বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে মূলতঃ অংশ নেয় ফার্স্ট বেঙ্গল ল্যান্সার এবং টু ফিল্ড আর্টিলারি। এর মধ্যে মেজর খন্দকার আব্দুর রশিদ যে টু ফিল্ড আর্টিলারির কমান্ডিং অফিসার ছিলো, তা ছিলো ৪৬ ব্রিগেডের অধীন। ঘটনার ৬/৭ মাস আগে ফার্স্ট বেঙ্গল ল্যান্সারও ৪৬ ব্রিগেডের অধীন ছিলো, পরে তা রেজিমেন্ট হেডকোয়ার্টারের অধীনে নেয়া হয়। ল্যান্সার ইউনিটটির কমান্ডিং অফিসার কর্নেল মোমিন ছুটিতে থাকায় ১৫ আগস্ট ভারপ্রাপ্ত সি.ও ছিলো টু-আইসি মেজর ফারুক।
বিস্ময়করভাবে জাতির জনক হত্যাকাণ্ডের আগে ৪৬ ব্রিগেড থেকে ফিল্ড ইন্টেলিজেন্স সরিয়ে নেয়া হয়। কিন্তু তারপরও ফার্স্ট বেঙ্গল ল্যান্সার এবং টু ফিল্ড আর্টিলারির কথিত যে যৌথ নাইট প্যারেড থেকে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে কিলিং অপারেশনের জন্য যাত্রা, সেই নাইট প্যারেডে আসলে কি হচ্ছে তা ৪৬ ব্রিগেড এবং সেনাসদরের অজানা থাকার কথা ছিলো না।
এমনকি যে দু’ ইউনিটের ওইদিন নাইট প্যারেড ছিলো না, তাদেরও যে মেজর রশিদ রাত্রিকালীন মহড়ায় যোগ দিতে বলেছে, সেটা জেনেও ব্রিগেড কমান্ডার বা সিজিএস কোনো ব্যবস্থা নেননি।
প্রসিকিউশনের ৪১ নম্বর সাক্ষী ব্রিগেডিয়ার এ কে এম শাহজাহানের বক্তব্যেই তা স্পষ্ট। ঘটনার সময় ১৬ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের টু-আইসি ছিলেন তিনি। কমান্ডিং অফিসার চৌধুরী খালেকুজ্জামান ছুটিতে থাকায় তিনি ভারপ্রাপ্ত সি.ও ছিলেন। তাদের অবস্থান ছিলো জয়দেবপুরে। ১৪ আগস্ট তাদের রেজিমেন্টের অ্যামবুশ ডেমোনেস্ট্রেশন ছিলো। ৪৬ ব্রিগেডের কমান্ডার সাফায়েত জামিল, ডেপুটি চিফ অব আর্মি স্টাফ মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং সিজিএস ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। বেলা ১১টার দিকে অ্যামবুশ ডেমোনেস্ট্রেশন শেষ হয়।
শাহজাহান জানান: ডেমোনেস্ট্রেশন শেষ হওয়ার পর টু ফিল্ড আর্টিলারির কমান্ডিং অফিসার মেজর রশিদ তার কাছে এসে তার ট্রুপস নিয়ে রাতে নিউ এয়ারপোর্টে যেতে বলে। কিন্তু ওই রাতে তার ট্রুপসের রোড মার্চের অনুমতি ছিলো না বলে তিনি অপারগতা জানান। তারপরও পীড়াপীড়ি করতে থাকলে তিনি ব্রিগেড কমান্ডার সাফায়েত জামিল ও সিজিএস খালেদ মোশাররফকে বিষয়টি জানালে তারা ওই রোড মার্চে যেতে নিষেধ করেন।
বেলা ৩টার দিকে শাহজাহানের অফিসে গিয়ে মেজর রশিদ বলে, দোস্ত ইউ হ্যাভ ইনসালটেড মি। তোমাকে একটা রিকোয়েস্ট করলাম, তুমি তো রাখলেই না, বরং সিনিয়রদের বলে দিলে।’
শাহজাহান তার ট্রুপস নিয়ে যাবে না জানানোর পাশাপাশি সিনিয়রদের বিষয়টি জানানোর পরও রশিদ চেষ্টা চালিয়ে যায়। এ কে এম শাহজাহান বারবারই অস্বীকৃতি জানালে চা পান না করেই চলে যায় রশিদ। কিন্তু মাগরিবের আগে মেজর রশিদ আবার তার বাসায় ফোন করে ট্রুপস নিয়ে নিউ এয়ারপোর্ট যাওয়ার অনুরোধ জানায়। আবারও অপারগতা জানান শাহজাহান।
