ছোটকালে আমরা একটা বিশেষ উৎসবের দিনের জন্য অপেক্ষা করতাম, ঈদের দিনের জন্য অপেক্ষা। ভালো-ভালো খাবার, দল বেঁধে এ বাড়ি-সে বাড়ি যাওয়া, আকর্ষণীয় সব টিভি অনুষ্ঠানের জন্য অপেক্ষা! না, আমাদের ছোটবেলার সে উৎসব পালনে মধ্যে কোনো ধর্মীয় চেতনা কাজ কাজ করত না। আমরা ভিন্ন ধর্মের মানুষ হয়েও ঈদের দিনটির জন্য অপেক্ষা করতাম!
আসলে ছোট বেলায় আমরা খুবই ক্ষুদ্র-তুচ্ছ কিছুর জন্য অপেক্ষা করতাম। যেমন অপেক্ষা করতাম দুর্গাপূজার মেলা থেকে টমটম গাড়ি কেনার জন্য। ঢাকা শহরের ঘোড়াচালিত টমটম গাড়ি নয়, ছোট্ট সেই টমটম গাড়ি! আমাদের শৈশব তো টমটম গাড়ি পাবার উচ্ছ্বাসে আলোকিত! টমটম গাড়ি বানানো হত মাটির ছোট হাড়ির উপরে শক্ত কাগজ লাগিয়ে। হাড়ির দুই পাশে মাটির দুইটি স্বাস্থ্যবান চাকা থাকত। আর চাকার সঙ্গে সংযুক্ত থাকত দুইটা কাঠি। সুতলি দিয়ে বেঁধে টমটম গাড়ি চালাতে হত। টমটম গাড়ি চালালে চাকার সঙ্গে আটকানো কাঁঠি দুইটা শক্ত কাগজে ক্রমাগত আঘাত করত আর অটোমেটিক টং টং টং টং টং টং শব্দ হত। ভঙ্গুর এই গাড়িগুলো বিকট আওয়াজ তৈরি করত। বাড়ির বড়রা এই গাড়ির আওয়াজে বিরক্ত হতেন। আর আমরা এটা চালাতে পারলে যার পর নাই আনন্দ পেতাম! বড়দের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তাই দূর-নির্জনে গিয়ে এই টমটম গাড়ি চালাতাম!
সত্যি ছেলেবেলায় আমরা এই টমটম গাড়ির জন্যও অপেক্ষা করতাম! ঈদের জন্য অপেক্ষা করতাম, দুর্গাপূজার জন্য অপেক্ষা করতাম। কবে একটা বাসে চড়তে পারব, রেলগাড়িতে চড়তে পারব-সেই অপেক্ষা করতাম। তবে বিমানে উঠার কথা আমরা কল্পনাও করতে পারতাম না। তখন আমাদের আকাঙ্ক্ষারও একটা সীমা ছিল। আমরা সীমা ছাড়াতে পারতাম না!
আমরা বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারির জন্য অপেক্ষা করতাম। কেননা এই দিবসগুলোতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন হতো। সেসব অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ কিংবা দেখা-দুটোই ছিল আমাদের জন্য অনেক কাঙ্ক্ষিত। ছোটবেলায় কোনও বাসায় বিয়ের দাওয়াতের জন্যও অপেক্ষা করতাম, পেট পুরে পোলাও-মাংস খাবার লোভে! বর্ষায় নদী-খালে ইচ্ছে মতো ঝাঁপিয়ে স্নান করার জন্য অপেক্ষা করতাম। আরও পরে, কোনো বাসায় একটু টিভি-অনুষ্ঠান দেখা কিংবা সিনেমা হলে গিয়ে লুকিয়ে সিনেমা দেখার জন্য অপেক্ষা করতাম! একটু বড় হওয়ার পর প্রিয় বান্ধবীর সঙ্গে একটু দেখা করার, একটু কথা বলার অপেক্ষা! আরও কতকিছুর জন্য অপেক্ষা।
