চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘সুযোগ ছিলো বিশাল কিছুর, কিন্তু তিনি গানকে বেছে নিয়েছিলেন’

মানিকগঞ্জের হরিরামপুর থানার যাত্রাপুর গ্রামে চিরনিদ্রায় শায়িত জনপ্রিয় শিল্পী জানে আলম…

‘একটি গন্ধমের লাগিয়া/ আল্লাহ বানাইলো দুনিয়া। আদম খাইলো আর হাওয়ায় খাইলো/ ইবলিশ শয়তানে তার আশা পুরাইল।’- বাংলায় তুমুল জনপ্রিয় একটি গান। যার স্রষ্ঠা সদ্য প্রয়াত শিল্পী, সুরকার ও গীতিকার জানে আলম। তার গাওয়া অসংখ্য গান মানুষের মুখে মুখে। তার চলে যাওয়ায় গানের জগত যেন বিষাদগ্রস্ত। ঘনিষ্ঠ বন্ধু থেকে এই প্রজন্মের শিল্পী, গীতিকার ও সুরকাররা স্মরণ করছেন তাকে।

অথচ তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু প্রখ্যাত গীতিকবি হাসান মতিউর রহমান বললেন অন্য কথা। সদ্য হারানো বন্ধুকে নিয়ে স্মৃতি চারণ করার মুহূর্তে চ্যানেল আই অনলাইনের কাছে বললেন, ‘গান অন্ত প্রাণ মানুষ ছিলেন জানে আলম। জীবনে সে কিছুই করেনি, গান ছাড়া। সুযোগ ছিলো বিশাল কিছুর, কিন্তু তিনি গানকে বেছে নিয়েছিলেন। ভালো ভালো সব প্রস্তাব পেয়েছিলেন। বিরাট চাকরির অফারও ছিলো তার। কিন্তু সেসব নাকচ করে গান নিয়ে ছিলেন জানে আলম।’

জানে আলমের সাথে ১৯৭৮ সালে প্রথম পরিচয় হাসান মতিউর রহমানের। সেই সময়ের পরিচয়ের কথা উল্লেখ করে গুণী এই গীতিকার জানান, সেই সময়ে তিনি স্টেজে গান করেন। আর আমি তখন কেবল ঢাকায় এসেছি। গীতিকার হওয়ার জন্য এদিক সেদিক ছোটাছুটি করি। গানের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে খোঁজ খবর রাখি- ঠিক সেই সময়ে জানে আলমের সাথে আমার প্রথম পরিচয়। ১৯৮১ সালে আমি রেডিও ও টেলিভিশনে গীতিকার হিসেবে তালিকাভুক্ত হলাম, তখন আমার লেখা গানও তিনি গেয়েছেন।

গেল জানুয়ারিতে হাসান মতিউর রহমানের স্টুডিওতে জানে আলম

হাসান মতিউর বলেন, পরিচয় থেকে ধীরে ধীরে আমাদের বন্ধুত্ব আরো গাঢ় হয়। এরপর আমরা ক্যাসেট কোম্পানি করলাম, তিনি করলেন দোয়েল প্রোডাকশন নামে আর আমি চেনাসুর নামে। সেসময় প্রতিদিনই রেকর্ডিং থাকতো। দেখা গেছে একদিন আমি তার স্টুডিওতে আছি, আবার অন্যদিন তিনি আমার স্টুডিওতে। সমন্বয় করে কাজ করি তখন। এভাবেই আমরা খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে গেলাম। খুবই আন্তরিক সম্পর্ক ছিলো আমাদের। এতো উদার মনের মানুষ আমি কম দেখেছি। অমায়িক মানুষ ছিলেন জানে আলম। সব সময় তার মুখে হাসি লেগেই থাকতো।

বিজ্ঞাপন

করোনাকালীন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ৩০টি গান সুর করেছেন জানে আলম। এমন তথ্য জানিয়ে হাসান মতিউর রহমান জানান, বঙ্গবন্ধুর শতবর্ষ উপলক্ষে জানে আলম সর্বশেষ একটি উদ্যোগ নিয়েছিলেন। উদ্যোগটি হলো বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ৩০টি গানের অ্যালবাম। করোনাকালীন সময়েই এর কাজ শুরু করেন তিনি। অ্যালবামটির নাম তিনি রেখেছিলেন ‘শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ সন্তান’। বেশ কয়েকজন মিলে গানগুলো লিখেছেন। এরমধ্যে আমার চারটি গান ছিলো, মিল্টন খন্দকারের লেখা গান ছিলো, প্রদীপ সাহাও লিখেছেন। অনেকের লেখা। ৩০টি গানেরই সুর করেছিলেন তিনি নিজে। এমনকি গেয়েছিলেনও জানে আলম নিজে।

এ বিষয়ে তিনি আরো বলেন, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নিজ উদ্যোগে ৩০টি গানের কাজও শেষ করে ফেলেছিলেন জানে আলম। মাস্টার মিক্সও শেষ হয়ে গিয়েছিলো। বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকী উপলক্ষে অ্যালবাম প্রকাশনার উদ্বোধন করার কথাও এগিয়ে ছিলো অনেকটা। তার ইচ্ছা ছিলো বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে করা গানগুলো নিয়ে অ্যালবামটির প্রকাশনা উৎসবে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে যুক্ত করতে, কিন্তু তার আগেই জানে আলম চলে গেলেন।

চিরনিদ্রায় শায়িতা জানে আলম

মঙ্গলবার (২ মার্চ) রাত দশটার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান জানে আলম। মাস খানেক আগে তার করোনা পজিটিভ আসে। সুস্থও হয়ে উঠেছিলেন, করোনার ফলাফল নেগেটিভ এসেছিলো। এরপর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় অবস্থা বেশী খারাপ হওয়ায় লাইফ সাপোর্টে নেয়া হয় তাকে। এর কয়েক ঘন্টার মধ্যেই তিনি মারা যান।

হাসান মতিউর রহমান জানান, বুধবার সকাল ১০টার দিকে রাজধানীর মগবাজারের মধুবাগে জানে আলমের প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জের হরিরামপুর থানার যাত্রাপুরে। সেখানেই আসরের নামাজের পর দ্বিতীয় দফায় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

বিজ্ঞাপন