চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

শরীর ঠিক নেই, তবু গানের স্মৃতি নিয়ে ঘুম ভাঙে তাঁর

প্রায় তিন মাস চিকিৎসা শেষে জানুয়ারিতে দেশে ফিরেছেন ক্যানসার আক্রান্ত কিংবদন্তি সুরকার, গীতিকার ও সংগীত পরিচালক আলাউদ্দিন আলী। বর্তমানে কেমন আছেন তিনি?

‘আমার শুধু একটাই চাওয়া, যেন আমার স্বামী আলাউদ্দিন আলী সুস্থ হয়ে আবার গানে ফিরতে পারেন। আমি শুধু এই জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চাই। মানুষের দোয়ার চেয়ে মূল্যবান আর কিছু নাই এই মুহূর্তে।’

ক্যানসার আক্রান্ত কিংবদন্তি সুরকার, গীতিকার আলাউদ্দিন আলীর উন্নত চিকিৎসার জন্য গেল বছরের অক্টোবরে ব্যাংকক যাওয়ার আগে চ্যানেল আই অনলাইনকে এমন আকুতিই জানিয়ে ছিলেন স্ত্রী ফারজানা আলী মিমি।

বিজ্ঞাপন

প্রায় তিনমাস চিকিৎসা শেষে গেল জানুয়ারির শুরুতেই স্বামীকে নিয়ে দেশে ফিরেন তিনি। বর্তমানে কেমন আছেন গানের এই কিংবদন্তি? জানতেই যোগাযোগ করা হয় আলাউদ্দিন আলীর মুঠোফোনে। কথা হয় ফারজানা আলীর সঙ্গেই। চ্যানেল আই অনলাইনকে তিনি জানান আলাউদ্দিন আলীর সর্বশেষ শারীরিক অবস্থা, এবং তাঁর এই সময়ের যাপন।

ব্যাংকক থেকে ফিরে ঢাকার বাসাতেই আছেন ‘বন্ধু তিন দিন তোর বাড়ি গেলাম দেখা পাইলাম না’ এর বিখ্যাত সুরকার। বলা যায় এই মুহূর্তে বাইরের পৃথিবীর সাথে খুব একটা যোগাযোগ নেই তাঁর। সন্তান, পরিজন কিংবা কখনো গানের মানুষেরা যোগাযোগ করলে কথা বলেন তাদের সাথে। করোনাকালে নিজের ছোট মেয়ে আদৃতা আলাউদ্দিন রাজকন্যার স্কুল বন্ধ থাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় কাটান তার সঙ্গে। তবে সারাদিন যাই করুন না কেন, শেষ পর্যন্ত গানের আবহেই ডুবে থাকতে পছন্দ করেন এই সুরকার ও সংগীত পরিচালক।

স্ত্রী ফারজানা আলী মিমির সঙ্গে আলাউদ্দিন আলী

ফারজানা আলী জানান, নিজের শারীরিক অবস্থা খুব ভালো নয়, প্রতিদিনই থেরাপি দিতে হচ্ছে। তবু এই অবস্থার মধ্যেও তিনি সাতটি গান লিখে ফেলেছেন। তারমধ্যে দুটি গানের সুরও করেছেন (শুধু মুখটার সুর দিয়েছেন)। এমনকি এই সময়ে করোনা নিয়েও একটি গান লিখে ফেলেছেন!

আলাউদ্দিন আলীর স্ত্রী ও শিল্পী ফারজানা আলী বলেন, বিশ্বময় বর্তমান করোনা পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর ধারণা নেই। কিন্তু আমি তাঁকে বুঝিয়ে বলেছি যে, বিশ্বব্যাপী একটা মহামারী চলছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীতেই এটি ছড়িয়ে গেছে। অসংখ্য মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, প্রতিদিন মারা যাচ্ছে। অনেক কিংবদন্তি মানুষকেও কেড়ে নিয়েছে করোনাভাইরাস। এটি শোনার পর একদিন দুপুরে তিনি গান লিখতে বসলেন। 

‘ঘুম থেকে উঠার পর তাঁর মুড ভালো থাকে। এসময় শুধু তিনি গানের কথা বলেন। চোখ বন্ধ করে তিনি গানের সুর করতে থাকেন। সারগাম বলতে থাকেন। সেই আগের মতো মিউজিক ডিরেকশান দিতে থাকেন, আমাদের সবাইকে ডাকতে শুরু করেন। বলতে থাকেন ‘বাবু (ফুয়াদ নাসের বাবু) টেক নাও!’ আবার একটু পর বলে ‘প্যাকাপ, আগামিকাল আবার বসবো’! এই যে সংগীত নিয়েই তিনি পড়ে থাকেন সারাক্ষণ। গত ১৮ মে দুপুরে তিনি আমাকে বললেন, করোনা নিয়ে তিনি একটি গানের কথা সাজিয়েছেন। আমি সঙ্গে সঙ্গে লিখতে বসে যাই।’ বলছিলেন স্ত্রী ফারজানা।