অপেক্ষা এখনও করি। তবে সেই টমটম গাড়ি, ঈদ কিংবা দুর্গাপূজা কিংবা আরও সামান্য বা তুচ্ছ সব বিষয়ের জন্য এখন আর অপেক্ষা করি না। এখন অপেক্ষার বিষয়গুলো পরিবর্তিত হয়েছে। বলা যায় অস্পষ্ট ও অনির্দিষ্ট হয়েছে। এখন যে আসলে কিসের অপেক্ষা করি-তা্-ই হয়তো জানি না। হতে পারে আরও ভালো কিছু, আনন্দময় কিছুর জন্য অপেক্ষা করি। যদিও তা সচরাচর ঘটে না। এখন বরং প্রতিনিয়ত খারাপ, অধিক-খারাপ ততোধিক খারাপ ছাড়া তেমন কিছু জীবনে ঘটে না! তবু অপেক্ষা করি, সুদিনের সুসময়ের।

`অপেক্ষা’ শব্দটি খুবই গভীর ও ব্যঞ্জনাময়। জীবন তো আসলে অনন্ত অপেক্ষারই নামান্তর। একটির পর আরেকটির জন্য অপেক্ষা। শেষ পর্যন্ত মৃত্যুকে আলিঙ্গনের জন্য অপেক্ষা। এই একটা শব্দের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে আশার টিমটিমে ঝাড়বাতি, আনন্দের ছোট্ট একটা প্ল্যাটফর্ম৷ কিছু একটা আসছে, কিছু একটা হবে, তার অপেক্ষা৷ তার জন্যে হা পিত্যেশ করে দিন গোনা, আরও একটা দিন পেরিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা৷
এই যে তীর্থের কাক হয়ে কাটিয়ে দেওয়া জীবনের এত এত দিন, কোনও না কোনও কিছুর জন্য অপেক্ষা করতে করতে, কী লাভ হয় তাতে? লাভ হয় একটাই৷ যা আসবে, যা এখনও আসেনি, তার কথা ভেবে মনটা ঝলমল করে ওঠে৷
পরীক্ষার সময় ছুটির অপেক্ষা, গ্রীষ্মকালে বৃষ্টির অপেক্ষা, অনাচারের দিনকালে সুবিচারের অপেক্ষা, প্রিয়জনের সান্নিধ্যের অপেক্ষা…এই লিস্টি তো অন্তহীন৷ আর বৃষ্টি হোক বা প্রিয়জনের একান্ত সান্নিধ্য, পেয়ে যত সুখ, পাওয়ার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত তাকে পাওয়ার কথা ভেবে আনন্দ কিছু কম নয়৷ যে-মুহূর্তটুকু সে আছে, সেটুকু অসামান্য৷ তার পরেই তো বিচেছদ৷ তার চেয়ে বাবা আগের সময়টাই ভালো৷ আসেনি, কিন্তু আসবে ভেবে নিজেকে খুশি রাখার একটা জুতসই বাহানা অন্তত পাওয়া যায়৷
কত মানুষ অপেক্ষা করে করেই তো কাটিয়ে দিয়েছে সারা জীবন৷ কত মরুভূমি বৃষ্টির অপেক্ষায় পড়ে থেকেছে হাজার বছর৷ কত ডুবন্ত জাহাজ অপেক্ষা করেছে সাহায্যের৷ হয়তো শেষমেশ পায়নি, কিন্তু তাতে অপেক্ষার ওই টিমটিমে ঝাড়বাতিটা কোথাও মিথ্যে হয়ে যায় না৷ বিফল হয়ে যায় না রাতের পর রাত জেগে থাকা, রোদের পর আরেকটা রোদে দাঁড়িয়ে পুড়ে যাওয়া৷
আর অপেক্ষার গাছে যদি মেওয়া ফলেই যায়, তা হলে তো কেল্লা ফতে৷ চাওয়াও হল, পাওয়াও হল৷ রবি ঠাকুর সেই যে লিখেছিলেন, ‘আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ’৷ কী চমৎকার এক লাইনে সার কথাটি বলে দিয়েছেন৷ সে-পথে কেউ আসবে হয়তো কোনদিন, কিন্তু চেয়ে যে আছি আমি, তাই বা কম কী?
