২৮ সেপ্টেম্বর ৭১ বছরে পা রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রিয় নেত্রীর জন্মদিন পালনে নেতাকর্মীদের আড়ম্বর প্রস্তুতি থাকলেও মানবতার ডাকের মধ্য দিয়ে দিনটি পালন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে আওয়ামী লীগ।
১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জের মধুমতি নদী তীরের প্রত্যন্ত গ্রাম টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন শেখ হাসিনা। বাড়ির বড় মেয়ে হিসেবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে কাছে থাকার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। পেয়েছেন বঙ্গবন্ধুর মত অগাধ দেশপ্রেম, নিপীড়িত মানুষের প্রতি ভালোবাসা, মানবতা এবং জীবন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মত অসীম সাহস ও দৃঢ় মনোবলের গুণাবলি।
বঙ্গবন্ধু স্কুলের ছাত্র অবস্থায় ব্রিটিশ আমলসহ পাকিস্তান আমলে সাড়ে ৪ হাজার দিনের বেশি জেলে বন্দী অবস্থায় কাটান। এরপরও তিনি এত অল্প সময়ে বাঙালি জাতিকে তিনি যে স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন তার স্বাদ পেতে আমাদের কয়েক পূর্বপুরুষকে অপেক্ষা করতে হয়েছে। অথচ এর প্রতিদানে তার পরিবার পেয়েছে ইতিহাসের জঘন্যতম ১৯৭৫ এর মতো কাল রাত। যার দাগ এখনও তার দুই মেয়েসহ বয়ে বেড়াচ্ছে পুরো জাতি।
জেল জুলুমে কাটানো বাবা মুজিবের আদর তাই পারিবারের কেউ তেমন পায়নি বললেই চলে। কতটা অভাগা ছিলেন শেখ পরিবারের সন্তানেরা। সবকিছুতে ভাগ চলে বাবা মায়ের আদরে ভাগ চলে না। কিন্তু শেখ মুজিবের সন্তানেরা তাদের বাবার ভালোবাসার ভাগ সারা জাতিকে দিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর তিন পুত্র, দুই কন্যার মধ্যে কে তার সবচেয়ে বেশি প্রিয় ছিল এমন প্রশ্ন তোলা হবে অবান্তর। বাবার চোখে সব সন্তান সমান। তবে বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীতে তিনি সন্তানদের মধ্যে সবেচেয়ে অধিকবার উল্লেখ করেছেন শেখ হাসিনা সম্পর্কে, অন্যদিকে রোজনামচায় সবচেয়ে বেশি উঠে এসেছে রাসেল প্রসঙ্গ। রাসেল নিতান্তই শিশু, আদর-আবদার বেশি থাকাটা স্বাভাবিক। তবে বঙ্গবন্ধুর প্রকাশিত রচনাতে জ্যেষ্ঠ সন্তান শেখ হাসিনার প্রতি একটু বেশি দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে।
বড় মেয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায়ই বলেন, কারাগারে থাকার কারণে তার ছোট ভাই-বোনরা বাবার সংস্পর্শ খুব কমই পেয়েছিল। ভাই শেখ কামালের একটি ঘটনা শেখ হাসিনা লিখেছেনও। তার ভাষায়, “শেখ কামাল আব্বাকে কখনো দেখে নাই, চেনেও না। আমি যখন বারবার আব্বার কাছে ছুটে যাচ্ছি, আব্বা আব্বা বলে ডাকছি, ও শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছে, ও হঠাৎ আমায় জিজ্ঞেস করল, হাসু আপা, তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা বলে ডাকি।”
এমনকি যখন শেখ হাসিনার বিয়ের কথা চলছিলো তখনও পিতা মুজিব কারাগারে বন্দি। শেখ মুজিব শেখ হাসিনাকে বিয়েতে রাজি করাতে বললেন: “মা আমি জেলে আছি, কতদিন থাকতে হবে, কিছুই ঠিক নাই। তবে মনে হয় সহজে আমাকে ছাড়বে না, কতগুলি মামলাও দিয়েছে, ব্যবসা-বাণিজ্য ধ্বংস হয়ে চলেছে। তোমাদের আবারও কষ্টা হবে। তোমার মা যাহা বলে শুনিও। একজন নিরুপায় বাবার এর চেয়ে আর কষ্ট কী হতে পারে? সন্তান হিসেবে নিজের বিয়েতে বাবার অনুপস্থিত থাকার কথা শোনার পর শেখ হাসিনার মনের অবস্থা কী হতে পারে?
