চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

স্বাধীনতার ৫০ বছর: আমাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

২৫ মার্চ, ২০২১। আমাদের মহান মুক্তি সংগ্রামের সুবর্ণজয়ন্তী। রক্তসাগর পাড়ি দেয়ার ৫০তম বার্ষিকীতে পদার্পণ করলো আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। আজ থেকে ঠিক ৫০ বছর আগে আজকের এই ২৫ মার্চ এর কালরাতে এক নৃশংস গণহত্যার শিকার হয়েছিল বাঙালি। এর আগে থেকেই দুই হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে আবারো মুক্তির নেশায় পাগল হয়ে উঠেছিল বাঙালি জাতি। রাজারবাগ, পিলখানা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম প্রতিরোধেই জ্বালিয়ে দিয়েছিল স্বাধীনতার অগ্নিমশাল।

সেদিন রাতে সারা জাতির রক্তরোদন দেখেই আহমেদ ছফা বলে উঠেছিলেন: ‘রক্তভেজা অন্ধকারে থমকে দাঁড়ায় রাত আদ্দিকালের ইতিহাস বাড়ায় লোহার হাত।’

বিজ্ঞাপন

দেড় হাজার বছর আগে কর্ণাটক থেকে আগত সেন রাজাদের হাতে পাল রাজাদের পতনের মধ্য দিয়ে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য হয় অস্তমিত। পরবর্তীকালে মোগল, পাঠান, শক, হুন, পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, ব্রিটিশ এবং পাকিস্তানের শত শত বছরের শোষণ ও বঞ্চনার গোলামীর জিঞ্জির ছিন্ন করে লাল সবুজের বিজয় নিশান ছিনিয়ে এনেছিলেন আমাদের পূর্বপুরুষ বাংলার দামাল সন্তান মুক্তিসেনারা। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বজ্রকন্ঠের আহ্বানে সেদিন মুক্তির নেশায় পাগল হয়ে উঠেছিল পুরো জাতি ছাত্র-শিক্ষক জনতা-পুলিশ নির্বিশেষে। ঘরে ঘরে গড়ে উঠেছিল প্রতিরোধের দুর্গ। যে দুর্গ ভাঙতে সমর্থ হয়নি নিজেদেরকে শ্রেণী সামরিক শক্তি হিসেবে মনে করা পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীও। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের এসেছিল স্বাধীনতা। আর আজ সেই স্বাধীনতার ৫০ বছর।

বাঙালি কেন স্বাধীনতা চেয়েছিল? বাংলাদেশ কেন স্বাধীনতা চেয়েছিল? তা নিয়ে অনেকে অনেক কথাই বলেছেন। তবে সবচেয়ে চমৎকার ব্যাখ্যাটি সম্ভবত দিয়েছিলেন হুমায়ুন আজাদ স্যার, ‘আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম?’ বইটিতে। সেটি থেকে সামান্য উদ্ধৃতি দিচ্ছি।

‘পাকিস্তান চাইনি বলে আমরা আমাদের একটি দেশ চেয়েছিলাম, যা আমাদের আপন, যার মাটি নদী আকাশ গ্রাম নগর ধানক্ষেত খাল বিল কাঁঠাল পাতা আমাদের, যা স্বাধীন, যাকে আমরা সৃষ্টি করে নেবো আমাদের শ্রেষ্ঠ বিকাশের জন্যে, আমাদের কল্যাণের জন্যে। আমাদের পিতারা জন্মেই শাদা প্রভুদের দেখছিলো, তারা উদ্বাস্তু ও দাস ছিলো নিজেদের দেশে, এবং আমরা জন্মেই আরেক ধরণের প্রভু দেখেছিলাম, যারা ছিলো শাদাদের থেকে অনেক নিকৃষ্ট। একটি ক্লাইভ ও একটি আইয়ুব-ইয়াহিয়ার মধ্যে পার্থক্য মানুষ ও জন্তুর। শাদাদের শিক্ষা ও সভ্যতা ছিলো, তাদের অত্যাচারের মধ্যেও ছিলো এক ধরণের মনুষ্যত্ব, যা পাকিস্তানি বিশাল দেহের অসভ্যদের ছিলো না।

আমাদের পিতারা একটি মারাত্মক ভুল, অপরাধ করেছিলো, তারা বাঙলাকে পাকিস্তান করে তুলেছিলো। পাকিস্তানের প্রভুদের অধীনে তারা হয়েছিলো থুতুপায়ী গোলাম। গোলামিকেই তারা স্বাধীনতা মনে করেছিলো, কায়েদে আজম- কায়েদে মিল্লাত জাতীয় নোংরা হামদ-নাতে তারা মুখর হয়েছিলো, এবং আমাদের গোলামের সন্তানে পরিণত করেছিলো। আমরা গোলামের সন্তান থাকতে চাইনি, দাস থাকতে চাইনি, বলেই সৃষ্টি করেছিলাম বাঙলাদেশ।’

গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র এবং জাতীয়তাবাদ এই চার নীতির উপর ভিত্তি করে আজ হতে ৫০ বছর আগে এসেছিল স্বাধীনতা। কিন্তু সেই স্বাধীনতার কতটুকু সুফল ভোগ করতে পেরেছি আমরা? কতটুকু পূরণ হয়েছে আমাদের প্রত্যাশা? আজ জাতির কাছে, নব প্রজন্মের কাছে সেটি অনেক বড় একটি প্রশ্ন। গণতন্ত্রের কথা যদি বলি, বারবার সামরিক স্বৈরাচার এসে নস্যাৎ করে দিয়েছে আমাদের সকল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। জাতির পিতাসহ দু’জন রাস্ট্রপতি প্রাণ হারিয়েছেন সামরিক অভ্যুত্থানে। প্রাণ হারিয়েছেন অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ও সৈনিক। যার অনেকগুলির বিচারই রয়ে গেছে প্রশ্নবিদ্ধ। যার কারণে ৯০ সালে আবারও গর্জে উঠেছিল বাঙালি ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’ শ্লোগানে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে। যেভাবে গর্জে উঠেছিলো শাহবাগে ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে। ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল অপর একটি মূল স্তম্ভ। কিন্তু স্বাধীনতা বিরোধীদের খুশি করতে গিয়ে সামরিক জান্তারা কাটছাঁট করে দিয়েছে সংবিধান থেকে সেটিকেও। সমাজতন্ত্র হয়েছে ব্যর্থতায় পর্যবসিত সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনে। আর জাতীয়তাবাদ রয়েছে নামেমাত্র আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ।

অর্থনৈতিকভাবে বা অবকাঠামোগতভাবে বা রাষ্ট্রীয়ভাবে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের এক রোল মডেল আজ সারা বিশ্বে। অথচ এদেশের জন্মের সময়ে হেনরী কিসিঞ্জার মন্তব্য করেছিলেন একে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে। এক সময়কার শুধুমাত্র পাট ফলানো, প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত, তলাবিহীন রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ নামের এই দেশটি আজ বিশ্বের দরবারে সম্মানের সাথে মাথা উঁচু করে আছে। বেড়েছে শিক্ষার হার, বেড়েছে কর্মসংস্থান, রপ্তানি বাণিজ্য। প্রভূত উন্নতি হয়েছে শিক্ষা স্বাস্থ্য খাতে। হয়তো যতটুকু আশা করেছিলাম সকলে ততটুকু হয়নি, কিন্তু যা হয়েছে তাও নেহায়েত কম নয়।গ্রেপ্তার

আবার অন্যদিকে দেখতে পাই, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে ধর্মান্ধতা এবং মৌলবাদের বিষবাষ্প! পাকিস্তানের ‘ওয়ান কান্ট্রি টু নেশন থিওরি’কে রক্তের বিনিময়ে ভাসিয়ে দিয়ে যে ধর্মনিরেপক্ষ বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল সেই বাংলাদেশ আজ প্রকম্পিত মৌলবাদের আতঙ্কে! এ দেশেই আমরা দেখেছি হলি আর্টিজান ম্যাসাকারের মতো নির্মম হত্যাকাণ্ড!! আমরা দেখেছি ৬৪ জেলায় বোমা বিস্ফোরণে কেঁপে উঠতে সারাদেশ! আমরা দেখেছি বাংলা ভাই, আব্দুর রহমানদের উত্থান। আমরা দেখেছি সুপ্রিম কোর্টের সামনে থেকে লেডি জাস্টিসিয়ার অপসারণ। দেখেছি মৌলবাদী শক্তির দাবির মুখে বদলে যেতে পাঠ্যপুস্তক। আমরা দেখেছি মুক্তমনা ব্লগারদের হত্যাকাণ্ড, ঘটতে দেখেছি রামু, নাসিরনগর, রংপুর, মুরাদনগর, ভোলা, সর্বশেষ শাল্লার মতো সংখ্যালঘুদের উপরে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক হামলা, দেখেছি লেখক-প্রকাশকদের উপরে হামলা, দেখেছি অসংখ্য হত্যাকাণ্ডের বিচারের বাণী নীরবে কাঁদতে! প্রত্যাশা-প্রাপ্তির মাঝে যে রয়ে গেছে যোজন যোজন ব্যবধান স্বাধীনতার ৫০ বছরে, সে কথা বলাই বাহুল্য !

তবু আমরা স্বপ্ন দেখি একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আবারও একটি সত্যিকারের শোষণমুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, বঞ্চনামুক্ত দুর্নীতিবিহীন একটি জাতি রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশে যেন প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্ব দরবারে। একাত্তরের মতো আবারো আমরা যেন বলতে পারি:

‘চাষাদের মুটেদের মজুরের, গরিবের নিঃস্বের ফকিরের,
আমার দেশ সব মানুষের সব মানুষের’

সর্বক্ষেত্রে যেন প্রতিষ্ঠিত হয় ন্যায়বিচার। শুনতে যেন নাহয় মৌলবাদের হুঙ্কার, মুক্তি ঘটে দারিদ্র্যের কষাঘাত থেকে। বিকাশ ঘটে যেন মুক্তবুদ্ধি চর্চার। যেখানে শত ফুল ফুটবে, শত পাখি গাইবে বিজয়ের গান। স্বাধীনতার সুবাতাসে ভরে উঠবে প্রতিটি নাগরিকের সুখী গৃহকোণ। স্বাধীনতার ৫০তম বছরে ৭১ এর সকল বীর শহীদের আত্মবলিদান এবং পূণ্য স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা অভিবাদন এবং স্যালুট জানিয়ে ভবিষ্যতের সমৃদ্ধশালি বাংলাদেশের প্রতীক্ষায় রইলাম। হুমায়ুন আজাদ স্যারের ভাষায়- ‘বাঙালি বাঙালি হয়ে উঠেছিল সেই ৭১ এ’। আবারো বাঙালি যেন বাঙালি হয়ে ওঠে, ভুলে যায় সকল বিভেদের বেড়াজাল, সেই প্রত্যাশাই করি কায়মনোবাক্যে। কবি আসাদ চৌধুরীর মতো আক্ষেপ নিয়ে যেন বলতে না হয়:

‘এখন এসব কল্পকথা, দূরের শোনা গল্প,
সত্যি সেদিন মানুষ ছিলাম, এখন আছি অল্প’

সবাইকে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)