তিতলীর সমস্যাটাকে ঠিক সমস্যা বলা যায় কি না, তা নিয়ে একটা বড় আলোচনা হতে পারে। যে পথটা অনায়াসে সবাই হেঁটে পার হয়, সেখানে সে অকারণেই দৌড়োতে থাকে, হাতে হয়তো একটা ছোটো বাটি কি একটা পেয়ারা বা কুল আছে- তাই নিয়ে লোফালুফিতে মেতে ওঠে, কখনো কখনো অদ্ভুতভাবে হাসতে থাকে—কোথায় কার দিকে তাকিয়ে কিংবা কেন সেটা সে ছাড়া আর কেউ জানে না। তিরিশ পেরোনো একজন নারীর পক্ষে এতটা ঠিক কি না— সেটা জ্ঞানী-গুণিরা বলবেন। ওর আবার বাচ্চাও আছে একটা। বছর দুয়েক মতো বয়স হবে।
তিতলী অবশ্য কে কি ভাবছে সেটা নিয়ে খুব একটা চিন্তা-টিন্তা করে না। পৃথিবীটা কে ও ওর মতো করে উপভোগ করতে চায়। কি কি যেন সব বলেও। আমি আর কথা না বাড়াই। ওর কথা ও–ই বলুক।
“সেদিন বাড়ি ফেরার সময়, ওই যে কলাবাগানের দিকে যে গলিটা আছে, দেখি তার মুখে ফলওয়ালা মামা বসে আছে। ওর পেটটা দেখেছ? কি আর বলব! কি মোটা পেট বাপরে! আমাকে দেখেই আপা বলে জোরে হাঁক দিল। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে যাচ্ছি – হঠাৎ থামতে হলো। এমন অদ্ভুত স্নিগ্ধ শা¯ত্ম আলো আমার পায়ের বুড়ো আঙুলে— ঠিক এই জায়গাটায় এসে পড়ল! তারপর একটা একটা করে রোমকূপ হয়ে গোটা শরীর ছুঁয়ে গেল! মনে হলো অদৃশ্য কোনো জায়গা থেকে অবিরাম আমার ওপর আলোর ঝর্ণাধারা ঝরছে। আমি চোখ বুঁজে কান পেতে থাকলাম। আচ্ছা কেউ কি হারমোনিকা বাজাচ্ছিল? উফফফফ! কি করব তখন আমি! কী-ই বা করার আছে আমার।”
১২ জুলাই, বেলা ৩টা। তিতলী কলাপসিবল গেট খুলে অকারণেই তড়িঘড়ি ঘরে ঢুকতে যায়। কানে তখনও অবিশ্রান্ত ভাবে বেজে চলেছে সেই সুর। বেজেই যাচ্ছে, এখনও। আচ্ছা ওটা কি হারমোনিকা ছিল? না কি বেহালা? বেহালা মানেই তিতলীর কাছে কাঠের সিন্দুকে অনেক অনুভূতি নিয়ে আটকে থাকা কোনো হৃদয়। চাবির জন্য ব্যাগ হাতড়ায় সে। যা ভেবেছিল, ঠিক তাই। চাবি নেই। খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এ নিয়ে গত দু মাসে তিনবার চাবিওয়ালা ডাকতে হয়েছে। ভাল্লাগে না আর তিতলীর। যাক বুয়া চলে এসেছে।
“চাবি হবে, সাজেদা? কোহিনূর আছে তো বাবুর কাছে?”
“সামনের ঘরের দরজা তো খোলা। আপনি এদিক দিয়ে না ঢুকলেই হতো। বাবু ভালো আছে। বাজারে যাওয়ার আগে দেখলাম গোসল করাচ্ছে।”
“ফলগুলো এনেছ তো?”
“সব রেডি ভাবি, একদম সব। আপনাকে কিচ্ছু চি¯ত্মা করতে হবে না। শুধু মেহমান আসার আগে আপনি একটু তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে যান।”
“আমি জামা-কাপড় ছাড়ার আগেই তোমাকে একটা জিনিস দেখিয়ে দিতে চাই। ফলগুলো একটু নিয়ে এসো, না সাজু!”
তিতলীদের ধানমন্ডির দোতলা বাড়িটায় সন্ধ্যা নেমে আসছে। পুরনো বনেদী বাড়ি। নামটাও বেশ ‘ফোটা ফুল’। খাবার ঘরটায় আজ রীতিমতো ঠান্ডা। কিন্তু এই ঠান্ডা কি তিতলী পরোয়া করে? ও সোয়েটার, মাফলার সব ডিভানে ছুড়ে দিয়ে পাশেই এলিয়ে দিল গা টা। সোয়েটার টোয়েটার তিতলীর খুব একটা ভালো লাগে না, কেমন একটা দমবন্ধ ভাব হয়। অবশ্য সোয়েটার খুললেও বিপদ, হাতটা কেমন যেন ঠান্ডা হয়ে আসছে।
নাহ। ঠান্ডা ভাবটা খুব বেশি সময় টিকল না। আবারও হঠাৎ সেই স্নিগ্ধ আলোর উত্তাপের রেশ। তিতলী খুব ধীরে নিঃশ্বাস নিচ্ছেে। শরীরের উত্তাপটা এখন বুকের মাঝখানটায়। জানালার গ্লাসের ওপর চোখ পড়ে তিতলীর। একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে, বছর তিরিশেক বয়স, উজ্জ্বল চেহারা, উজ্জ্বলতর চোখ, ঠোঁট দুটো কাঁপছে, কান দুটো প্রস্ত্তত কিছু শুনবে বলে।
কিছু একটা ঘটবে আজ । তিতলীর মন বলছে। নতুন কিছু? ঐশ্বরিক কিছু? এমন কিছু যা সে কোনো দিন ভাবেনি বা শোনেনি? তিতলী বসার ঘরের দিকে এগোয়। জানালার গস্নাসের ওপর কামিনী গাছটা ফুলের ভারে নুয়ে পড়েছে। এমন ভরভর¯ত্ম চেহারা ওটার!
