চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সেই দিনের মানিক মিয়া এভিনিউ

ফ্ল্যাশব্যাকে টাইগার ক্রিকেট (পর্ব-৪)

১৪ এপ্রিল, ১৯৯৭। স্বপ্নের আইসিসি ট্রফি জয়ের পর বাংলাদেশ দলের দেশে ফেরার দিন। সেবার বাংলা বর্ষবরণের উৎসব পেয়েছিল ভিন্নরকম এক আমেজ। রমনা বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠান কিংবা চারুকলার সামনে মঙ্গল শোভাযাত্রা দর্শনে নয়, রাজধানীবাসীর গন্তব্য ছিল মানিক মিয়া এভিনিউ। সেখানেই আইসিসি ট্রফিজয়ী দলকে দেয়া হয়েছিল গণসংবর্ধনা। ক্রিকেটের সাফল্য পুরো দেশকে গেঁথেছিল এক সুতোয়।

১৩ এপ্রিল মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের পর কেনিয়াকে হারিয়ে ট্রফি জয়। পরদিনই বিশেষ ফ্লাইটে দলকে দেশে আনার ব্যবস্থা করেন তৎকালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পহেলা বৈশাখের দিনটি যেন দেশের মানুষের সঙ্গে উদযাপন করতে পারেন, সেজন্য দ্রুততম সময়ের মধ্যেই ক্রিকেটারদের দেশে ফিরিয়ে আনা। ফেসবুক পোস্টে সেই দিনটির স্মৃতিচারণ করেছেন ক্রীড়া সাংবাদিক শামীম চৌধুরী। তার বর্ণনায় উঠে এসেছে ঐতিহাসিক দিনটির আদ্যোপান্ত।

বিজ্ঞাপন

ফ্ল্যাশব্যাক: পর্ব-১: মাশরাফীর তাণ্ডবে বাংলাদেশের প্রথম তিনশ, পর্ব-২: অবিশ্বাস্য বোলিং, হেরেও ম্যাচসেরা আফতাব, পর্ব-৩: যে স্মৃতি কখনো ভোলার নয়,

বিজ্ঞাপন

আইসিসি ট্রফি জয়ের পর অফিস থেকে পেলাম অ্যাসাইনমেন্ট, কাভার করতে হবে ক্রিকেটারদের সংবর্ধনা। ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষ, সেদিনই চার্টার্ড ফ্লাইটে আসবে বাংলাদেশ দল। সংবর্ধনায় বীর ক্রিকেট যোদ্ধাদের জন্য আসছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে বিশেষ অর্থ পুরষ্কার, তা জেনে গেলাম। বিমানবন্দরে ক্রিকেটারদের অবতরণ কাভার করতে ছুটে গেছেন অনেক ক্রীড়া সাংবাদিক। সেখানে গেলে গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠান কাভার করতে পারব না। তাই বিমানবন্দরে ক্রিকেটারদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান কাভারের সিদ্ধান্ত দিলাম বাদ। পরে শুনেছি, হাজার হাজার মানুষের ভিড়ে বাংলাদেশ বিমানের বিশেষ ফ্লাইটে ক্রিকেট দলের অবতরণের সময় বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল। বিমানবন্দরের রানওয়ে, টারমার্কও ছিল লোকে লোকারণ্য। সেখানের ভিড় ঠেলে মানিক মিয়া এভিনিউতে আসতে লেগে গেছে অনেকটা সময়।

