চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সীমান্ত এলাকায় ভয় ও আতঙ্ক নিয়ে বসবাস

সীমান্ত নিয়ে ইদানিং আমার কৌতূহল যেন পিছুই ছাড়ছে না। দেশের দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চলে বসবাসের কারণে মনে হয় নতুন কিছুতে আগ্রহটা একটু বেশিই। তার একটা কারণও আছে বটে। বেশ কয়েক মাস ধরে নিজেকে মোটামুটি একজন ভ্রমণপ্রিয় মানুষদের কাতারের একজন মনে হয়। ভ্রমণ সুবাদে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং পূর্বাঞ্চলের সীমান্তবর্তী বেশ কিছু জেলাতে ঘুরেছি। এর আগে যে লেখাটি ছিল, সেটিও সীমান্ত নিয়ে। সীমান্তে ভারতীয় বাহিনীর হাতে নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড নিয়ে। এবার সীমান্ত নিয়ে লেখার বিষয়টির মোড় ঘুরিয়ে দিতে চাই।

ঢাকার একটি বেসরকারি রেডিও স্টেশনের এক অনুষ্ঠান থেকে খোঁজ মেলে দুই দশক আগে হারিয়ে যাওয়া আয়েশার (ছদ্মনাম)। আয়েশার কাছে তার পরিবারকে ফিরিয়ে দিতে আমার ক্ষুদ্র অংশগ্রহণ ছিল। রেডিও অনুষ্ঠানের পরই আয়েশার স্বামী মোবারক (ছদ্মনাম) রেগেমেগে আগুন। তুচ্ছ একটা বিষয়কে কেন্দ্র করে শেষ পর্যন্ত হাতের মুঠোফোনটিও মেঝেতে আছাড় দিয়ে ভেঙে ফেলেন! মুহূর্তেই নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। আহ, এ কী করলেন তিনি! ফিরিয়ে পাওয়া আয়েশার পরিবারকে গ্রহণে আয়েশার যে একটা হৃদ্যতা এবং আনন্দানুভূতি মোবারকের মাঝেও দেখার কথা ছিল, কিন্তু তা ঘটেনি। ঘটেছে এর বিপরীত। সর্বশেষ আমার সাথে থাকা বন্ধুটা আর আমি ঘণ্টাব্যাপী চেষ্টায় তাকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছি। তখন যেন তার মাথা কিছুটা ঠাণ্ডা হয়েছে। এবার ঠিকই দেখছি, ফিরে পাওয়া স্বজন নিয়ে দ্রুতই সিএনজি ভাড়া করছেন এবং সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল হয়ে বাসযোগে বাড়ি ফিরবেন। শেষে ফিরলেন।

বিজ্ঞাপন

একটা নিউজের এসাইনমেন্টে বেশ কিছুদিন পর আমাকে যেতে হবে মোবারকের বাড়িতে। গেলাম তার বাড়ি। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের সীমান্তবর্তী একটি এলাকায় তার বাড়ি। যখন সন্ধ্যা নামে তখনই আমি সেখানে গিয়ে পৌঁছি। সীমান্ত এলাকার কথা শুনে আমার মধ্যে এক ধরণের নার্ভাস ও কৌতূহলের সৃষ্টি হয়। যেভাবে প্রস্তুতি এবং ব্যক্তিগত পরিচয়পত্রটিও সাথে আনা হয়নি। কারণ, সীমান্তবর্তী এলাকায় আসতে হবে, তার কোন ভাবনা চিন্তাও ছিল না। তাদের পরিচয়ের সূত্র ধরে সেখানে যাই।