ওই সাজু এলো। একটা ট্রে তে ফল, সঙ্গে একটা নীল রং এর বড় বাটি।তার চারপাশে রম্নপোলি কারম্নকাজ করা। ফলটা তিতলী নিজেই সাজাতে চায় আজ।
“ভাবি আলোগুলো জে¦লে দেব?”
“নাহ! বাদ দাও। পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি।”
সাজুকে মনে মনে ধন্যবাদ দেয় তিতলী। কতজাতের ফল যে যোগাড় করেছে। স্ট্রবেরি, হলদে রং এর নাশপাতি। সচরাচর এমন নাশপাতি দেখা যায় না, গা টা এত মসৃণ। সবুজ রং এর আঙুর আছে, লাল টকটকে আপেল। টেবিলের ওপর নীল রং এর বড় বাটিটায় যখন এই ফলগুলো রাখা হবে কি দারম্নণ যে দেখাবে। এক এক করে ফলগুলো বাটিতে সাজিয়ে রাখে তিতলী। একটু দূর থেকে দেখে ঠিক কেমন লাগছে।
“ওয়াও। সত্যিই সুন্দর।”
সাজু তাগাদা দেয়।
“যান তো ভাবি, রেডি হন। ভাইয়া এসে আপনাকে এ অবস্থায় দেখলে রাগ করবে।”
ইচ্ছের বিরম্নদ্ধে ধুপধাপ শব্দে দোতলায় উঠে যায় তিতলী। গ¯ত্মব্য মাস্টার বেড়রম্নম। কিন্তু সেখানে ঢোকার আগে তো পাশের ছোটো ঘরটায় ঢুকতেই হবে। তিতলীর একমাত্র মেয়ে প্রজাপতি আছে সেখানে। কোহিনূও খাওয়াচ্ছে ওকে। কি যে মজার হয়েছে মেয়েটা। ছোটো ছোটো চুল এমন চূড়ো করে বাঁধা প্রজাপতির, দেখেই হাসি পাচ্ছে।
“এখন খেয়ে নাও প্রজাপতি। ছোটো সোনা মেয়ে। তুমি লক্ষ্মী মেয়ে না?”
“ও লক্ষ্মী হয়ে ছিল তো কোহিনূর?”
“একদম। আমরা বিকেলে নিচে নেমেছিলাম। বড় কুকুরটা আমার হাঁটুতে মুখ ঘসছিল। প্রজাপতির কাণ্ড যদি দেখতেন, এত্ত বড় কুকুরটার কান ধরে সে কি টানাটানি ওর।”
তিতলীর একটু ভয়ই লাগে। অত্ত বড় কুকুরটার কান ধরে টানাটানি! কোহিনূরকে মাঝে মাঝে তিতলীর হিংসে হয়। এই যেমন এখন। মনে হচ্ছে ও একটা বড়লোকের মেয়ে। একটা আসত্ম পুতুল ওর কাছে। আর তিতলী! কি গরীব। দূর থেকে শুধু পুতুল টাকে দেখতে পায়। ছুঁতে পারে না।
ঠিক এই সময়েই প্রজাপতি তিতলীর দিকে তাকিয়ে এমনভাবে হাসল, আনন্দে চোখে পানি এসে গেল ওর।
“কোহিনূর তুমি যাও এখন, প্রজাপতিকে আজ আমি খাওয়াবো।”
“খাওযানোর সময় হাত বদল হলে বাচ্চাদের খাবারের রম্নচি থাকে না, ভাবি।
কি আশ্চর্য! তাহলে আর মা হওয়ার দরকারটা কি! বাচ্চা যদি মন চাইলেই ছুতে না পারি? নাহ রায়হান কে আজই বলতে হবে। এসব নিয়ম আমার একদম ভালো লাগছে না আর। বাচ্চাটাও তো বেহালার মতো, না? ওরও তো মন আছে একটা না, কি?
এসব কথা অবশ্য তিতলী মুখে উচ্চারণ করে না, মনে মনে ভাবে। কি বুঝে কেহিনূর চলে যায়। প্রজাপতির চোখটা এখন আনন্দে চিকচিক করছে। খুশি খুশি মুখে খায় সে। চামচটা দাঁতে চেপে ধরে কখনো কখনো। যেন বলতে চায়, ‘ছোট্টো হলে কি হবে। আমার কত শক্তি দেখ।’
“ভাবি আপনার ফোন। ভাইয়া চাচ্ছে। বলল, জরম্নরি।”
উফ আবার কোহিনূর। ছোঁ মেরে এবার প্রজাপতিকে নিয়ে যাবে। নিলোও।
“হুঁ। বল, রায়হান।”
”তিতলী শোনো, কাজ পড়ে গেছে। একটু দেরি হতে পারে।এই ধরো ডিনার সার্ভ করার মিনিট দশেক আগে-পরে চলে আসব। ওদিকটায় সব ঠিক আছে তো। একটু ম্যানেজ করে নিও!”
