চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

হক ভাই সত্যিই আপনি মৃত্যুঞ্জয়

হক ভাই, আপনি হাসপাতালের নিঃসীম, নিস্তব্ধ শয্যায় শুয়ে আছেন, এ যেন অবিশ্বাস্য ব্যাপার।

জীবনবাদী, জীবনরসিক, জীবনপ্রেমিক ব্যক্তি আপনি। পরোয়াহীন, ভ্রুক্ষেপহীন সব্যসাচী লেখক। বাংলা সাহিত্যের প্রধানতম লেখকদের একজন আপনি। আপনি অসুস্থ হতে পারেন, আপনাকে জরাবার্ধক্য কখনো কাতর করবে, আমরা একটা বিশ্বাস করি না। আপনি চিরতরুণ। চির যৌবনদীপ্ত এক প্রাণবান ব্যক্তি। জিন্সের প্যান্ট পরিহিত, পকেটঅলা হাফ জ্যাকেট, হাতে ভারি রিস্টওয়াচ, মুখে মৃদু হাসি, পায়ে চামড়ার আরামদায়ক জুতো। সৈয়দ হকের নিজস্ব পোশাকী ব্র্যান্ড। কথা বলার ঢঙ আপনার একান্তই নিজস্ব। সাহিত্যপ্রেম তীব্র। সাহিত্য সংক্রান্ত যাবতীয় খুঁটিনাটি তথ্য উপাত্তের ভাণ্ডার আপনি। পাণিনির ব্যাকরণ, রবীন্দ্রনাথের গদ্যের বৈশিষ্ট্য, শেক্সপিয়রের নাটকের ডায়লগ, জীবনানন্দ দাশের কবিতার বাকভঙ্গি, জসীমউদ্দীনের স্বদেশ চেতনা, জয়নুল আবেদিনের চিত্রকলা, কাইয়ুম চৌধুরীর গ্রাফিক্স, জহির রায়হানের চলচ্চিত্র, খান আতার গানের সুর, বাংলাদেশের নদী ও নিসর্গ, মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, বঙ্গবন্ধু, এসবই আপনার প্রিয় বিষয়। আপনার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট হওয়া সত্ত্বেও চ্যানেল আইতে এলে দ্বিধাহীনভাবে আমার রুমে এসে বসেন। বলেন, তোমরা আমার সন্তানের মতো। এ আমার পরম পাওয়া। সাহিত্যের নানা পথ ও মত নিয়ে কথা বলতেন। আমি বা আহমাদ মাযহার বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন করে উসকে দেয়ার চেষ্টা করি। হক ভাই, আপনি অনেক স্মার্ট। অনেক আধুনিকমনস্ক ব্যক্তি। যখনই প্রশ্ন করতে যাই, মৃদু হাসেন। বলেন রাখো এসব। কী যে বলো না তোমরা। প্রশংসায় লজ্জা পান।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

হক ভাইয়ের কর্মময় জীবনের দিকে তাকালে বিস্ময়ে হতবাক হই। এর কোনো কুলকিনারা পাই না। স্বর্ণপ্রসব লেখক তিনি। কবিতা লিখেছেন শ্রেষ্ঠত্বের আসনে। মুক্তিযুদ্ধের গল্প, উপন্যাস একা তিনিই লিখেছেন অসংখ্য। অনুবাদ-প্রবন্ধ-নিবন্ধ, স্মৃতিকথা, সাহিত্য বিষয়ক কলাম, আর নাটক, সবখানেই তাঁর সাফল্য আকাশচুম্বী। গোল্ডেন টাচ যাকে বলে আর কি! সুশৃঙ্খল, নিয়ম মেলে চলা ব্যক্তি তিনি। কোনোকিছু অতিরঞ্জন করেননি। একদিন আমরা তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, হক ভাই আপনার ৮০ বছরেও এরকম সুঠাম শরীর, চমৎকার ফিগার রক্ষা করার রহস্য কী?

