চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

২০২০: অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক

মহাকালের বুকে হারিয়ে গেল আরও একটা বছর। ২০২০ সালটা হারিয়ে গেল দিনের সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে। নতুনের আবাহনে আসছে ২০২১। একটা বছরের সমাপ্তিতে আমরা স্বভাবত হিসাব মেলাই কী পেলাম, কী হারালাম। একই সঙ্গে নতুন বছরের কাছে থাকে আশাবাদ।

২০২০ সালে করোনা ছিল। এ কারণে এই সালের প্রতি আমাদের অদ্ভুত এক রাগ আছে। বৈশ্বিক মহামারি আমাদের জীবনকে পাল্টে দিয়েছে। আমাদের চাওয়া-পাওয়ার মাঝে দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। গত নয়মাস ধরে মুক্তজীবনেও অনাহুত বন্দিত্বকে আমরা ধারণ করেছি। মুক্ত আমরা অথচ মনে হয় এখানে স্বাধীনতা নেই। আছে অজানিত ভয়। প্রাণ হারানোর। এটা কেবল আমাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। দেশ ছাপিয়ে সারা বিশ্বে আঘাত হেনেছে করোনার মহামারি। এখানে আমাদের নিজেদের নিয়ে ভাবনার পাশাপাশি কাছ-দূরে থাকা স্বজনেরাও ভাবিয়েছে বেশ। আমাদের উৎকণ্ঠা ছিল তাদের নিয়ে, তাদেরও আমাদেরকে নিয়ে।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

গত মার্চে দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্তের পর প্রথম দিকে আমরা যেভাবে আতঙ্ক, সচেতনতায় ছিলাম সেরকম এখন আর নেই। করোনাও গা সওয়া হয়ে গেছে আমাদের। সারাবিশ্বে করোনার প্রকোপ বাড়ছে তবু আমাদের মধ্যকার সহজাত অসচেতনতার কারণে আমাদের বিপদে পড়ার শঙ্কা থাকলেও মানুষ খুব বেশি যে সচেতন হয়ে ওঠছে এমন সুখবর নেই। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বালাই নেই। চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় উন্নত দেশের তুলনায় বেশ পিছিয়ে। আছে করোনার উপসর্গ লুকিয়ে রাখার প্রবণতা।

করোনার কারণে পৌনে একবছর ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ। একটা বছর হারিয়ে গেছে বিনাশিক্ষায় আমাদের। এই একবছর হারালেও শিক্ষার্থীরা পরের ক্লাসে উন্নীত হয়েছে ঠিক, তবে আমাদের চাওয়া কেবল ক্লাসের পর ক্লাসে উন্নীত হওয়া নয়। আমরা অভিভাবকেরা চাই আমাদের সন্তানদের শিক্ষাগ্রহণ করুক, শিক্ষার্থীদেরও একই চাওয়া; কিন্তু করোনা সে সুযোগ আমাদের দেয়নি। এখানে আমাদের কিছুই করার নেই। জনস্বাস্থ্য অগ্রাধিকার পাওয়া কথা যেখানে সেখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে রাখার সিদ্ধান্তটা তাই আমাদের মানতেই হয়েছে, হবেও।

করোনায় টালমাটাল আমাদের জীবন। পুরো বছরটাই কেটেছে আমাদের এর ভয়াল থাবায়। নতুন বছরে খুব করে চাইব ২০২১ সালে করোনা থাকবে না। সুদিনের প্রত্যাশায় এমন আশাবাদ আমরা প্রতিবছরের শেষের দিকে নতুন বছরের কাছে করে থাকি। অজানিত আগামী সুন্দর হবে ভেবে প্রহর গুনি। আর সেই সে আগামী বর্তমান হয়ে অতীত হয়ে গেলে তখন ফের সে দিনগুলোকেও দুঃসহ ভেবে নতুনের আহবানে মগ্ন হই। এ স্বপ্ন আমাদের। আর এ স্বপ্ন দেখা ভুলে যাইনি বলে বেঁচে আছি আমরা, বেঁচে থাকি আমরা, বেঁচে থাকতেও চাই আমরা।