“একদম ঠিক আছে, তুমি কিচ্ছু ভেবো না। ও..রায়হান!”
“বল”
“নাহ। কিছু না”।
মাঝে মাঝে চুপচুাপ রায়হানের সঙ্গটা উপভোগ করতে চায় তিতলী। রায়হান কি বোঝে? হঠাৎ হঠাৎ যে স্বর্গীয় আশীবার্দের স্পর্শটা উপভোগ করে তিতলী একা, সেটার কিছুটা ভাগ সে দিতে চায় রায়হানকে। এটা নিয়ে অনেকবার কথা বলার চেষ্টাও করেছে ওর সঙ্গে। ও খুব একটা পাত্তা দেয়নি। ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তিতলীর বুক থেকে। থাক এমন দিনে তিতলী এসব ভাবনা ভাববে না আর।
আসলে আজ তিতলীদের সপ্তম বিবাহবার্ষিকী। কথায় বলে না সাত বছর যে সংসার টিকে থাকে সেটা আর ভাঙে না। সপ্তম বছর বলেই আয়োজনের ঘনঘটা আজ একটু বেশি। বাসায় অনেক অতিথি আসছে। মোর্শেদ আর লায়লা আসছে। এত সুন্দর একটা জুটি ওরা। থিয়েটার ছাড়া কিছুই বোঝে না। আসিফও আসছে। ওর একটা বই বেরিয়েছে। এবারের বইমেলায় সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে ওই বইটা। ফেব্রম্নয়ারী গড়িয়ে মার্চ এসে গেল, কবিরের দাওয়াত খাওয়া আর শেষ হয় না। আর আসছে তিতলীর একটা বন্ধু, অহনা। অহনা যে ঠিক করে, সেটা সম্পর্কে তিতলীর খুব একটা ভালো ধারণা নেই। একটা পার্টিতে পরিচয়। আর তিতলী স্রেফ সঙ্গে সঙ্গেই ওর প্রেমে পড়ে গেল। অবশ্য এটাই প্রথম নয়। একটু অদ্ভুত চরিত্রের সুন্দরী মেয়ে দেখলেই তিতলীর প্রেমে পড়ে যাওয়ার বাতিক আছে। এবারেরটা অবশ্য একটু কেমন যেন, আলাদা ধরনের।
সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সেই প্রথম পরিচয়ের পর অহনার সঙ্গে আরও বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছে। কিন্তু ও কেমন যেন নিজের সম্পর্কে কিছুদূর বলার পর আর আগায়না।
আচ্ছা, এরপর আর কি আছে অহনার? কি লুকোয় ও? সেদিন রাতে শোয়ার আগে রায়হানকে তিতলী ব্যাপারটা বলতে শুরু করেছিল। হাই তুলতে তুলতে রায়হান বলল, সব সুন্দরীরাই এমন ‘ডাল’ হয়, নিরামিষ টাইপ। হয়তো রক্তস্বল্পতা আছে। নয় তো কিডনিতে পাথর ।’
“নাহ, কিছু জিজ্ঞেস করলে অহনা ঘাড়টা একটু হেলিয়ে এমন অদ্ভুত একটা হাসি হাসে। নিশ্চয়ই এ হাসির একটা মর্মার্থ আছে। কি সেটা একদিন না একদিন বেরোবেই।”
“যেদিন বেশি হাসে সেদিন বুঝবে ওর রাতে ভালা ঘুম হয়েছে, পেট ভালো। বদহজম ছিল না।” হেসে কুটিকুটি হয় তিতলী। আচ্ছা রায়হান এত নির্বিকার থাকে কি করে? অবশ্য এই বেশ ভালো। সুন্দরী দেখেও রায়হান যে এত নির্বিকার থাকে এটা বেশ স্বস্তি দেয় তিতলীকে।
ইশশশ। ঘড়িটা আজ দৌড়ুচ্ছে। এবার একটু সাজগোজ করতে হয়। অতিথিরা এলো বলে।
চট করে বসার ঘরে ঢোকে তিতলী। শেষবারের মতো খুঁটিনাটি দেখে নেওয়া এই আর কি। সাজু সবকিছু এত গুছিয়ে রেখেেছে। নাহ, সব কুশন কে কেন জায়গা মতো থাকতে হবে। কুশনগুলো এবার ইচ্ছে মতো ছুড়ে ফেলতে শুরু করে তিতলী। শেষ কুশনটা ছোড়ার আগে কি মনে করে বুকে চেপে ধরে ও। ওর বুকের ভেতর আগুনের নরম যে শিখাটা জ¦লছে সেটা দিয়ে জড় বস্ত্ততে প্রাণ দিতে চায়। নাহ! সে আর পারছে না।
ওদের বাড়ির এই বসার ঘরটার লাগোয়া একটা বেলকনি আছে। বাগানের দিকে মুখ করা। একদম কোণার দিকে কামিনী গাছ। থোকা থোকা ফুলে ভরে গেছে। এই সেদিন কত্তটুকুন ছিল গাছটা। আজ কেমন ভর ভরন্ত চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক মানুষের জীবনটা যেমন একটা চক্রের মধ্য দিয়ে পার হয়- প্রথমে ভ্রূণ, ভ্রূণ থেকে মানব শিশু, তারপর নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে শৈশব-কৈশোর-তারম্নণ্য-যৌবন। একটা সময় মানুষ বুঝতে পারে সে এখন পরিণত। গাছটাও যেন তেমনি। বৈশাখের ঝড়, শ্রাবণের অঝোর বৃষ্টি, মাঘের কনকনে ঠান্ডা সব কিছুকে হারিয়ে এখন কেমন প্রশা¯ত্ম পরিণত চেহারা পেয়েছে।। কামিনী গাছটার গা ঘেঁষে আর কত যে গাছ। থোকা থোকা ফুলে ভরে গেছে। মনে মনে ঈশ্বর কে ধন্যবাদ জানায় তিতলী, খালি গলায় গুনগুনিয়ে গায়, ‘আমারে তুমি অশেষ করেছ, এমনি লীলা তব। ফুরায়ে ফেলে আবার ভরেছ, জীবন নব নব।’