হক ভাই চেয়ারের হাতলে একটু ঝুঁকে বাম হাত নাড়িয়ে বললেন, শোনো আমার বাবা তো চিকিৎসক ছিলেন। তিনি বলতেন, বাবা যখনই কিছু খাবা তখন পেট কিছুটা খালি রেখে খাবা। পুরো পেট ভরে খেতে নেই। আমি সারাজীবন বাবার এই কথা মেনে চলেছি।

বহু দুপুর আমরা হক ভাইয়ের সঙ্গে কাটিয়েছি। রেকর্ডিং কিংবা কোনো সাহিত্য সম্মেলনে কিংবা ঢাকা কলকাতা বইমেলায়। চ্যানেল আই কার্যালয়ে চ্যানেল আইয়ের নানা অনুষ্ঠানে ইভেন্টে ভক্ত-হৃদয় নিয়ে হক ভাইয়ের পাশে পাশে থেকেছি। তার জাদুকরি কথার সম্মোহনে বিস্ময়াক্রান্ত হয়ে স্তব্ধ হয়ে গেছি। হক ভাই আপনার জানার পরিধি ও উপলব্ধির জগৎ ও অনুভবের হৃদয়ের কোনো তুলনা হয় না। আপনার এত স্মৃতি, এত কথা, এত অনুরণন, এত আড্ডার উপাখ্যান, এক সঙ্গে সব এসে ভিড় করছে। আপনার হাজার হাজার কথা আমার কানে গুন গুন করছে। আপনি ঠাট্টা করে বলেন, বালকদিগের সর্দার।

কলকাতায় এইতো সেদিন আপনার সঙ্গে ঘুরতে বেরিয়েছি। আপনি আর আমি এক সঙ্গে। কলকাতার ভাড়া ট্যাক্সিতে চড়ে গেলাম পার্ক সার্কাসের কোয়েস্ট মলে। মল দেখে আপনি খুশি। কলকাতাও দ্রুত উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছে। কোয়েস্ট মলে দামি দামি বিখ্যাত ব্র্যান্ড রয়েছে। এক দোকানে প্রবেশ করে একটা মোদী কোটের দাম জিজ্ঞেস করলেন। সিল্কের তৈরি নীল রঙের জ্যাকেট। দাম আশি হাজার টাকা। আপনি উপহাস করে বললেন, মার্কেট ইকোনমির এই ধন্দের মধ্যে আমরা প্রত্যেকে দিশেহারা। কেন আশি হাজার টাকা হবে? হক ভাই আপনি জানতে চাইলেন এই শপিং মলে কোনো বইয়ের দোকান নেই? আমি আপনাকে অতি উৎসাহের সঙ্গে স্টারমার্ক-এ নিয়ে গেলাম। আপনি বইয়ের দোকান দেখে খুব খুশি হলেন। র‌্যাক ঘুরে ঘুরে বই দেখতে লাগলেন। যতদূর মনে পড়ে আপনি পেইন্টিং, নাটক ও দুচারটে কবিতার সংকলন কিনলেন। বের হওয়ার সময় আপনি বললেন, একটু কফি খেতে চাই। কে খাওয়াবে আমীরুল?

আমি খাওয়াতে চাই বলে লাফ দিয়ে উঠলাম। কফির দোকানে বসে নানা বিষয়ে স্বভাবসুলভ বাক্যালাপ করতে লাগলেন। একসময় উদাস স্বরে বললেন, আমীরুল ষাট বছর আগে যখন লেখালেখি করতে শুরু করি তখন কি ভেবেছি জীবনে এতদূর আসব? কোয়েস্ট মলে বসে বসে কফি খাব। ভাবিনি আমীরুল। এত সম্মান পাব ভাবিনি। এত প্রাপ্তি হবে ভাবিনি।

শিশুর মতো কথা বললেন আপনি। উদাস হয়ে কফিতে চুমুক দিচ্ছিলেন। আর স্মৃতিকাতরতায় ডুবে গেলেন আপনি।

