সমাজের পদে পদে বাধা। সেটা পেরিয়েই অগ্রযাত্রা। যারা ‘অনন্যা’ হয়ে উঠেছেন তাদের অনুসরণ করে সমাজের প্রতিটি স্তরের নারীরাই একদিন অনন্য উচ্চতায় পৌঁছাবেন। অগ্রযাত্রায় এগিয়ে যাওয়া বছরের সেই আলোকিত-আলোচিত কৃতি নারীদের জন্যই ‘অনন্যা শীর্ষদশ সম্মাননা’। ২০১৬ সালের জন্য এই সম্মাননা পেয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের তারকা স্ট্রাইকার ‘গোলমেশিন’ খ্যাত সাবিনা খাতুন।
নিজ নিজ ক্ষেত্রে অবদানের জন্য প্রতিবারের মতো এবারও দশটি ক্যাটাগরিতে অগ্রগামী দশ নারীকে সম্মাননা জানানো হয়েছে। শনিবার রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইন্সটিটিউট মিলনায়তনে জমকালো অনুষ্ঠানে নারী-বিষয়ক সাময়িকী পাক্ষিক অনন্যা এই সম্মাননা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সম্মানপ্রাপ্ত নারীদের হাতে উত্তরীয়, ক্রেস্ট ও সনদপত্র তুলে দেয়া হয়। অনন্যার সম্পাদক ও প্রকাশক তাসমিমা হোসেনের পরিচালনায় প্রাণবন্ত এই আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী।
সম্মাননা পেয়ে সাবিনা বলেন, ‘বাংলাদেশে মেয়েদের ফুটবল খেলাটা একটা অপ্রত্যাশিত ব্যাপার। তবে আনন্দের বিষয়, বাংলাদেশের নারী ফুটবল এখন অনেকদূর এগিয়ে গেছে। কাজটা সহজ না নারী খেলোয়াড়দের জন্য। আমাদের নানা সময়ে অনেক কটুকথা শুনতে হয়েছে, সেগুলো তোয়াক্কা করিনি বলেই আজ আমি এখানে দাঁড়িয়ে।’
সাবিনার মতো মেয়েদের সম্মানিত করতে পেরে গর্বিত অনন্যা’র সম্পাদক ও প্রকাশক তাসমিমা হোসেন। তিনি বলেন, ‘নব্বইয়ের দশকে তসলিমা নাসরিনের মাথার দাম যখন ঘোষিত হলো, তখন থেকে ওম্যান অব দ্য ইয়ার সম্মাননা প্রদানের কথা আমরা ভাবি, যা পরে অনন্যা শীর্ষদশ হয়।’
‘আগে সারা বছরের উল্লেখযোগ্য কর্মকাণ্ডের জন্য ১০ জন নারী খুঁজে পাওয়া যেত না। এখন অনেক যোগ্য ও কৃতী নারীকে আমরা পাই। এ পর্যন্ত ২৪০ জন নারীকে আমরা সম্মাননা দিতে পেরে আনন্দিত ও গর্বিত।’ বলেন তাসমিমা হোসেন।
এবার অনন্যা শীর্ষদশ কফি টেবিল বুকের তৃতীয় সংস্করণও প্রকাশিত হয়েছে বলে জানান তিনি।
সাতক্ষীরার চৌধুরী পাড়ার সৈয়দ আলী গাজির ও মমতাজ বেগমের পাঁচ কন্যার চতুর্থজন সাবিনা। প্রথম বাংলাদেশী নারী ফুটবলার হিসেবে মালদ্বীপের ক্লাবে খেলতে যেয়ে ইতিহাস রচনা করেন তিনি। টুর্নামেন্টের ৫ ম্যাচে ৩৭ গোল করেছিলেন!
দেশের অন্যতম সেরা ফুটবল তারকা বর্তমান বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন ৪১ বছর আগে এমনই এক ইতিহাস গড়েছিলেন। ১৯৭৫ সালে হংকংয়ের পেশাদার লিগে ‘এফসি ক্যারোলিনের’ হয়ে খেলেছেন তিনি। সালাউদ্দিন ছিলেন আবাহনীর খেলোয়াড়, পরের নজিরটি মোহামেডানের সাবিনার। অনেক মহিমার এ যাত্রার আগে খুব আত্মবিশ্বাসের সাথে জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশের নারী ফুটবলের অগ্রযাত্রার একটা বার্তা পৌঁছে দিতে চান বিশ্বের দরবারে। মাধ্যম ‘ক্লাব মালদ্বীপস উইমেন্স ফুটসাল ফিয়েস্তা’ নামের টুর্নামেন্টে মালদ্বীপের পুলিশ ক্লাবের হয়ে দারুণ কিছু করে।
সাবিনা দারুণ কিছু তো করেছেনই, সঙ্গে গোলবন্যা বইয়ে হইচই ফেলে দিয়ে নিজের দল ‘মালদ্বীপ পুলিশ ক্লাব’কে নির্বিঘ্নে সেমিফাইনালে তোলেন। প্রস্তুতি ম্যাচের পর টানা চতুর্থ ম্যাচে হ্যাটট্রিকের সাথে চার ম্যাচে সেরা খেলোয়াড় হন সাবিনাই। ২০১৫তে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের কাছে ৩-১ গোলে হেরেছিল মালদ্বীপ। দুটি গোল করেছিলেন সাবিনা। সেখানে উপস্থিত মালদ্বীপ পুলিশ ক্লাবের এক কর্মকর্তা পরে দ্বীপরাষ্ট্রের ক্লাবটিতে খেলতে দলে টানেন লাল-সবুজদের তারকাকে।
প্রতিভার প্রথম ঝলকটি দেখান ২০০৮ সালে সাতক্ষীরার হয়ে জাতীয় নারী ফুটবলে অংশ নিয়ে। পরে আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। ২০১০ সালে শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবের হয়ে ঢাকার ক্লাব ফুটবলে অভিষেক। সর্বশেষ খেলেছেন মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব লিমিটেডের হয়ে। তিনি বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের অধিনায়ক। সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে দুইশর ওপর গোল তার।

ফুটবল জীবনের শুরুর দিক থেকেই তারকা হয়ে ওঠার সব রসদ ছিল সাবিনার মাঝে। ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত ‘সিটিসেল জাতীয় মহিলা চ্যাম্পিয়নশিপে’ সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। ঢাকা মহানগরী নারী ফুটবল লীগ ২০১১-তে খেলে সেরা খেলোয়াড় হন। ঘরোয়া লিগে আছে শতাধিক গোল।
দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলেও সাবিনার পারফরম্যান্স নজরকাড়া। এসএ গেমস, অলিম্পিক প্রাক-বাছাই, এএফসি নারী এশিয়া কাপ-২০১৪ এবং সাফ গেমসে গোল করার কীর্তি আছে তার। নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ-২০১৬ এর আসরে সাবিনা ৭ গোল করে বাংলাদেশকে ফাইনালে টেনে নেন। ব্রাজিলের কিংবদন্তি নারী ফুটবলার মার্তাকে আদর্শ মানা সাবিনা এগিয়ে চলছেন দুর্দান্ত গতিতেই।
১৯৯৩ সাল থেকে অনন্যা শীর্ষদশ সম্মাননার যাত্রা শুরু হয়। এ পর্যন্ত ২৪০ জন নারী পেয়েছেন এই স্বীকৃতি। এবার তাতে যোগ হলো সাবিনা নামের আরেকজন যোদ্ধার নাম।