হঠাৎ, একদম হঠাৎ, ছবির মতো দৃশ্যটা লন্ডভন্ড হয়ে গেল। একটা ধূসর রঙ এর বেড়াল কোথ থকে ভুড়ি দুলিয়ে দুলিয়ে বাগানের ছোটো ভাটো আদুরে গাছগুলো কে মাড়িয়ে গেল। পেছনে আবার একটা কুচ্ছিত কালো বেড়াল। মনে হলো কালো বেড়ালটা যেন ধূসর ওই বেড়ালটারই ছায়া। কেন কি জানি কেঁপে উঠল তিতলী।
“বেড়ালগুলো এমন কেন! ইশশশ! গা গুলাচ্ছে। কেন ওরা? এমন একটা দিনে ওরা?” গজগজ করতে করতে তিতলী ওপর-নিচ করে। নাহ! এভাবে বসে থাকলে হবে না। ও দু হাত দিয়ে চোখ ঢাকে। বুকের ভেতরের নরম আলোটা কে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করে, তারপর নিজকেই নিজে বলে, ‘আমি এত সুখী। এত সুখী।” নিজের জীবনটা যেন আজ ভর ভর¯ত্ম কামিনী গাছটার মতো।
সত্যিই তো। তিতলীর নিখাদ একটা জীবন। বয়স তিরিশের কোঠায়। লোকে দেখলে আরেকটু কমই মনে করে। রায়হানের সঙ্গে ওর বোঝাপড়াটা এত ভালো। দুই বছরের প্রজাপতি—ওদের একমাত্র স¯ত্মান। প্রতিবছর গরমের ছুটিতে দেশের বাইরে ট্যুরে যায় ওরা। টাকা-পয়সার কোনো অভাব নেই। এত্ত বড় বাগানবাড়ি এই যুগে ঢাকা শহরে রীতিমতো অচি¯ত্ম্যনীয়। আর বন্ধু-বান্ধব? লা-জওয়াব। মনমানসিকতায় আধুনিক , কেউ লেখক, কেউ আঁকিয়ে , কেউ কবি, কেউ এনজিও তে চাকরি করে গরীব-দুঃখ দেও কথা ভাবে—মানে ঠিক যেমন বন্ধু ওদের ভালস্নাগে ঠিক তেমন সবাই। তারপর বিরাট লাইব্রেরি আছে বাড়িতেই, গানের কালেকশন? ঈর্ষণীয়! আর যে দরজিটা ইদানিং কাপড়-চোপড় বানাচ্ছেও ও-ও তো এই শহরে সেরা, ওদের যে বাবুর্চি ওর মতো ভালো কাস্টার্ড কেউ বানাতে পারে না।
‘আর কি চাই আমার? আর কি?’ মাথাটা হঠাৎ ঝিমঝিম করে ওঠে তিতলীর। ফাগুন মাসটায় কেন যেন এমন হয়। পরিশ্রা¯ত্মও লাগে তিতলীর। হাতে তেমন সময় নেই। এবার রেডি হতে হবে।
ওয়্যারড্রোব থেকে সাদা শাড়িটাই নামায় তিতলী। এর সঙ্গে মিল করে নীলা পাথরের নেকলেস আর কানের দুল। ব্যস, এটুকুই। ওতেই চলবে।
ওহ মোর্শেদ আর লায়লা চলে এসেছে। তিতলী জড়িয়ে ধরল লায়লা কে। ওর গায়ে এত মজার একটা কমলা রং এর জ্যাকেট। জ্যাকেটের নিচের দিকটায় আর হাতায় অনেকগুলো বাঁদরের ছবি। লায়লা অবশ্য এসেই মধ্যবিত্তের ওপর রাগ ঝাড়তে লাগল, ‘আচ্ছা তিতলী বল, আমি যদি বাঁদর ছাপা জামা পরি তাতে অন্যের কি? এই মিডলক্লাসরা নিজেদের ঘেরাটোপের বাইরে কেন যেন বেরোতে পারে না। রাসত্মায় ট্যাক্সিও জন্য দাঁড়িয়েছি, সবাই এমন ভাবে তাকাচ্ছে যেন বাঁদরগুলো জ্যান্ত। আমার শরীর থেকে টপ করে ওদের গায়ে উঠে নাচতে শুরু করবে।”
মোর্শেদ এতক্ষণ চুপ করে ছিল, এবার মুখ খুলল।
“সবচেয়ে মজা হয়েছে, যখন তুমি ওই যে নীল শাড়ি পরা মহিলাটাকে বললে, হাঁ করে গিলছেন কি? জীবনে কখনও বাঁদর দেখেননি? ”
তিতলী খুব কষ্টে নিজেকে আটকালো। কমলা জ্যাকেটটা খোলার পর দেখা গেল লায়লা ঠিক সাগর কলার যেমন রং হয় ঠিক সে রং এর একটা ফতুয়া পরেছে। ওকে আদতে একটা বুদ্ধিমান বানরের মতোই দেখাচ্ছে।
আবার কলিং বেল বাজছে। ওই বুঝি আসিফ এলো। হ্যাঁ আসিফই। সবসময় কবিতার ঘোরেই থাকে।
‘আমি কি ঠিক বাড়িতে এসেছি?’
