‘স্পন্সর’ ছাড়া নিজেদের অর্থায়নে এতো বড় আয়োজন করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার শিক্ষার্থীরা।

ঐতিহ্য অনুযায়ী এবারের প্রস্তুতির সমন্বয়ের দায়িত্বে আছে চারুকলার ১৭ তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। ওই ব্যাচের শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম জনি জানান, ‘আমরা কোনো স্পন্সরের ভরসায় থাকি না। নিজেরা যা পারি সেটা দিয়েই মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করি’।

বৈশাখ দরজায়, হাতে সময়ও বেশি বাকি নেই। কাজ চলছে দিন-রাত। আয়োজকদের ঘুম নেই। মুখোশ তৈরির কাজ কিছুদিনের মধ্যেই শেষ হবে। তবে বৃষ্টি বিড়ম্বনায় কিছুটা ধীরে কাজ চলছে চারুকলার লিচু তলায়। এখানেই তৈরি করা হয় মঙ্গল শোভাযাত্রার বিশালকার লোকজ মোটিফের বাঁশ-কাগজের অবয়বগুলো। প্রতিবারের মতো এবারও থাকছে একটি মূল মোটিফ। মায়ের সঙ্গে সন্তানের নিবিড় সম্পর্কের দিকটি ফুটিয়ে তোলা হবে ‘মা ও শিশু’ মোটিফের অবয়বে।

বাঁশের কাঠামোগুলো প্রায় শেষ। এরপর চড়বে কয়েক স্তরের কাগজের আস্তরণ। সবশেষে রঙিন কাগজ দিয়ে চূড়ান্ত ফিনিশিং। এভাবেই কাজ এগিয়ে যাবে চৈত্রের শেষদিনের গভীর রাত পর্যন্ত। সেসময় রীতি অনুযায়ী নিজেদের মতো করে উৎসবে মাতে চারুকলা। ঢাকের বাজনায় বছর বিদায় দেয়ার পরদিন সকালেই নেচে-গেয়ে নতুন বছরের শুভকামনায় হয় মঙ্গল শোভাযাত্রায়।

বিষয়:বর্ষবরণ ২০১৬

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…