হক ভাই, আপনি কাইয়ুম চৌধুরী, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, জহির রায়হান, ফজলুল হক, রাবেয়া খাতুন, শামসুর রহমান, আপনার এইসব বিখ্যাত বন্ধুদের গল্প বহুবার বলেছেন। পঞ্চাশ দশকের গল্প, ষাট দশকের ঢাকা শহরের বিকাশ, সাংস্কৃতিক আন্দোলন, একাত্তর, মুক্তিযুদ্ধ, সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, কবিতা আন্দোলন, নাট্য আন্দোলন, চলচ্চিত্র উন্নয়ন, নানা বিষয়ে অফুরন্ত আলোচনা করলেন।

আমরা মুগ্ধ শ্রোতা। হক ভাই, আপনি তো ম্যাজিশিয়ান। জাদুকরের মতো অনর্গল কথার জোনাকিরা ঝরে পড়তে থাকে। বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে কী অনায়াসেই না আপনি যাতায়াত করতে থাকেন। সাহিত্যের সকল বিষয়ে আপনি উৎসুক। আলোচিত যেকোনো নতুন বই সম্পর্কে আপনার পূর্ণাঙ্গ ধারণা থাকে। আমাদের সঙ্গেও কত বই নিয়ে আলোচনা করেছেন। একটি শব্দ, শব্দের ব্যাখ্যা, অভিধা ও ব্যাঞ্জনা কী সুন্দরভাবেই না আপনি আমাদের ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দেন।

বিজ্ঞাপন

সেই আপনি হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছেন। ব্যাধি আপনাকে ক্লান্ত করতে পারে না। আপনার আদর্শ বিশ্বাস ও মূল্যবোধ থেকে আপনি কখনো সরে দাঁড়ান না। অকুতোভয় সৈনিকের মতো। শুধু সব্যসাচী লেখক নন, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সামাজিক ব্যক্তিত্ব, নানা অভিধায় আপনি পূজনীয়। এক বর্ণময় জীবন আপনার। সাহিত্যে, মঞ্চ নাটকে, চলচ্চিত্রে, গান-রচনায়, আপনার পদভারে সব মুখরিত।

আপনি শয্যাশায়ী। দীর্ঘ পাঁচ মাসের অধিক। লন্ডন আপনার প্রিয় শহর। সেখানে চিকিৎসা শেষে এখন ঢাকায় শান্ত শীতল হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছেন। এবং দর্শনার্থীদের সঙ্গে জীবন-জয়ী পরিহাস করে যাচ্ছেন। মৃত্যুকে জয় করার অদম্য আকাঙ্ক্ষা আপনার।

এই লেখা লিখতে গিয়ে হাজারও স্মৃতি পাখা মেলছে। ‘আমি বইয়ের কথা বলছি’ শিরোনামে ৫ মিনিট ব্যাপ্তিকালের এক অসাধারণ অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করছিলেন চ্যানেল আইতে। ভাগ্যক্রমে অনুষ্ঠানটির প্রয়োজনায় ছিলাম আমি। হক ভাই, আপনি নিজে বই বাছাই করতেন। আমরা যদি কখনো কোনো বই অনুরোধে আদিষ্ট হয়ে আপনাকে দিতাম, আপমি মৃদু হেসে উপেক্ষা করতেন। রাখো পরের বার রেকর্ডিং-এ এই বই সম্পর্কে বলে দিব। কিন্তু সেই বলা আর হতো না। এক কাপ কফি ও একটা বা দুটো বিস্কুট খেয়ে দুপুরের পর আপনি রেকর্ডিং শুরু করতেন। একটানা দশটা বই সম্পর্কে আপনি বলে যেতেন। অতি স্বচ্ছভাবে, তীক্ষ বাক্য গঠনে আপনার কথন ভঙ্গিতে অনুপম হয়ে উঠতো সেই রসজ্ঞ বই-আলোচনা। অনুষ্ঠানটি সুধীমহলে ব্যাপক আলোচিত হয়।

তখন রেকর্ডিং-এর আগে আমি-মাযহার মিলে হক ভাই আপনার সঙ্গে অনেক কথা বলতাম। আপনি আমাদের চপল-চতুর প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতেন সরল-হৃদয়ে। বিশ্বসাহিত্য আপনার নখের আয়নায়। অসাধারণ মেধাবী আপনি। চিন্তাশীল ব্যক্তি। কথার মধ্যে সেই চিন্তাশীলতার ছাপ পাওয়া যায় প্রতিমুহূর্তে।

একদিন কথাচ্ছলে বলেছিলাম, হক ভাই, মৃত্যু সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?