তারপর সন্ধ্যায় মোবারকের সঙ্গে রাস্তায় হাঁটছি এবং কৌশলে কিছু বিষয় জানার চেষ্টা করছি। জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা এই এলাকার কী অবস্থা ভাই। ‘মাল টাল’ যায় এখান দিয়ে? প্রশ্ন করতেই মোবারকের মুখ থেকে বের হতে দেরি হয়নি, কী বলেন ভাই। এখান দিয়ে সব হয়। আপনি ভোরবেলা দেখবেন, এখান দিয়ে ‘মাল’ যায়। মাদকদ্রব্য মদ, ইয়াবা, ফেনসিডিলকে স্থানীয় লোকজন মাল হিসেবেই জানে। তারপর তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা তাহলে এদের ধরে না? ধরে ভাই, ধরে। টাকা দিলে ছাইড়া দেয়! হাঁটতে হাঁটতে মোবারক আমাকে দেখালেন, এই যে মাত্র একজনকে দেখলেন না, গেল যে। বাস কাউন্টারের লোক। সে ডাইল খায়। শুনে আমি বিস্মিত হয়েছি, ডাইল মানে কী! মোবারক বললেন, ‘ফেনসিডাইল’ ভাই। আমার বুঝতে আর অসুবিধে হয়নি, মোবারক যে ফেনসিডিলের কথাই বলেছেন। বাড়ি গিয়ে ঘুরে ফিরে আবার তার সঙ্গে হাঁটতে লাগলাম। বললাম, আচ্ছা ভাই। আমি চাইলে ওসব খেতে পারবো? বলে, আরেহ না ভাই, এটার বিভিন্ন লোক আছে, লোকের মাধ্যমে আসে। এখানেও একটা বিষয় পরিষ্কার যে, বিভিন্ন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে এ মাদকদ্রব্য ছড়িয়ে পড়ে। একটা পর্যায়ে জানতে চাইলাম, আচ্ছা এসব যারা খায়, কিভাবে যে বুঝবো তারা খায়? কিভাবে বুঝবো লোকটা নেশাগ্রস্ত? দিনের বেলায় দেখবেন, যারা এসব খায়, তাদের চোখমুখ লাল, শুকিয়ে কঙ্কালের মতো হয়ে যাবে! বড় বিস্ময় একটা তথ্যই মিললো। আমার জন্য এটা বড় একটা অভিজ্ঞতার জন্ম দিল।

তারপর রাতে মোবারকের বাড়িতে ফিরি। রাতে গল্প হয়, তার স্ত্রীর সঙ্গে। সীমান্ত এলাকায় ভয় আর আতঙ্কগ্রস্ত বসবাসের অভিজ্ঞতা শুনালেন তিনি। আয়েশা (ছদ্মনাম) বললেন, রাতে ঘর থেকে বের হই না তো। এই যে, আমার দেবরটা আছে, সেও এগুলোর সাথে জড়িত। এগুলো খায়, বেচাকেনা করে। আয়-রোজগারও ভালো। একদিন রাতে নেশা করে আমার ঘরে ঢুকেছে। আমার চিৎকারের সে চলে যায়। কিন্তু শাশুড়ির কাছে বিচার দেবার পর, উনি বললেন, আমি বদনাম করি।

প্রসঙ্গক্রমে আয়েশার নিকটাত্মীয় দুইটা ছেলে ঘরে আসলেন, গল্প করছে তারা। সীমান্তের ওপারে যাওয়া যায় কিনা, জানতে চাইলাম। ওরা বললো, যাওয়া যায়৷ দুইটা বড় বড় চুঙ্গা আছে, আপনিও যেতে পারবেন। স্পর্শকাতর এবং অবৈধ প্রক্রিয়ার কারণে আমি যেতে রাজি হইনি। একপর্যায়ে তাদেরকে আয়েশা ইঙ্গিত করে বললেন, ‘ব্যবসা-টেবসাওতো ভালো চলে। আচ্ছা, কয়েক মাস আগে যে ওই বাড়ির জামালকে ধরে নিছে, কত লাগছে ছুটাইতে?’ ওরা বললো, ২০হাজার টাকা। তার মানে সীমান্তে চোরাকারবারি খুবই সহজ, যদি একটু মোটা অংকের টাকা ছিটানো যায়।

দিনের বেলার অপেক্ষা। এবার স্বচক্ষে অভিজ্ঞতা নিতে চাই। অভিজ্ঞতা নেবার জন্য সীমান্ত রেখার একটু কাছে যাবার ইচ্ছে প্রকাশ করি ওদের কাছে। ওরা আমাকে নিয়ে যায়। হেঁটে হেঁটে দেখায়। পূর্বের যে বড় দু’টি চুঙ্গার কথা বলেছে, সে দু’টি চুঙ্গাও ওরা আমাকে দেখিয়েছে। সীমান্ত যাবার পথে, এক তরুণকে দেখা গেল কিছু একটা সেবন করছে সে। সাথে সিগারেট খাচ্ছে লুকিয়ে লুকিয়ে। আমরা সীমান্তের খুব কাছে এগুলাম। কিছুক্ষণ পর লক্ষ করলাম, সীমান্তের একটা নির্জন এলাকাতে ওই তরুণ ছুটোছুটি করছে। বুঝতে আর বাকি কই!