২০২০ শেষে ২০২১ বছরে এসে করোনা মুহূর্তেই হারিয়ে যাবে এমনটা ভাবছি না। করোনা কিংবা এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যাপারগুলো ক্যালেন্ডার দেখে তাদের গতিবিধি নির্ধারণ করে না, আঘাত হানে না। এটা চলতিধর্ম, দিন-তারিখের নয়। করোনা অলৌকিকভাবে হারিয়ে যাবে না। তাকে হারাতে হবে। এখানে মানুষকে বিজয়ী করতে মানুষের মধ্যকার যে সকল বিশেষ যোগ্যতার মানুষেরা কাজ করছেন তাদের প্রতি শুভকামনা, ভালোবাসা।

বিজ্ঞাপন

গেল বছরে করোনা আমাদের কাছ থেকে অনেক উজ্জ্বল মুখকে কেড়ে নিয়েছে। আসছে বছরে এই ধারা অব্যাহত থাকুক সে আমরা চাই না। বছরের শেষ দিনে ২৮ প্রাণহানিসহ গেল বছরে সরকারি হিসেবে আমরা হারিয়েছি ৭ হাজার ৫৫৯ জন। করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন আরও অনেকেই। উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়াদের তথ্য কোথাও থাকবে না। শহরে-গ্রামে আরও অনেককে আমরা হারিয়েছি যাদের কোন তথ্যই থাকবে না কোথাও, যাদের কেউ কেউ আক্রান্ত হয়েছিলেন, কারও কারও হয়ত উপসর্গ ছিল। এমন অনেকেই আছেন করোনা পরীক্ষার সুযোগ পাননি, সুযোগ নেননি। তাদের সকলের পরিবারের প্রতি সমবেদনা।

করোনার শুরুতে প্রস্তুতিহীনতা সত্ত্বেও দায়িত্বশীলদের নানা বাগাড়ম্বর আমরা দেখেছি। আঁতকে ওঠেছি নানা সমন্বয়হীনতার খবরে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে করোনা পরীক্ষা নিয়ে জালিয়াতির তথ্য প্রকাশে উদ্বিগ্ন হয়েছি, লুটপাটের তথ্যে সংক্ষুব্ধ হয়েছি; তবে সবকিছুর পর আমজনতা বলে কিছুই করার সুযোগ ছিল না আমাদের। করোনার পুরোটা সময়ে আমরা কখনই দিনে হাজার পঁচিশ নমুনা পরীক্ষা করতে সমর্থ হইনি। দেশে করোনা শনাক্তের ২৯৯তম দিনশেষে গড় নমুনা পরীক্ষা হয়নি পনেরো হাজারও। এখানে নানা সীমাবদ্ধতা আছে সত্য, প্রশ্ন আছে আন্তরিকতা নিয়েও। গত মার্চের ৮ তারিখ দেশে করোনা আক্রান্ত রোগীকে শনাক্তের তথ্য জানানোর পর বছরের শেষদিন ৩১ ডিসেম্বরের ১ হাজার ১৪ জন নতুন রোগী শনাক্তসহ দেশে মোট শনাক্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ১৩ হাজার ৫১০ জন। এখন পর্যন্ত দেশে মাত্র ৩২ লাখ ২৭ হাজার ৫৯৮টি নমুনা পরীক্ষা হয়েছে। আঠারো কোটি মানুষের দেশে এটা উল্লেখের মত সংখ্যা নয় বলেই মনে হয়। করোনা আক্রান্ত সকলের চিকিৎসা হাসপাতালে জরুরি নয় বলে বিশেষজ্ঞদের মতামত দিয়েছেন। এই হিসাবে বাসা ও দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৪ লাখ ৫৭ হাজার ৪৫৯ জন সুস্থ হয়ে ওঠেছেন। আশা করা যায় দিনদিন এই সংখ্যা বাড়বে। সুস্থের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া মানে আমাদের বিজয়ী হয়ে ওঠা। আমরা বিজয়ী হতে চাই।