এরপর তিনি করোনা নিয়ে আলাউদ্দিন আলীর লেখা গানটি বলতে শুরু করেন। যার মুখটা এরকম: ‘‘ফিরে যাও শান্তি দাও, আমরা বাঁচতে চাই/ তোমার কারণে বন্দি আমরা, এইবার মুক্তি চাই। মুক্ত আকাশ মুক্ত বাতাস, আমাদের খুব প্রিয়/ অনেক হয়েছে এবার তুমি/ মুক্তি এনে দিও। জ্ঞানী-গুণী হারিয়েছি আমরা এবার তুমি থামো/ বাঁচার অধিকার আছে সবার, এ কথাটি মানো।’’

সর্বশেষ গত ৪ জুনেও একটি গান লিখেছেন আলাউদ্দিন আলী। গানটি রোমান্টিক। ফারজানা আলী বলেন, সেদিন বৃষ্টি হচ্ছিলো। এই মুডই সেই গানটিতে তিনি রেখেছেন। গানের মুখ এরকম: ‘‘ঝিরে ঝিরি বৃষ্টি ঝরে, মেঘ বয়ে যায়/ হারানো প্রিয়তমা মন খুঁজে তোমায়। কোনো এক বৃষ্টি রাতে, হারিয়েছিলে তুমি/ সেই থেকে একা হয়ে আজও আছি আমি।’’

শুধু গান লিখেই নয়, গানটি কে গাইতে পারে এমন সম্ভাব্য শিল্পীর নামও মনে মনে বলে দেন আলাউদ্দিন আলী। একটি গানের সমস্ত থিমই তাঁর মাথায় সারাক্ষণ ঘুরপাক খায়। এমনটাই জানান তাঁর স্ত্রী।

তবে করোনাকাল দীর্ঘ হওয়ায় আলাউদ্দিন আলীর শারীরিক অবস্থা নিয়ে কিছুটা শঙ্কিত তার পরিবার। ফারজানা আলী মিমি বলেন, ব্যাংকক থেকে জানুয়ারিতে চিকিৎসা নিয়ে ফিরে আসার পর চার/পাঁচ মাসের মধ্যে আবার উনাকে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির জন্য সেটা সম্ভব হচ্ছে না। এদিকে চিকিৎসকরা যে ঔষুধ দিয়েছেন, এগুলোও ফুরিয়ে গেছে। ঔষুধগুলো যেহেতু বাংলাদেশে পাওয়া যায় না, তাই  চড়ামূল্যে ডিএইচএল এক্সপ্রেস এর মাধ্যমে ব্যাংকক থেকে আনতে হচ্ছে।

এভাবে চলতে থাকলে ক্যানসারের এই ব্যয়বহুল চিকিৎসা নিয়ে সামনে আর্থিক সংকটের কথা ভেবেও কিছুটা শঙ্কিত কিংবদন্তির সহধর্মিনী। জানালেন, ক্যানসারের চিকিৎসা ব্যয়বহুল। তাছাড়া এই করোনার কারণে তাঁরও কোনো আয় নেই, আবার আমি নিজে সংগীতশিল্পী- এই করুণ সময়ে আমাদের কারোই খুব অবস্থা ভালো নেই।

তবে কোনো অবস্থাতেই কারো সহানুভূতি চান না তার পরিবার। বরং সংগীত জগতে আলাউদ্দিন আলীর যে প্রাপ্য, তাঁর কয়েক হাজার হিট গানের রয়ালিটি- এগুলোর ঠিকঠাক বণ্টন চান। এটিকে তার প্রাপ্যমূল্য ও অধিকার বলেও উল্লেখ করেন ফারজানা আলী। তিনি বলেন, আলাউদ্দিন আলীর গান নিয়ে যারা ব্যবসা করেছেন, তারা যদি একটু বিবেকবান হয়ে এগিয়ে আসেন তাহলে অদূর ভবিষ্যতে অনিশ্চয়তার যে কাল মেঘ দেখছেন, তা কিছুটা হলেও মোকাবেলা করা যাবে।

এ পর্যন্ত ৮ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন আলাউদ্দিন আলী। তার সুর করা গানের সংখ্যা ৫ হাজারেরও বেশি। এরমধ্যে কালজয়ী কিছু গান হচ্ছে ও আমার বাংলা মা তোর, সূর্যোদয়ে তুমি সূর্যাস্তেও তুমি ও আমার বাংলাদেশ, বন্ধু তিন দিন তোর বাড়ি গেলাম দেখা পাইলাম না, যেটুকু সময় তুমি থাকো কাছে, মনে হয় এ দেহে প্রাণ আছে, প্রথম বাংলাদেশ, আমার শেষ বাংলাদেশ, এমনও তো প্রেম হয়, চোখের জলে কথা কয়, আছেন আমার মুক্তার, আছেন আমার ব্যারিস্টার, জন্ম থেকে জ্বলছি মাগো, ভালোবাসা যত বড় জীবন তত বড় নয়।