চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সন্তানের ইন্টারনেটে গেমস আসক্তি-দায় কার?

রবি আর তুলির ব্যস্ত জীবনে বিলুর জন্য সময় খুব কম। বিলুর স্কুল আর মোবাইল নিয়ে কাটে সময়। তুলি অফিস ফিরে ঘরের কাজ আর ছেলে বিলুর স্কুলের পড়া শেষ করে নিজের জন্য তেমন সময় পায় না। আর যেটুকু পায় তখন ব্যস্ত হয় ভার্চুয়াল বন্ধুদের আড্ডাতে। অন্যদিকে বিলুর বাবা রবি ঘরে ফিরে ও ব্যস্ত থাকে নিজের অফিসের কাজে বা বন্ধুদের সাথে নেটে। ছেলের জন্য তারও সময় নেই। ৩ জনের পরিবারে বিলুর ট্যাব হলো তার নীরব বন্ধু ।

তুলি অনেকটা শখের বসে ছেলে বিলুকে ট্যাব কিনে দিয়েছে। ভেবেছে দুষ্টুমি করার চেয়ে ট্যাবের গেমস নিয়ে ব্যস্ত থাকলে ভালো থাকবে। কিন্তু এ গেমস যে বিলুকে স্বাভাবিক জীবন থেকে দূরে সরিয়ে দিবে তা তারা বুঝতে পেরেছে অনেক পরে।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

সেদিন তুলি অবাক হয়ে যায় বিলুর নেটের নানা কর্মকাণ্ড দেখে। তুলি একটা ফাইল ডাউনলোড করতে পারছেনা কিন্তু কিভাবে জানি বিলু কয়েক মিনিটে করে দিলো। এ দেখে তুলি চিন্তা করে, যে ছেলের ইন্টারনেটের এত আগ্রহ অথচ স্কুল থেকে পড়ালেখায় আগ্রহ কম এ নিয়ে কমপ্লেইন আসছে কেন।

টিচার বলছে বিলু লিখতে পড়তে চায় না। সারা সময় তার গল্প নেটের গেমস নিয়ে। আর তুলি ও কদিন ধরে দেখছে বিলু কোন রকমে পড়া শেষ করে ব্যস্ত হয়ে পড়ে ট্যাব নিয়ে। এর মাঝে কদিন ট্যাব নিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছে তুলি। এতে বিলু ক্ষিপ্ত হয়ে ঘরে অশান্তি তৈরি করে। এমন কি খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দেয়। বিলুর আচরণের এসব পরিবর্তন দেখে রবি তার এক ডাক্তার বন্ধুকে ফোন করে বলে সব। মনোরোগ চিকিৎসক সে বন্ধু বিলুকে চেম্বারে নিয়ে যেতে বলেছে।

টেনশনে তুলির ঘুম নেই। বিলু আর আগের মত মায়ের কাছে বায়না করে না। এমনকি বাবা মায়ের দেরি ঘরে ফেরা নিয়ে অভিযোগও করে না। বেড়াতে যাবার বায়নাও নেই।

রবি তুলি ডাক্তারের কাছে গেলো বিলুকে নিয়ে। যাবার সময় বিলু তার ট্যাবটা সাথে নিলো। মায়ের নিষেধ শুনেনি। ডাক্তার অনেকটা সময় বিলুর সাথে তার গেমস আর বন্ধুদের নিয়ে গল্প করলো রবি তুলিকে বাইরে রেখে। সব শুনে মন খারাপ হলো।

বিলুকে ওয়েটিং রুমে বসিয়ে রবি তুলিকে ডাক্তার বললো সব কিছু। আর বললো ডিভাইস নিয়ে তার মাত্রারিক্ত আগ্রহের কারণে স্কুলের পড়া লেখার সমস্যা হচ্ছে। বিলুকে গেমস আসক্তি থেকে সরিয়ে আনতে চিকিৎসার চেয়ে মা বাবা আর পরিবারের সহযোগিতা খুব দরকার। ঘরে ডিভাইসের ব্যবহার কমিয়ে সময় দিতে হবে ছেলেকে। সবচেয়ে ভালো হয় বিলুকে নিয়ে কোথাও ঘুরে আসতে। এ আসক্তি একদিনে বন্ধ করা যাবে না। সময় দিতে হবে।

বিজ্ঞাপন

ডাক্তারের নির্দেশ মত বিলুকে নিয়ে ইন্ডিয়া ঘুরতে যায় রবি তুলি। দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে তারা। বেড়ানোর ৭ দিনে বাবা মাকে কাছে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা বিলু। রবি তুলি গল্পচ্ছলে বুঝায় গেমসের নেশায় সে স্কুলে ভালো রেজাল্ট করবে না। খেলাধুলা না করলে শরীর ঠিক থাকবে না। আর সে সাথে প্রমিজ করে অফিস শেষে ৩ জনে এখনকার মত মজা করবে গল্প করবে।

ছুটি কাটিয়ে ফিরে এসে সব ডাক্তারকে জানালে উনি আশাবাদী হয় আর বলে বিলুর আগামী দিনের জন্য বাবা মাকে এ স্যাক্রিফাইজ করতে হবে। কড়া শাসন নয় বরং বিলুকে উপলদ্ধি করাতে হবে ডিভাইস ব্যবহার সে করবে সময়ের সাথে সাথে তার প্রয়োজন মত।

প্রায় ১ বছর লাগে রবি তুলির ছেলেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে। ট্যাব মোবাইল হল এখনকার জীবনে প্রয়োজনীয় বিষয় এটা কোন খেলনা নয়। এ বোধ আসার পর বিলু আর সাথে রাখে না তার প্রিয় ট্যাবকে।

আধুনিক সমাজে রবি তুলির মত মা বাবারা নিজেদের অজান্তেই সন্তানদেরকে যন্ত্রের বন্ধু করে তোলে। সন্তান মানুষ করার জন্য অর্থের সাথে সাথে মমতা মাখানো সময় দিতে হবে। ইন্টারনেটর বিশালতার কাছে নিজের সন্তানকে হারিয়ে দেয়া যাবে না এ সচেতনতা থাকাটা সবার জন্য জরুরি।

সাম্প্রতিক সময়ে করোনার কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ঘর বন্দি জীবনে ইন্টারনেটের নানা ধরনের গেমসে আসক্তি বাড়ছে ছেলেমেয়েদের। পাবজি, ফায়ার গেমকে সরকার বন্ধ করে দেবার নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু তথ্য প্রযুক্তিকে আসলে এভাবে বন্ধ করা যায় না। সারা বিশ্ব জুড়ে নানা পদ্ধতি রয়েছে নেটের জগতে প্রবেশ করার। আর সেটা যারা খেলে তারা জানে। ইন্টারনেটে গেমস তৈরি করা হয় বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে। সুতরাং এটাকে বন্ধ করা যাবে না।

তাই পরিবারকে ভাবতে হবে তার সন্তানদের গেমস আসক্তি কমানোর বিষয়টি। খেলনা হিসাবে ডিভাইস হাতে তুলে দেবার আগে ভাবুন কাজটা যুক্তিযুক্ত হচ্ছে কিনা। প্রকৃতপক্ষে কোন জিনিস ভালো কি মন্দ তা নির্ভর করে ব্যবহারের ওপর। সুতরাং অভিভাবক হিসেবে সন্তানকে আপনারই বুঝতে হবে তার হাতে থাকা ডিভাইস থেকে কি শিক্ষা নিবে?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)