হক ভাই, আপনি তখন বললেন, শোনো আমাদের এক স্কুল শিক্ষক বলেছিলেন জন্মের সময় একমাত্র মৃত্যুই নির্ধারিত থাকে। তাই যা অবধারিত তা নিয়ে ভাবতে নাই। সেই শিক্ষকের কথা আমি সারাজীবন মনে রেখেছি। মৃত্যুভয় নেই আমার।

হক ভাই সত্যিই আপনি মৃত্যুঞ্জয়। করাল ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েও আপনার মধ্যে কোনো মলিনতা নেই।
আপনি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে শুয়ে আছেন। আপনার উদ্দীপিত উপস্থিত থেকে আমরা বঞ্চিত হচ্ছি। চ্যানেল আই আয়োজিত রবীন্দ্র, নজরুল, বিজয় বা প্রকৃতি মেলার উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিতি, হাজার কণ্ঠে বর্ষবরণে আপনার উপস্থিতি, শহিদ মিনারে কোনো অনুজ ব্যক্তিত্বের লাশ বহনকারী আপনি, বাংলা একাডেমির বক্তৃতা মঞ্চে বক্তৃতারত আপনি, জাতীয় কবিতা পরিষদের অনুষ্ঠানে আপনার সরব পদচারণা, দুপুরের ঢাকা ক্লাবের ক্যাফেটেরিয়ায় আড্ডারত আপনি এবং চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে আপনার উপস্থিতি, প্রতিদিন মনে পড়ে আমাদের।

প্রিয়, শ্রদ্ধেয় হক ভাই, কবে দেখা হবে আপনার সঙ্গে চ্যানেল আইতে? লাল পাঞ্জাবি পরে আপনি পহেলা বৈশাখের সন্ধ্যাবেলায় শেষ বারের মতো এসেছিলেন আনন্দ আলোর প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে। চলচ্চিত্র সাংবাদিক হিসেবে আপনাকে সংবর্ধনা দেয়া হয়। সঙ্গে আনোয়ারা সৈয়দ হক ছিলেন। লাল টকটকে পাঞ্জাবি পরা সৈয়দ হককে সেদিন অসাধারণ দেখাচ্ছিল। সকালে আপনি বঙ্গবন্ধু সম্মেলন কেন্দ্রে হাজার কণ্ঠে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারেননি। শরীর ভালো বোধ হচ্ছিল না তাই।

পহেলা বৈশাখের সেই ভিড়ের মধ্যেও আপনি আমাকে একান্তে ডেকে নিলেন। আমার কাঁধে হাত রেখে মৃদু স্বরে বললেন, কাল লন্ডন যাচ্ছি। ঢাকার চিকিৎসকরা আর কিছু করতে পারছে না। লন্ডনে গিয়ে দেখিয়ে আসি। ফিরে এসে আবার বইয়ের কথা বলব। রেকর্ডিং করব। তুমি আমীরুল কিছু ভালো বই বেছে রেখো। মাযহারকেও বলেছি। ফিরে এসে দেখা হবে আমীরুল।

আমি কিন্তু এখানো কল্পনা করছি না যে, হক ভাই আপনার কোনো দুরারোগ্য ব্যাধি হয়েছে। আপনি ফিরে আসবেন। আমরা আবার অনুষ্ঠান করবো। কিন্তু আপনি ঢাকায় ফিরেও হাসপাতালের নিবিড় শীতল শয্যায় শুয়ে রইলেন। আমার অনুষ্ঠানগুলোর কী হবে? আপনি তো আমাদের অভিভাবক। চ্যানেল আইয়ের কোনো কাজ তো আপনাকে ছাড়া সূচনা হয় না। আপনার অসুস্থতার জন্যে আমাদের অনেক কার্যক্রম স্থগিত হয়ে আছে। হক ভাই, কবে আপনাকে আবার আমাদের প্রাঙ্গনেই পাব? অপেক্ষায় আছি।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)