উজ্জ্বলমুখে তিতলী বলে, ‘নিশ্চয় কবি। তুমি ঠিক বাড়িতেই এসেছ।’
“আমার আসলে সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। এমন একটা ট্যাক্সিওয়ালার পালস্নায় পড়েছিলাম। যত বলি আস্তে চালাও, তত জোরে চালায়। আমাকে ভয় পাইয়ে কি যে মজা পেল বুঝলাম না।” কাঁধ ঝাকিয়ে বলল আসিফ। গলায় আজ সিল্কের একটা স্কার্ফ বেঁধেছে, সাদা রং এর। মোজাটাও একই রকম সাদা।
“ঠিক কতটা ভয়ঙ্কর ছিল আসিফ?” তিতলীর প্রশ্ন।
“আর বোলো না! মনে হলো আমি এমন এক ট্যাক্সিতে উঠেছি যেটা কখনও তার গ¯ত্মব্যে পৌঁছাবে না। শুধু ঘুরতেই থাকবে। তারওপর মাথার ওপর এত্ত বড় একটা চাঁদ। ট্যাক্সিতে উদ্ভট ওই চালকটা ছাড়া আর কেউ নেই। বোঝো তাহলে।”
মোজাটা এতই সুন্দর যে লায়লারও নজর কাড়ল।
“ও মা, আসিফ। কোথ থেকে পেলে এই মোজাটা। আমার জন্যও এক জোড়া দেখ না। কি সুন্দর।”
“লায়লা, মোজাটা তোমার ভালো লেগেছে জেনে আমারও খুব ভালো লাগছে জানো। আসলে হয়েছে কি — চাঁদটা ওঠার পর থেকেই আমার মোজাটা এমন উজ্জ্বল হতে শুরু করল।” লায়লার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে আসিফ এবার তিতলীর দিকে ফিরে বলল, ‘একটা চাঁদ উঠেছে আজ দেখেছ?”
তিতলীর চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হলো, ‘দেখেছি-দেখেছি-প্রায়ই দেখি, আজ যেমন দেখলাম।’
আসিফ সত্যিই আজকের অতিথিদের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয়। মোর্শেদকেও সুদর্শন বলা চলে। লায়লা একটা সিগারেট ধরালো এবার। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল, ‘তো তিতলী, তোমার স্বামী কোথায় হে।”
মুখের কথাটা শেষ হওয়ার আগেই সদর দরজা খোলার শব্দ। রায়হান এসে গেছে।
“হ্যালো! এই যে আমি চলে এসেছি। পাঁচ মিনিট। জামাটা ছেড়ে এক্ষুণি আসছি”। দুদ্দার করে উঠে গেল রায়হান। স্বামীর দিকে সপ্রশংশ চোখে তাকায় তিতলী। কেন যে এত হুড়োহুড়ি কেিও লোকটা। পাঁচ মিনিট দেরি হলে কি হবে এমন। এমন ভাব কেয়ও যেন পাঁচ মিনিটে দুনিয়ায় একটা দারম্নণ ওলট পালট হয়ে যাবে।
ওায়হান হলো এমন একটা ছেলে যে জয় ছাড়া কিছুই শেখেনি। জীবনে যত বাধা-বিপত্তিই আসুক ও চ্যালেঞ্জ করবে, এবং জিতবেও। রায়হান কে কাপড়-চোপড় এগিয়ে দিতে উঠে যায় তিতলী।
“জানো, অহনা কিন্তু আসেনি।”
“আমি জানতাম। ফোন করেনি? তুমি মনে করিয়ে দিতে না হয় একটু।”
“ওই যে গাড়ির শব্দ পাচ্ছি। এসে গেছে বোধ হয়। ও তো আজকাল গাড়িতেই থাকছে।” এটুকু বলেই রায়হানের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় একটা হাসি হাসে তিতলী। এই হাসিটা অবশ্য রায়হানের অপরিচিত নয়। যে কোনো নারীর সঙ্গে নতুন বন্ধুত্ব হলে ঠিক এই ভঙ্গিতেই হাসে ও।
“আচ্ছা! তাহলে তিনি আজকাল গাড়িতেই থাকছেন। মুটিয়ে যাবেন তো! সুন্দরীদের সিস্নম থাকা বাধ্যতামূলক। তা তোমার বান্ধবী যদি তা না চান..” রায়হান তিতলিরকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করল।
“ রায়হান, না! এখন না। প্লিজ। নিচে অতিথিরা অপেক্ষা করছে।”
“ঠিক আছে, ম্যাডাম।”
দুজনই নেমে আসে নিচে। অতিথিরা তখন আড্ডা দিচ্ছে। নানা বিষয়ে। হৈ হুলেস্নাড়, হাসাহাসি। এর মধ্যেই এসে ঢুকল অহনা। ধূসর রং এর শাড়ি গায়ে, চুলটা হাতখোঁপা করা। ঘাড়টা সামান্য হেলিয়ে অহনা তার বিখ্যাত হাসিটা হাসল।
“দেরি করে ফেলেছি, না?”