এত জেল জুলুম, অত্যাচার, নির্যাতন শেষে যখনই সুদিন আসতে শুরু করেছিল তখন সব সুখ কেড়ে নিলো ঘাতকের বুলেট। বাবার সবচেয়ে আদরের মেয়েটি এভাবেই অনাদরে বেড়ে উঠলেন আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১৯৭৫ সালে পরিবারের সবাই শহীদ হওয়ার পর দীর্ঘ ৬ বছর নির্বাসনে কাটিয়েছেন দুই বোন। অতি আপনজনের মৃত্যুর সংবাদ বুকে নিয়ে দেশে দেশে অনাথের মত ঘুরে বেড়িয়েছে একটু আশ্রয়, নিরাপত্তার জন্য।
১৯৮১ সালের ১৭ মে গণতন্ত্রের মানসকন্যা শেখ হাসিনা বাংলার মাটিতে ফিরে আসেন। ফিরে আসার পর থেকেই সবকিছু হারিয়ে দিশেহারা এই মানুষটি নেমে পড়লেন বাবার সোনার বাংলার স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে। বাংলাদেশের মানুষকে করলেন স্বজন হারিয়ে পাওয়া একমাত্র স্বজন। বুকে পাথর বেঁধে নেমে গেলেন সংগ্রামে, আন্দোলনে। সবকিছু হারানোর পরও একটা মানুষ কীভাবে মানুষের জন্য কাজ করতে প্রতিনিয়ত ছুটতে পারেন তার উদাহারণ শেখ হাসিনা ছাড়া পৃথিবীতে দ্বিতীয় কেউ নেই। তারপরও তার উপরে এখন পর্যন্ত ১৯ বার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। সৃষ্টিকর্তার কৃপায় আর দলীয় নেতাকর্মীর ভালোবাসায় বেঁচে যান তিনি।
২০০০ সালের ২০ জুলাই গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার শেখ লুৎফর রহমান মহাবিদ্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা চেষ্টা করা হয়। ভাষণের জন্য মঞ্চ নির্মাণের সময় মাটির নিচে পুঁতে রাখা অবস্থায় ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পাওয়া যায়। পরদিন ৮০ কেজি ওজনের আরেকটি বোমা উদ্ধার করা হয় কোটালীপাড়ার হেলিপ্যাড থেকে। এরপরে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার কথা আমাদের সবার জানা। মৃত্যুর একদম কাছ থেকে ফিরে এসেছেন তিনি। ২০০৭ সালের ১/১১ এর সময় গ্রেফতার করে ১ বছর তাকে জেলে আটকে রাখা হয়। সেখানেও চলে হত্যার ষড়যন্ত্র।
এতকিছুর পর শেখ হাসিনা বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়ন এবং আধুনিক জীবনমান গড়ার প্রত্যয়ে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। বাবার মত সোনার বাংলা নির্মাণে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে ভিশন টুয়েন্টি টুয়েন্টি ওয়ান এবং উন্নত দেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছেন। স্বপ্নের পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন, উড়াল সেতু নির্মাণ, চারলেনের কয়েকটি রাস্তা নির্মাণ, নতুন নতুন রেল লাইন স্থাপনসহ অত্যাধুনিক টেক পার্ক নির্মাণ এবং বৈদেশিক বাণিজ্যকে ত্বরান্বিত করতে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি ও গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এছাড়াও রাজধানী বাসীদের যানজট হ্রাসে মেট্রোরেলের কাজ খুব দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। এসব প্রকল্পের কাজ শেষে বাংলাদেশের চেহারা বদলাতে শুরু করবে খুব দ্রুত গতিতে।
সর্বোপরি বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগ বন্যার ক্ষতির মোকাবিলা করে উঠতে না উঠতেই শুরু হয়েছে রোহিঙ্গা সংকট। শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কারণে বিশ্বের কাছে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে যে মানবিকতা দেখিয়েছেন তার জন্য তিনি বিশ্বের কাছে বাংলাদেশকে অন্যন্য উচ্চতায় নিয়েছেন। সংকট সমাধানে কাউকে ছেড়ে কথা বলেননি তিনি। দেশে বিদেশে শত্রুদের সঙ্গে সবসয় সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হয় আমাদের প্রিয় হাসু আপাকে।
সংগ্রামী এই জীবন চলার পথে বিশ্বকে তাক লাাগিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন সেক্টরের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ২৭টি পুরস্কার ও পদক অর্জন করেছেন।
এমন একজন রাষ্ট্রপ্রধান পাওয়া আমাদের ভাগ্যের ব্যাপার বটে। আপনার অনাদর আর সংগ্রামের এই একাত্তর বছর জীবনের র্দীঘায়ু কামনা করে আপনাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা। আগামীর বাংলাদেশ আপনার হাতে বিশ্বের দরবারে মাথা উচু করে দাঁড়াক এই প্রত্যাশাই করি।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