করোনার এই সময়ে সরকার নানা অঙ্গনে আর্থিক প্রণোদনা দিয়েছে, ত্রাণ দিয়েছে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার অনুরোধ করেছে। স্বাস্থ্যবিধি মানতে শুরুতে কঠোর হলেও একটা সময়ে তারা নমনীয় হয়েছে। এই নমনীয়তায় মানুষ বেপরোয়া হয়ে ওঠেছে। ঝুঁকি বাড়ছে, বাড়াচ্ছে। এমন অবস্থায় করোনায় দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ে সারাবিশ্বে যে আলোচনা চলছে সেটা নিয়ে আমাদের এখানে তেমন সচেতনতা নেই, প্রভাবও নেই। ফলে আসছে দিনগুলোতে কী হতে পারে সে ভাবাই যাচ্ছে না। করোনা প্রতিরোধে বিশ্বব্যাপী ভ্যাকসিনের প্রয়োগ নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। বাংলাদেশও এই ভ্যাকসিন পেতে যাচ্ছে বলে প্রধানমন্ত্রী-স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ দায়িত্বশীলরা জানাচ্ছেন। এই ভ্যাকসিনের সুষম বণ্টন ব্যবস্থা নিয়ে সরকারকে পরিকল্পনা নিয়ে এগুতে হবে। আশা করতে চাই এখানে অন্যায্য কিছু হবে না।

কোভিড মহামারিতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের এক র‍্যাঙ্কিং জানাচ্ছে সংক্রমণসহ অর্থনীতিতে অভিঘাত মোকাবেলায় কার্যকর ভূমিকা রাখা ৫৩ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান বিশতম। বাস্তবতা যাই হোক অন্তত পরিসংখ্যান বলছে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর তুলনায় নিরাপদ দেশ। গতমাসে বাংলাদেশের অবস্থান ২৪তম থাকলেও এবার চারধাপ উন্নতি হয়েছে আমাদের। এই র‍্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের পেছনে রয়েছে জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোও। ব্লুমবার্গের এই প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে বাংলাদেশের মাত্র ৫ শতাংশ মানুষ টিকার আওতায় রয়েছে। এই সংখ্যাটা আশঙ্কাজনকভাবে কম। যদিও বাংলাদেশের পেছনে র‍্যাঙ্কিংয়ের ২৯তম স্থানে থাকা পাকিস্তানের ২৬ শতাংশ মানুষ রয়েছে টিকার আওতায়, র‍্যাঙ্কিংয়ের ৩৯তম স্থানে থাকা ভারতের ৮৫ শতাংশরও বেশি মানুষ রয়েছে টিকার আওতায়। আসছে বছরে সরকারকে সকলের টিকাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে কাজ করতে হবে। র‍্যাঙ্কিংয়ের পরিবর্তনশীল এই সংখ্যা নিয়ে উচ্ছ্বাসের কিছু নাই। তথ্যের গোপনীয়তার যে অভিযোগ ওঠেছিল নানা মহল থেকে সেখান থেকে তুলনামূলক নিরাপদ শব্দের উৎপত্তি হলেও টিকাপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা আদতে সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতার সূচক। সরকার করোনা ব্যবস্থাপনায় সফল কি ব্যর্থ এটা নির্ভর করবে আদতে ভ্যাকসিন কূটনীতিতেই।

করোনার ২০২০ সাল ‘নিউ নরমাল’ একটা একটা পৃথিবী দেখিয়ে দিয়েছে। ২০২১ সালে নতুন পৃথিবীর নতুন ব্যবস্থার সুষম ব্যবস্থাপনা দিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। হতাশার মাঝপথেও আমরা যেমন আশাবাদের গান গেয়ে এসেছি এবারও তেমনই গাইছি। ২০২০ সালের শেষ সূর্যটার সঙ্গে সব হতাশাকে বিদায় করে দিয়ে ২০২১ সালের নতুন সূর্যে আমরা তাই গাই রবীন্দ্রনাথ। পৌষের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে বৈশাখের গান গাইতে আপত্তি নাই- ‘‘…তাপসনিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে/ বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক/ যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে-যাওয়া গীতি/ অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক/ মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা/ অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা/ রসের আবেশরাশি শুষ্ক করি দাও আসি/ আনো আনো আনো তব প্রলয়ের শাঁখ/ মায়ার কুজ্ঝটিজাল যাক দূরে যাক’’।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)