বিজ্ঞাপন

বাড়ি ফিরলাম। মোবারকের বাবার সঙ্গে আয়েশার পরিবার প্রসঙ্গে কথা হচ্ছিল। তাদের কথাবার্তার অস্বাভাবিক ধরণ দেখে আমার বারবার সন্দেহ হয়। এরা কী আসলে সবাই মাদকাসক্ত? মোবারকের মা ভাত বেড়ে দিচ্ছেন তার ছোট ভাইকে। কোন কথা নেই তার। ভাত খাচ্ছে। মাঝে মাঝে তার মায়ের দিকে তাকাচ্ছে প্রবল আক্রমণাত্মক দৃষ্টিতে। মোবারকের কথা মতো আমি লক্ষ্য করলাম, কঙ্কালের মতো তার ভাইয়ের চেহরা ও শরীরটা। চোখমুখ আর তার আচরণ এবং বড় ভাবির অভিযোগই বলে দেয়, সে যে মাদকাসক্ত।

নিউজের কাজে সর্বশেষ মোবারকের একটা বক্তব্য নিতে হবে আমার। আগ থেকেই ঠিকঠাক সব কথা হচ্ছে। কিন্তু হঠাৎ মোবারক নিজেও রেগেমেগে আগুন। কিছুতেই তাকে স্বাভাবিকে আনতে পারছি না। খুব হাতজোড় করছি, তারপরেও। নিউজের জন্য তার বক্তব্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সর্বশেষ, তার কপালে একটা চুমো বসিয়ে বললাম, ভাই চলেন। তারপর সে রাজি হয়।

শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মোবারকের (ছদ্মনাম) আচরণ, তার ভাই, এমনকি তার বাবাকে নিয়েও আমার প্রশ্ন উঠেছে। আর প্রকাশ্যে দিবালোকে মাদক সেবনের মতো দৃশ্য চোখে দেখা, আমাদের জন্য ভয়ঙ্কর কোন পরিস্থিতির ইঙ্গিত বৈকি।

সীমান্ত নিয়ে শুরুতে যে লেখাটি লেখার ইচ্ছে প্রকাশ করছিলাম, তার জন্য মতামত জানতে সামাজিক মাধ্যমে কথা হচ্ছিল সীমান্তবর্তী লালমনিরহাটের পাটগ্রামে শিক্ষার্থী তাজনাহার লিজার সঙ্গে। সীমান্তে হত্যা নিয়ে জানতে চাইলে লিজা বললো: যেমন কর্ম, তেমন ফল, মরুক। আমি অবশ্য মানুষ হত্যাকে সমর্থন করি না। কিন্তু এই যে দেখেন, সীমান্তে কী না হচ্ছে! মাদক চোরাকারবারি, গরু চোরাচালানকারী এবং সীমান্ত এলাকায় ব্যাপক চুরি হয়। মানুষের জিনিসপত্র, গরু চুরি করে কারা?

এ ছাড়াও সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের আচরণ ও দেশের অন্যান্য এলাকার মানুষের তফাৎ, আমাদের অনেক কিছু জানিয়ে দেয়। সীমান্ত এলাকার মানুষদের আমার কাছে বরাবরই এখন হিংস্র মনে হচ্ছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া দেশের একটি সীমান্ত এলাকা। গ্রামে গ্রামে মানুষের হিংস্রতা এবং রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের জন্য এ জেলাটি ব্যাপক আলোচিত।

সম্প্রতি ভ্রমণে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরেও গিয়েছিলাম। পড়ন্ত বিকেলে হাওরে ঘুরবো। সে উদ্দেশ্যে একটা নৌকার সাথে মোটামুটি কথাবার্তা হলো। নৌকা আসবে, এরই মাঝে হাওরে শুরু হলো হট্টগোল। কেন, কী হলো? দেখি যে, হাওরে মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে দুই দল গ্রামবাসীর মধ্যে মুহূর্তেই সংঘর্ষ লেগে গেল। এসব সংঘর্ষে ব্যবহার হয় টেঁটার৷ দেখে, এত সৌন্দর্যে ভরপুর এলাকার মানুষের আচরণে এত অমিল কেন?

বিশ্লেষণ করে দেখলাম, সীমান্ত এলাকাতে মাদকের সহজলভ্যতা এবং হাত মেললেই মাদকের ছড়াছড়ির কারণেই হয়তো, সীমান্ত এলাকার মানুষের মাঝে আচরণের ভয়ঙ্কর একটা দিক উঠে আসছে। এসব ঘটনা হয়তো, এমন হাজারও ঘটনার প্রমাণ রাখি। যদিও, আমি সীমান্ত এলাকার সব মানুষগুলোকে খারাপ বলতে নারাজ এবং সবাই যে তাতে সাপোর্ট দিচ্ছেন, সেটাও আমি বলতে পারবো না। তবে, একথা সত্য যে, সীমান্ত এলাকা নিয়ে আমার খুব ভয় হয়, খুব। যতদিন সীমান্তে মাদকের অহরহ বিস্তার ঠেকানো সম্ভব না হবে, ততদিন এ ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকেই যাবে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)