কিছুক্ষণ পর সাফায়েত জামিল অ্যামবুশ ডেমোনেস্ট্রেশন শেষ করে ফোর্স গাজীপুর থেকে ইউনিটে ফেরত এসেছে কি না টেলিফোনে জানতে চান। তিন ভাগের এক ভাগ এসেছে জানিয়ে শাহজাহান বলেন, ম্যাটেরিয়েলস নিয়ে সবার ফিরতে আরো একদিন লাগবে। টু-আইসি শাহজাহান তখন আবারো ব্রিগেড কমান্ডারকে রশিদের অনুরোধের কথা জানান। জবাবে সাফায়েত জামিল বলেন, তুমি যেও না, ইউ ডু ট্রেনিং অ্যাজ প্রোগ্রাম। আজ রাত ১০টা পর্যন্ত ডিসম্যান্টল করবে, বাকিটা আগামীকাল করবে।’
ইতিহাস সাক্ষী, সাফায়েত জামিলরা যখন শুধু এরকম নির্দেশনা দিচ্ছেন; তখন বঙ্গবন্ধুকে হত্যার জন্য ক্যামোফ্লেজ হিসেবে কথিত নাইট প্যারেডের প্রস্তুতি নিচ্ছে ফারুকের বেঙ্গল ল্যান্সার এবং রশিদের আর্টিলারি ইউনিট। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে তখন এরকম নাইট প্যারেডের চর্চা ছিলো। কিন্তু নাইট প্যারেডের নামে যে বর্বরতম হত্যাকাণ্ডের প্রস্তুতি চলছে, অস্ত্রাগার খুলে দেয়া হয়েছে, মেজর ফারুক রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছে– সেটা বোঝার জন্য সেখানে কোনো গোয়েন্দা কার্যক্রম ছিলো না।
এমনকি চাকুরিচ্যুত যে সেনা কর্মকর্তাদের নিয়ে ডিজিএফআই’র রিপোর্ট ছিলো, তারা যে বিকেল থেকেই ক্যান্টনমেন্টে অবস্থান করছে, সেই তাদের উপস্থিতির সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের এবং গোয়েন্দা বিশ্লেষণ; কোনোটাই সেদিন ছিলো না।
তখন ঢাকার স্টেশন কমান্ডার ছিলেন লে. কর্নেল হামিদ। নয় নম্বর সাক্ষী হিসেবে আদালতকে তিনি বলেন, ১৯৭৫ সনের ১৪ আগস্ট বিকেলে টেনিস খেলার সময় লক্ষ্য করেন যে, চাকুরিচ্যুত মেজর ডালিম ও মেজর নূর টেনিস কোর্টের আশপাশে ঘোরাফেরা করছে। এটা তার কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়। খেলা শেষে তিনি মেজর নূরকে জিগগেশ করেন, তোমরা কার অনুমতি নিয়ে এখানে খেলতে আসো? জবাবে নূর জানায়, তারা জেনারেল জিয়ার অনুমতি নিয়ে খেলতে আসে।’
কর্নেল হামিদের কাছে ওই বিকেলে চাকুরিচ্যুত মেজর নূর এবং মেজর ডালিমের উপস্থিতি শুধু অস্বাভাবিক ছিলো। কিন্তু পরদিন সকালে বেতারে ডলিমের কণ্ঠ ছিলো পিলে চমকানোর।
উপযুক্ত গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক থাকলে সিনিয়র অফিসারদের হয়তো এরকম শোকের খবর শুনতে হতো না। আগের সন্ধ্যা থেকে ফারুক-রশিদরা সবকিছু প্রায় প্রকাশ্যেই করেছে। তাদের সেসব কার্যক্রমের রিপোর্ট করার মতো কেউ ছিলো না। নাকি জেনেও না জানার, দেখেও না দেখার আর শুনেও না শোনার অভিনয় আছে এর মধ্যে? এরকম প্রশ্ন আছে অনেকের।
প্রসিকিউশনের ১২ নম্বর সাক্ষী ল্যান্সারের এল.ডি সিরাজ জানিয়েছেন, তাদের নাইট প্যারেডে মেজর ডালিম, ক্যাপ্টেন হুদা এবং আরেকজন অফিসারকে পরিচয় করিয়ে দেয় মেজর ফারুক। প্রকাশ্য ব্রিফিংয়েই মেজর ফারুক বলে, আগামীকাল ১৫ আগস্ট ইউনিভার্সিটিতে মিটিং হবে। সেই মিটিংয়ে রাজতন্ত্র ঘোষণা করা হবে। শেখ মুজিব রাজতন্ত্র ঘোষণা করবেন। আমরা রাজতন্ত্র সমর্থন করি না। এখন আমি যা বলবো এবং আমার অফিসাররা যা বলবে তা তোমরা শুনবে (পালন করবে)’।
২৪ নম্বর সাক্ষী আর্টিলারির হাবিলদার আমিনুর রহমানের সাক্ষ্য অনুযায়ী, মেজর রশিদ এবং মেজর ডালিম তাদের ব্রিফিংয়ে বলে, অনেক কষ্ট করে জীবন বাজি রেখে দেশ স্বাধীন করলাম। বর্তমান সরকার আমাদের মা-বোনদের ইজ্জত রক্ষা করতে পারছে না। জনগণ না খেয়ে মরছে– এই সরকারতে উৎখাত করতে হবে।’