“নাহ, একদম না।” তিতলী বলে। তারপর হাত ধেসও নিয়ে যায় খাওযার ঘরে।
অহনার হাতটা যেন কেমন ঠান্ডা। ওর স্পর্শে তিতলীর বুকের ভেতর জমে থাকা কম আঁচের আগুনটা কেমন যেন দপ করে জ্বলে উঠল। সইতে পারছে না তিতলী। কিন্তু অহনা নির্বিকার। ও দেখছে না। কারো দিকে ও কখনো সরাসরি চোখে তাকায় না। ওর চোখের প্রায় অস্বাভাবিক পাপড়িগুলো যেন চোখের ওপরই ছায়া ফেলেছে, আর অদ্ভুত হাসিটা দেখে মন হয়, ও বোধ হয় দেখে না, শুধু শোনে। নাহ। তিতলী আজ অহনার দিকে তাকিয়েই থাকবে। কতক্ষণ সময় কেটে গেছে কেউ জানে না। অল্প দূেও অহনা। হঠাৎ চোখ তুলে তিতলীর দিকে তাকায় সে। কি আছে দৃষ্টিতে, তিতলীর বুকের ভেতর কেমন একটা করে উঠল। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হলো, “ও তুমিও?”
চোখ সরিয়ে নিল অহনা। সে এখন ধূসর রং এর বাটিতে লাল রং এর স্যুপ খুব তৃপ্তির সঙ্গে চামচে তুলে একটু একটু করে মুখে দিচ্ছে।
আর বাকিরা? কোনো দিকে তাকানোর ফুরসৎ নেই। তাদেরও চামচ উঠছে, মুখ নড়ছে, বাটি ভরছে, খাওয়া চলছে। কথা বার্তাও চলছে ফাঁকে টুকটাক।
‘ও তো শুধু আমার জন্যই একটা নাটক লিখতে চেয়েছিল। এক অঙ্কের। একটাই চরিত্র। আত্মহত্যা করতে চায়। সেই চরিত্র গড়গড় কোও বলে যাবে. কেন তার আত্মহত্যা করা উচিত, কেন উচিত না। কেন সে আত্মহত্যা করবে বলে ঠিক করেছে, না করলে কি হবে। তারপর পর্দা নামবে। কি বলব এই নাট্যকারকে। এটা কিছু হলো?”
“তো কি নাম সেই নাটকের, মোর্শেদ? পেট ভুটভাট?”
“ওভাবে বলো না, রায়হান। আমার মনে হয় আমি একটা ফ্রেঞ্চ নাটকে এমন একটা কাহিনীর কথা কোথাও পড়েছিলাম।”
তিতলী কিছু বলছে না। দুর থেকে দেখছে শুধু। অস্বস্থিতা কেটে গেছে। ভালো লাগছে ওর। বন্ধু-বান্ধবরা আসছে, আড্ডা দিচ্ছে, খাচ্ছে—পান করছে, দেখতেই ভালো লাগে। রাযহানকেও খুব তৃপ্ত মনে হচ্ছে। ও খুব এনজয় করছে। খেতে ভালোবাসে ছেলেটা, খাবে আর সুখ্যাতি করবে।
“ওহ তিতলী,বড় চিংড়ির মাংসটা দেখ। যেন আমি কখন মুখে পুরব সে আশায় নির্লজ্জেও মতো অপেক্ষা করছে। আর এই আইসক্রিমে যে সবুজ সবুজ বাদামগুলো, দেখলেই মনে হয় মিশরীয় কোনো নারীর সবুজ চোখ।”
আচ্ছা, আজ রাতে সব কিছুকে এত কোমল লাগছে কেন, তিতলীর? শুধু মনে হচ্ছে ওপর থেকে যে আলোকের ঝর্ণাধারা ওর ওপর মাঝে মাঝে ঝেুও পড়ে, তা আজ ওকে একেবারে ভিজিয়ে দেবে, উপচে পড়বে। একটু পরপরই কেন জানি সেই কামিনী গাছটার কথা মনে পড়ছে ওর। গাছটা নিশ্চয়ই এখন চাঁদেও আলোয় একদম রূপালি হয়ে আছে। কতটা রূপালি? অহনার শাড়ির মতো? তিতলী আবার তাকায় অহনার দিকে। ও একটা লেবু চাপার চেষ্টা করছে, ও সময় হাত থেকে কেমন যেন একটা আলো ঠিকরে বের হচ্ছে।
নানা ভাবনা ঘুরপাক খায় তিতলীর মাথার ভেতর। তিতলীর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছে, অহনা আজ ধরা দেবে। হয়তো যখন খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকে গেলে কফি বানাতে যাবে, তখন ঘটবে কিছু একটা। কি ঘটবে সেটা অবশ্য জানে না তিতলী।
অহনা এখন হাসছে। সেই হাসিটাই। যেন ওই রহস্যময় হাসিটা না হাসলে ও বাঁচবে না। ঘাড়টা একটু হেলানো, আনত মুখে হসি।
“অনেক হয়েছে” মনে মনে ভাবে তিতলী। তারপর ডেকে নেয় অহনা কে ‘এসো। নতুন কফি মেকার কিনেছি। দেখাব।” অহনা মাথাটা একটু নিচু করে এগোল। বন্ধুদের আসর থেকে ততক্ষণে উঠে এসেছে রায়হানও।
“জানেন তো অহনা। কফি হলো তিতলীর প্রিয় জিনিস। আর প্রতি দু সপ্তাহে আমাদের বাড়িতে নতুন একটা কফি মেকার কেনা হয়।”
ঝাড়বাতিটার আলোটা কে যেন কমিয়ে দিয়েছে। লায়লা আলোটা বাড়াতে যাচ্ছিল, অহনার কথায় থামল।
“থাক না। এই বেশ ভালো।” খুব শব্দ কেটও বলেনি অহনা, তবে কেমন যেন একটা সুর আছে সে কথায় অগ্রাহ্য করা যায় না। এটুকু বলে ডিভানে হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর…তিতলী কে ইশারা দিল। এই ইশারাটার জন্যই কি অপেক্ষা করছিল তিতলী। তাহলে কি ভাঁজ খুলতে শুরম্ন করল অহনা?