আমাদের সকলের জীবনেই তেমনভাবে জেগে রয়েছে অপেক্ষার শহর৷ সেখানে কেউ আসবে, কথা বলবে, আবার চলেও যাবে সেখান থেকে৷ কিংবা হয়তো আসবেও না কোনদিন৷ কিন্তু শহরটাকে সাজিয়ে গুছিয়ে রেখেছি আমরা সকলেই৷ যার যার বুকের এক কোণে৷ তার নিভন্ত আলোর জৌলুসই আলাদা, তার ধুলোমাখা রাস্তার আমেজই অন্যরকম৷
কিন্তু, অপেক্ষাকে কী করে জিইয়ে রাখা যায়? যার জন্য অপেক্ষা, এমনকি তাকে হাতে পেয়ে যাওয়ার পরেও? মানে, হাতে পাওয়া এক মুহূর্তকে টেনে আরও একটু লম্বা করা যায় কোন কৌশলে? তার পথ বোধহয় জানে কেবল ছোটরাই৷ আমরা প্রত্যেকেই তা জানতাম, যখন ছোট ছিলাম৷
সেই যে শবেবরাতের রাতে চালের রুটি আর মুরগির মাংস, ঈদে সেমাই-পায়েস কিংবা পোলাও-মাংস খাওয়া, দুর্গাপূজায় নতুন জামা পরে ঘুরে বেড়ানো, লুচি-লাবড়া-খিচুড়ি-মুড়কি-খই নাড়ুর মধ্যে `অমৃতের স্বাদ‘ পাওয়া এবং তার জন্য ব্যাকুল হওয়া!
কৈশোর-যৌবনে অপেক্ষা করতাম `দেশ‘ পত্রিকার পূজাসংখ্যার জন্য৷ বিচিত্রার ঈদসংখ্যার জন্য। বর্ষার টিপটিপ আকাশ থেকেই আমরা দেখতে পেতাম শরতের ঝিলিক৷ পূজা আসছে৷ এই তো, আর মোটে সাড়ে তিন মাস৷ একটা অদৃশ্য কাউণ্টডাউনের খেলা কখন যেন শুরু হয়ে যেত আপনা থেকেই, টের পেতাম না৷ এবার কার কার লেখা থাকবে সেসব সংখ্যায়, সঞ্জীব না সুনীল, হুমায়ুন না সেলিনা হোসেন কার লেখাটা আগে শেষ করব, কোনটা ধরব এক্কেবারে শেষে, সেইসব ছেলেমানুষি হিসেব কষেই পেরিয়ে যেত কতনা দুপুর-সন্ধ্যা-রাত!
প্রতিটা উৎসবের আগেই আমরা অপেক্ষা করা শুরু করে দিতাম। সেই অপেক্ষার কোনও তুলনা ছিল না৷ প্রত্যেকটা সকালকে নতুন করে ভালো লাগত, কারণ সেই অপেক্ষা উৎসবের দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে দিচ্ছে রোজ৷ কোনও কিছুর প্রতি এই আকর্ষণ আর এই পরিমাণ আচ্ছন্নতা এখন আর নেই বোধহয়৷
তখন আমরা ভালো খাবারের জন্য অপেক্ষা করতাম। অপক্ষো করতাম ভালো পোশাকের জন্য। হই-হুল্লোড় ও বেড়ানোর জন্য। টেলিভিশনের ঈদ-অনুষ্ঠানের জন্য। হানিফ সংকেত ও আনিসুল হকের ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান দেখার জন্য। মমতাজ উদ্দিন কিংবা আমজাদ হোসেনের নাটক দেখার দেখার জন্য।
অপেক্ষা তখনও করতাম, এখনও করি। শুধু অপেক্ষার ধরনটা বদলে গেছে। তবু অপেক্ষা করতে ভালো লাগে। আসলে তো আমরা সকলে ভেতর থেকে এইরকমই৷
কোনও কিছুকে হাতে পেয়ে যাওয়ার চেয়ে তাকে পাওয়ার অপেক্ষাটুকু অনেক বেশি উপভোগ করি, তারিয়ে তারিয়ে৷ সেই উপভোগের নানা উপায় আমরা নিজেরাই আবিষ্কার করি, নিজেরাই চমৎকৃত হই তাতে, আর মনের বিরাট জায়গা জুড়ে টাঙাতেই থাকি বিশাল এক অপেক্ষার তাঁবু৷ যদ্দিন সেই তাঁবুতে রাত কাটানো যায়, তদ্দিনই তো ভালো৷ আশ মিটে গেলে তাঁবু গুটিয়ে ফের রওনা দিতে হবে, পরের অপেক্ষার শহরটার দিকে…৷
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