বিজ্ঞাপন

নোটবুক নিয়ে ছুটে গেলাম মানিক মিয়া এভিনিউতে। তখন মানিক মিয়া এভিনিউতে সড়কদ্বীপ ছিল না। সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় বিশাল মঞ্চ তৈরি হয়েছে। সেখানেই ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে দেয়া হবে ক্রিকেটারদের নাগরিক সংবর্ধনা। তখন দেশে কোনো বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল ছিল না। এফএম রেডিও ছিল না। তাই রোদের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে ক্রিকেটারদের আগমনের আপডেট জানতে অপেক্ষা করতে হয়েছে। ভাগ্যটা ভালো। সাংবাদিক এবং ক্রীড়া সংগঠকদের জন্য মঞ্চের ঠিক সামনে রাখা হয়েছিল বেশকিছু ডেকোরেটর চেয়ার। পুতুল আপা ( নারী ক্রীড়াবিদ, ক্রীড়া সংগঠক ও ক্রীড়া লেখক পারভিন নাসিমা নাহার)। তার পাশের চেয়ারটি পেলাম বসতে। তখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জন্য পাবলিক মিটিংয়ে এতোটা নিরাপত্তার ব্যবস্থার প্রয়োজন হতো না। মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে স্ক্যানিংও হতে দেখিনি সেদিন।

শামীম চৌধুরী

সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শুরুর অনেক আগে সেখানে পৌঁছাতে পেরেছিলাম বলেই পেয়েছিলাম ঠিক মঞ্চের সামনের চেয়ার। সাধারণত পাবলিক সভায় সাংবাদিকদের জন্য চেয়ারের পাশাপাশি টেবিলেরও ব্যবস্থা থাকে। কিন্তু সেদিনের অনুষ্ঠানে ছিল না সাংবাদিকদের নোট নেয়ার জন্য টেবিল। পহেলা বৈশাখে সাধারণ ছুটি বলে সেদিন নিউজ লেখার তাড়া ছিল না। মঞ্চ থেকে আমার চেয়ারটির দূরত্ব হবে বড়জোর ১০ হাত। প্রধানমন্ত্রী কীভাবে, কোন অভিব্যক্তিতে দ্রুত মঞ্চে উঠলেন, সে দৃশ্য এখনো ভাসছে চোখের সামনে।

পেছনে তাকিয়ে দেখি লাখ লাখ মানুষ। খামার বাড়ি থেকে ধানমন্ডি বয়েজ হাইস্কুল লোকে লোকারণ্য। অনেকের হাতে বাংলাদেশের পতাকা। পয়লা বৈশাখের সব আলো থাকার কথা রমনা বটমূলে ইলিশ-পান্তা, ছায়ানটের অনুষ্ঠান, চারুকলা ইন্সটিটিউটের সামনে মঙ্গল শোভাযাত্রা আর শাহবাগের মোড় থেকে একদিকে মৎস্য ভবন, অন্যদিকে হাইকোর্ট মাজারের প্রধান গেট পর্যন্ত। কিন্তু একি! বাংলা নববর্ষ বরণে চিরায়ত দৃশ্য অনুপস্থিত। সব আলো মানিক মিয়া এভিনিউতে, বিশাল সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে। ক্রিকেটারদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান পরিণত হয়েছে জনসমুদ্রে।

একে একে ক্রিকেটাররা আসছেন, হাত নেড়ে দর্শকের অভিবাদনের জবাব দিচ্ছেন। মঞ্চে তাদের জন্য চেয়ার না থাকায় সামনের সারিতে বসে পড়ছেন আকরাম খানরা। প্রধানমন্ত্রী দিলেন ঐতিহাসিক বক্তব্য, বাংলাদেশের ক্রিকেটের উন্নয়নে সর্বাত্মক সহযোগিতার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে দিলেন আশ্বাস। আইসিসি ট্রফিজয়ী স্কোয়াডের সবাইকে ৫ লাখ টাকা করে অর্থ পুরষ্কারের ঘোষণা দিলেন। বাদ গেলে না আইসিসি ট্রফির রেডিও ধারাভাষ্য প্যানেল। তারাও পেলেন ৩ লাখ টাকা করে। বাংলাদেশ দলের কোচ গর্ডন গ্রিনিজকে দেয়া হল অনারারি নাগরিকত্ব। সর্বকালের সেরা মুষ্টিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলীর পর গর্ডন পেলেন এই সম্মান। সব ক্রিকেটারের হাত এক করে উপস্থিত জনতার উদ্দেশে তিনি বললেন, ‘লেডিজ এন্ড জেন্টলম্যান। দিস ভিক্টরি ইজ ফর ইউ।’