“তিতলী তোমাদের বাগানটা দেখাও না”
তিতলী মুখে কিছু বলর না। শুধু অহনাকে সঙ্গে কোও বাগানের দিকে এগুলো।
“ওই যে।”
তারপর দুই নারী সেই কামিনী গাছের দিকে অপলক তাকিয়ে রইল। কতক্ষণ কে জানে! গাছটা কি শান্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে। কেবল মনে হচ্ছে চাঁদের আলোয় রূপালি হয়ে যাওয়া গাছটা রূপোর থালার মতো চাঁদটার সঙ্গে মিশে যেতে চাইছে। কতক্ষণ ওরা দাঁড়িয়ে ছিল ওখানটায়? কে রাখে সময়ের খবর। ওরা দুজন যেন দুজনকে বুঝে নিতে চাইছিল। ওরা এমন কিছু বিনিময় করল যা কোনো সাধারণ মানুষের বোধের অগম্য। একজনের বুকের বেতরের জ্বলে থাকা আলো আর উত্তাপটুকু অন্যকে ছুয়ে যাচ্ছিল শুধু। অহনার এই উত্তাপটা একটু অন্যরকম। ঠিক নিষ্পাপ নয়। কি যেন মিশে আছে ওতে।
নীরবতা ভেঙে এবার অহনা বলল. ‘ব্যাস এটুকুই। চলো। ভেতরে যাই।’
ঝাড়বাতির আলোটা এখন পূর্ণ শক্তিতে জ্বলছে। কেউ কারো কথা শুনছে না। শুধু বলেই যাচ্ছে।
“আমার প্রজাপতির কথা আর বলো না, বুঝলে। ওর ব্যাপারে আমার আমার আগ্রহটা তখনই হবে, যখন ওর একটা বেশ ডাকাবুকো প্রেমিক হবে। আমি ওর প্রেমিককে হিংসা করব। দরকার হলে কুসিত্ম লড়ব।”
“আমি আমার বাসাটা এমনভাবে সাজাব! শোনো বলি আমার পরিকল্পনাটা কি? আমি চেয়ারগুলোর ডিজাইন করব রান্নার কড়াইয়ের মতো। আর পর্দার মধ্যে আলুর চিপসের মতো করে কাপড় কেটে ঝুলিয়ে দিতে বলব।”
“তোমাদের মতো নতুন লেখকদের সমস্যাটা কি জান, তোমরা একটা রোম্যান্টিক জগতে বাস কর। সমুদ্রে গেলে তোমার বমি হবে, তোমার একটু পর পর বেসিনে দৌড়াতে হবে। তো তুমি কেন সেই বেসিনের কথা বলবে না?”
“কি যে বাজে একটা কবিতা বেরিয়েছে। এক সুন্দরীকে নাক ভাঙা একটা ভিখিরি চুমু খেয়েছে, চুমু। হা, হা হা।”
চুপচাপ অহনা এসে কোণার দিককার সবচেয়ে নিচু চেয়ারটায় বসল। রায়হান এগিয়ে এসে তার সিগারেটের বাক্সটা বাড়িয়ে দিল।
“কি চাই? ইজিপশিয়ান? তার্কিশ? ভার্জিনিয়ান?”
অহনাা মাথা নেড়ে না বলে।
তিতলী ভয় পাচ্ছে খুব। রায়হান নিশ্চয়ই কষ্ট পেল, রাগও হয় তো হলো। তিতলী মনে মনে রায়হানের সঙ্গে কথা বলে।
“ওহ রায়হান! ওকে তুমি অপছন্দ করো না। ও অসাধারণ। আর যাকে আমি এত পছন্দ করি তাকে তুমি কি করে অপছন্দ করবে বলো? আজ রাতে তোমাকে সব খুলে বলব। আজ শুনতেই হবে।” তিতলীর মনে মনে উচ্চারিত কথাগুলোকে রায়হান পর্যন্ত পৌছালো?