এ দুজন ছাড়াও ল্যান্সার এবং আর্টিলারির অন্য সদস্যরা যে সাক্ষ্য দিয়েছেন তাতে মোটা দাগে বলা যায়:
১. নাইট প্যারেডের নামে ফারুকের ফার্স্ট বেঙ্গল ল্যান্সারের সদস্যরা রাতে নিউ এয়ারপোর্টে এক হয়।
২. তাদের সঙ্গে পরে যোগ দেয় রশিদের টু ফিল্ড আর্টিলারি।
৩. সেনাবাহিনীর চাকরিচ্যুত কর্মকর্তারাও নাইট প্যারেডে যোগ দেয়।
৪. রশিদ এবং ফারুক সেনা সদস্যদের সামনে সরকার উৎখাতের আহ্বান জানিয়ে বক্তৃতা করে।
৫. ট্যাংকের গোলা তো ছিলোই না, শুরুতে ছোট কোনো অস্ত্রের গুলিও তাদের ছিলো না; কারণ মহড়ায় লাইভ অ্যামুনিশন থাকে না।
৬. কিন্তু রাত ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে কর্নেল রশিদ এবং অন্যরা অস্ত্রাগার খুলে অস্ত্র এবং গোলা-বারুদ নিয়ে যায়।
৭. নিউ এয়ারপোর্ট (বালুরঘাট) থেকে ক্যান্টনমেন্টের ভেতর এবং বাইরে দিয়ে খুনিরা বঙ্গবন্ধু ভবন, সেরনিয়াবাতের বাসভবন, রেডিও সেন্টারে এবং শেখ মণির বাড়িতে পৌঁছায়।
৮. সারারাত ধরেই খুনের এ প্রস্তুতি চলতে থাকে।
৯. খুনিদের প্রথম দলটি বঙ্গবন্ধুর বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছায় ভোর ৪টায়। এক ঘণ্টা ধরে তারা কামানসহ নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করে।
কিন্তু মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স সেনাপ্রধানকে যখন খবরটি জানাতে পেরেছে, ৩২ নম্বরে তখন হামলা প্রায় শুরু হয়ে গেছে।
সেসময়ের ডিজিএফআই প্রধান ব্রিগেডিয়ার রউফ ঘটনার কিছুদিন আগে মেজর ডালিম এবং মেজর নূরসহ কিছু অফিসারের সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্র সম্পর্কে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে জানিয়েছিলেন। কিন্তু ১৪ আগস্ট রাত থেকে ফারুক-রশিদের এতো তৎপরতা, অস্ত্র-গোলাবারুদ এবং ট্যাংকসহ দুটি ইউনিটের রাষ্ট্রপতির বাসভবনের দিকে যাওয়া, ঘণ্টাখানেক সময় ধরে রাষ্ট্রপতির বাসভবন ঘিরে অবস্থান নেয়া; এসবের কিছুই তারা জানতে পারেনি।
গোয়েন্দাদের তখনকার অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় ৪২ নম্বর সাক্ষী মেজর জিয়াউদ্দিনের সাক্ষ্যে। ১৫ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন তিনি। ভোর সাড়ে ৫টায় গুলশানে ডিজিএফআই’র অফিসার্স মেস থেকে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশে রওনা হন। পথে মহাখালিতে রাস্তার আইল্যান্ডের উপর একটি ট্যাংক এবং রাস্তার পাশে খাদে আরেকটি ট্যাংক দেখতে পান।
বর্তমান জাদুঘরের কাছে গেলে ডিজিএফআই’র একজন সৈনিক এসে রেডিওতে মেজর ডালিমের ঘোষণার কথা জানান। মেজর জিয়াকে পাশের চায়ের দোকানে নিয়ে রেডিওর সেই ঘোষণাও শোনান তিনি। এর মানে হলো ওইদিন রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তায় থাকা ডিজিএফআই ইউনিট রাষ্ট্রপতির নিহত হওয়ার খবর প্রথম জানতে পারে রেডিওতে মেজর ডালিমের ঘোষণা থেকে।
(আগামীকাল সপ্তম কিস্তি: ১৪ আগস্ট বিকেল থেকে প্রকাশ্যেই চলে সব প্রস্তুতি)