শিগগিরি এই মানুষগুলো চলে যাবে। ঘরে শুধু তিতলী আর রায়হান। একসময় বাতিগুলো রায়হান নিভিয়ে দেবে। তারপর বিছানায়…
তড়াক করে উঠে বসল অহনা।
“কেউ পিয়ানোটা বাজায় না? কি আশ্চর্য কেউ না?”
প্রথমবারের মতো তিতলী রায়হানের কাছ থেকে তীব্র ভালোবাসা চাইছে। রায়হান ওকে ভালোবাসায় ডুবিয়ে দিক। মিশিয়ে নিক শরীরের সঙ্গে। তিতলী রায়হানকে ভালোবাসে। কিন্তু কেন যেন শরীরি ভালোবাসাটায় ও ঠিক অভ্যসত্ম হয়ে ওঠেনি এতগুলো বছরেও। এ নিয়ে প্রথম প্রথম কথাও হয়েছে। এই শীতলতা নিয়ে একটা সময় রায়হান বেশ বিষণ্ণ হয়ে থাকত। তবে ওরা খুব আধুনিক তো। আর কথা বলার প্রয়োজনই হয়নি। দুজনই দুজনকে বোঝে।
কিন্তু আজ কি হলো। তাহলে সকাল থেকে বুকের ভেতর জ্বলতে থাকা উষ্ণ আলোটা এই পথেরই ইশারা করছিল?
অতিথিরা যাওয়ার প্রস্ত্ততি নিচ্ছে। প্রথমে মোর্শেদ আর লায়লা।
“বন্ধুরা অনেক খানাপিনা হলো। রাতও হলো। আমরা দরিদ্র থিয়েটার কর্মী। এখনই না বেরোলে আর সি এনজি পাব না।”
“শুভ রাত্রি।খোদা হাফেজ।” সদর দরজা থেকে বিদায় দিয়ে বসার ঘে।ও ফেরে তিতলী।
অহনা আর আসিফের যাওয়ার পালা এখন।
“শোনো অহনা, আমি একা ট্যাক্সিতে যেতে ভয় পাচ্ছি। চল না কিছুটা আমার সঙ্গে।”
“ঠিক আছে। অসুবিধা নেই, আমি হলঘর থেকে শালটা চট করে নিয়ে আসছি। তুমি একটু অপেক্ষা করো।’
রায়হান অহনাকে সঙ্গে কেইও এগোয় হলঘরের দিকে। বসার ঘরে আসিফ আর তিতলী ওদের অপেক্ষায় তখন।
“তিতলী তুমি আমার কবিতার বইটা পড়েছ? প্রথম কবিতাটা আমার খুব পছন্দ। কবিতাটার নাম ‘কেন সবসময় টমেটো স্যুপ খেতে হবে’।
“আছে আমার কাছে। দাঁড়াও দেখাচ্ছি।” ড্রয়িং রুমের কোণার দিকের টেবিলটা থেকে বইটা টেনে বের করতে গিয়ে কি মনে করে হলঘরের দিকে চোখ যায় তিতলীর।
রায়হান অহনার গায়ে শালটা জড়িয়ে দেওয়ার ভাব করে ওকে বুকে টেনে নিয়েছে তখন। অহনার ঠোঁট, রায়হানের ঠোঁটের ভেতর। অহনা অস্থির হাতে রায়হানের চুলটা খামচে ধরেছে। এক সময় বিচ্ছিন্ন হলো ওরা দুজন। রায়হান কি যেন একটা বলল। অহনার মুখে সেই রহস্যময় হাসি।
“বাহ এই তো পেয়ে গেছ বইটা। দেখ বিষয়টা কত জীবনঘনিষ্ঠ। কেন স্যুপ বলতেই টমেটো স্যুপ হবে। যেন টমেটো স্যুপই আমাদেও অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত।”
ড্রয়িং রুমের দিকে এগিয়ে আসছে অহনা আর রায়হান।
‘অহনা আপনি যদি চান আমি ফোন করে একটা ক্যাব ডেকে দিতে পারি।” রায়হান বলে।
“নাহ, তার আর দরকার নেই।’ তিতলীর হাতটা এখন অহনার হাতের ভেতর।
“খোদা হাফেজ, তিতলী। অনেক ধন্যবাদ। তোমার কামিনী গাছটা। আহ। কামিনী গাছটা। আহ।”
ধূসর শাড়ি পরে সদর দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে অহনা, পেছনে কালো ফুলহাতা গেঞ্জি পরা আসিফ।
তিতলী কি আজ বিকেলে ওদেরই দেখেছিল? হ্যাঁ। ওরাই এসেছিল। বেড়ালের বেশে। সারা গা কেঁপে উঠেছিল তিতলীর। এই তাহলে হবার ছিল।
তিতলী ছুট্টে গিয়ে দাঁড়াল সেই কামিনী গাছটার সামনে। “ঈশ্বর আমার কি হবে এবার, তুমি বলে দাও।”
কামিনী গাছটা তখনও ছড়িয়ে যাচ্ছে সেই রূপালি আলো। আগের মতোই শান্ত নিশ্চল সে।
(মূল গল্প ক্যাথেরিন ম্যানসফিল্ডের ব্লিস—গল্পে গাছটি ছিল নাশপাতির, গন্ধম ফলের কথা মনে করিয়ে দিতে লেখক নাশপাতি গাছের প্রসঙ্গ টেনে ছিলেন।)
অলংকরণ: উত্তম সেন







